Home First Lead চট্টগ্রাম: টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়ানো শেষ, ই-টিকিটিং ও অ্যাপেই চড়া যাবে বাসে

চট্টগ্রাম: টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়ানো শেষ, ই-টিকিটিং ও অ্যাপেই চড়া যাবে বাসে

নতুন মাস্টারপ্ল্যান ও ভবিষ্যতের যাতায়াত

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: বন্দরনগরী চট্টগ্রামের গণপরিবহন ব্যবস্থার প্রধানতম সংকট হলো এর চরম বিশৃঙ্খলা ও সমন্বয়হীনতা।  প্রায় এক হাজার ১০০টির মতো বাস চলাচল করলেও তা একেবারেই অনিয়ন্ত্রিত। বেশিরভাগ বাসই পরিচালিত হচ্ছে একক বা বিচ্ছিন্ন মালিকানায়। কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকা, রাস্তায় যাত্রী তোলার জন্য একের পর এক বাসের বিপজ্জনক প্রতিযোগিতা, যত্রতত্র ওঠানো-নামানো এবং পুরনো জরাজীর্ণ যানবাহনের আধিক্যে প্রতিদিন নগরীর সড়কগুলোতে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট ও মারাত্মক দুর্ঘটনা।

এই হযবরল পরিস্থিতি নিরসনে ‘চট্টগ্রাম ট্রাফিক ও ট্রান্সপোর্ট মাস্টারপ্ল্যান (২০২৫-২০৫০)’ খসড়া প্রতিবেদনে গণপরিবহন ব্যবস্থা বিশেষ করে বাস পরিবহনকে ঢেলে সাজানোর জন্য আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

খসড়া প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী,  নগরীর বাস ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সংস্কার হতে যাচ্ছে ফ্র্যাগমেন্টেড বা বিচ্ছিন্ন মালিকানার অবসান ঘটানো। বর্তমানে ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত পথগুলোকে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (Public-Private Partnership – PPP) মাধ্যমে একটি অথবা কয়েকটি নির্দিষ্ট সুসংগঠিত কোম্পানির অধীনে নিয়ে আসার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থার আওতায় একক কোম্পানির অধীনে যানবাহন পরিচালিত হলে রুটগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরবে। বাসের চালকরা নির্দিষ্ট মাসিক বেতনের আওতায় আসবেন, ফলে যাত্রী তোলার জন্য রাস্তায় বিপজ্জনক রেষারেষি এবং ওভারটেকিং বন্ধ হবে।

মাস্টারপ্ল্যানের গাণিতিক বিশ্লেষণ ও মডেলিং প্রক্রিয়ায় উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। নগরীতে বর্তমানে যে ১,১০০টির মতো অপ্রশস্ত ও মানহীন বাস চলছে, সেগুলোর বদলে যদি রুটগুলোকে পুনর্বিন্যাস করা যায় এবং মাত্র ৭০০টি আধুনিক, মানসম্মত বড় বাস সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী চালানো যায়, তবেই পুরো চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার যাত্রী চাহিদা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মেটানো সম্ভব। এই রুট র‌্যাশনালাইজেশনের মাধ্যমে একদিকে যেমন সড়কের ওপর থেকে বাড়তি যানবাহনের চাপ কমবে, অন্যদিকে যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে বহুগুণ।

যাত্রীদের সেবা সহজতর করতে খসড়া মাস্টারপ্ল্যানে ডিজিটাল ও অটোমেটেড ভাড়া আদায় ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাসে উঠে ক্যাশ বা নগদে টাকা লেনদেনের বদলে কন্টাক্টলেস স্মার্ট কার্ড এবং মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে ভাড়া পরিশোধের ব্যবস্থা থাকবে। কোন রুটের বাস কোথায় অবস্থান করছে এবং পরবর্তী বাসটি কতক্ষণ পর নির্দিষ্ট স্টপে পৌঁছাবে, তা যেন যাত্রীরা ঘরে বসেই জানতে পারেন—সেজন্য জিপিএস ট্র্যাকিং প্রযুক্তিনির্ভর রিয়েল-টাইম ডিসপ্লে বোর্ড এবং মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারের নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে।

নগরীর যাতায়াত শৃঙ্খলার অন্যতম বড় বাধা হলো নির্দিষ্ট বাস স্টপ ও বাস টার্মিনালের অভাব। মোড়গুলোতে বাস দাঁড়িয়ে থাকার কারণে সড়ক সংকুচিত হয়ে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। খসড়া পরিকল্পনায় নগরীর ভেতরে নিউ মার্কেট এলাকায় ইন্টারমোডাল হাব তৈরির পাশাপাশি পতেঙ্গা, কালুরঘাট ও নতুন ব্রিজে আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সাথে শহরের প্রধান সড়কগুলোর নেটওয়ার্কে প্রয়োজনীয় বিরতিতে বিজ্ঞানসম্মত নকশায় বাস বে (Bus Bay) ও যাত্রী ছাউনি সংবলিত নির্দিষ্ট ‘বাস স্টপ’ চিহ্নিত করা হয়েছে।

মাস্টারপ্ল্যানে উঠে এসেছে যে, হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়ে মেট্রোরেল বা মেগা প্রজেক্ট গড়ে তোলার চেয়ে মাত্র দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকায় সম্পূর্ণ আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও ডিজিটাল বাস নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ। কোম্পানিভিত্তিক সুসংগঠিত বাস ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে অতি কম খরচে এবং দ্রুততম সময়ে বন্দরনগরীর সাধারণ মানুষ এক নিরাপদ, বিশ্বমানের ও সুশৃঙ্খল গণপরিবহন সেবার সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন।

(পরবর্তী পর্বে থাকছে: এমআরটি বনাম আধুনিক বাস সার্ভিস: খসড়া পরিকল্পনায় মেগা প্রজেক্টের বাস্তবতা)

ভিজিট করুন www.businesstoday24.com