Home বিশেষ সাক্ষাৎকার শিপিং অপারেশনের আসল রূপ ‘ফায়ার ফাইটিং’, টিকে থাকতে প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা: মুনতাসির...

শিপিং অপারেশনের আসল রূপ ‘ফায়ার ফাইটিং’, টিকে থাকতে প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা: মুনতাসির রুবাইয়াত

মুনতাসির রুবাইয়াত
জিবিএক্স লজিস্টিকস লিমিটেড দেশের শিপিং, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং এবং আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস খাতের একটি অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এবং সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের দ্রুত বর্ধনশীল চাহিদাকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ সময় ধরে এন্ড-টু-এন্ড সাপ্লাই চেইন সলিউশন, ভেসেল অপারেশন, পোর্ট হ্যান্ডলিং, মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্টেশন এবং আধুনিক কার্গো ম্যানেজমেন্ট সেবা অত্যন্ত সুনামের সাথে দিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক সাপ্লাই চেইনের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধির সাথে খোলামেলা ও সবিস্তার আলোচনা করেছেন জিবিএক্স লজিস্টিকস লিমিটেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব অপারেশন মুনতাসির রুবাইয়াত। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ সেই প্রাণবন্ত কথোপকথনের বিস্তারিত অংশ নিচে তুলে ধরা হলো।
প্রশ্ন: শিপিং ও লজিস্টিকসের মতো একটি জটিল ও গতিশীল পেশায় আপনার আগমন কীভাবে ঘটেছিল এবং শুরুর দিকের অনুপ্রেরণা কী ছিল?
মুনতাসির রুবাইয়াত: আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন গড়ে উঠেছিল ব্যবসায় প্রশাসন বা বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে কেন্দ্র করে। ছাত্রাবস্থায় আমার অধিকাংশ সহপাঠীর মতো আমারও প্রাথমিক মানসিক প্রস্তুতি ছিল কোনো প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নিজের পেশাজীবন শুরু করার। সেই নির্ধারিত লক্ষ্য থেকেই একপর্যায়ে একটি স্বনামধন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ বিভাগে ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ পাই। সেখানে কাজ করার সুবাদে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, এলসি নিষ্পত্তি এবং বৈশ্বিক লেনদেনের মৌলিক গতিপ্রকৃতি খুব কাছ থেকে দেখার বিরল সুযোগ তৈরি হয়। এই অভিজ্ঞতা আমার ভেতরে বৈদেশিক বাণিজ্যের বিশাল পরিধি নিয়ে এক গভীর আগ্রহের জন্ম দেয়।
তবে আমার জীবনের মূল মোড় ঘুরে যায় যখন আমি একটি কনসোলিডেশন ব্যবসায় ইন্টার্ন হিসেবে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। সেই দিনগুলোর কাজের অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ও বিস্ময়কর। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পণ্য একত্রীকরণ বা কার্গো কনসোলিডেশন যে কতটা সূক্ষ্ম, জটিল এবং একই সাথে বিশাল এক বৈশ্বিক মহাযজ্ঞ—তা সরাসরি প্রত্যক্ষ করে আমি দারুণভাবে আকৃষ্ট হই। আমি গভীরভাবে লক্ষ্য করি, এই অঙ্গনে যেমন অর্থনৈতিক ও আর্থিক বিশ্লেষণের গভীরতা প্রয়োজন, তেমনি আন্তর্জাতিক কূটনীতি, বাণিজ্য চুক্তি এবং লজিস্টিকস পরিচালনার এক নিখুঁত মেলবন্ধন কাজ করে। আমার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসায়িক পড়াশোনা এবং ব্যক্তিগত আগ্রহের সাথে এই ক্ষেত্রটি পুরোপুরি মিলে গিয়েছিল। মূলত সেই ইন্টার্নশিপের মুগ্ধতা ও অদম্য কৌতূহলই আমাকে ক্রমান্বয়ে এই খাতের প্রতি অনুরক্ত করে তোলে এবং আমাকে একটি দীর্ঘমেয়াদী পূর্ণকালীন পেশাজীবনে নিয়ে আসে।
প্রশ্ন: ক্যারিয়ারের শুরুতে এই সেক্টরে কাজ করতে গিয়ে কী ধরনের বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন?
মুনতাসির রুবাইয়াত: শিপিং এমন একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা যেখানে কোনো ধরনের স্থবিরতার সুযোগ নেই। এখানে প্রতিটি নতুন দিন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হয় এবং কখনোই একটি দিনের কাজের অভিজ্ঞতা অন্য দিনের সাথে হুবহু মেলে না। অপারেশনের মূল চরিত্রই হলো নিরবচ্ছিন্ন ‘ফায়ার ফাইটিং’। এর অর্থ হলো, কোনো না কোনো অপ্রত্যাশিত জটিলতা বা সংকট প্রতিনিয়ত সামনে আসবেই এবং তাৎক্ষণিকভাবে সেই সংকটের বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধান বের করতে হবে। এটি হতে পারে জাহাজের শিডিউলে আকস্মিক কোনো পরিবর্তন, কাস্টমসের জটিল নথিপত্র সংক্রান্ত আইনি বাধা, কিংবা ক্লায়েন্টের শেষ মুহূর্তের কোনো অতি জরুরি চাহিদা।
আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত রূপান্তরটি ঘটেছিল যখন আমি সাধারণ কনসোলিডেশন পর্যায় থেকে পুরোপুরি পিউর শিপিং বা জাহাজ পরিচালনার মূল স্রোতে যুক্ত হই। কনসোলিডেশনে কাজের পরিধি মূলত কার্গো একত্রীকরণ ও ফরওয়ার্ডিংয়ের একটি নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু জাহাজ পরিচালনার জগতে পা রেখেই দেখলাম কাজের পরিধি এক বিশাল সমুদ্রে রূপ নিয়েছে। সেখানে পুরো ভেসেল অপারেশন, আন্তর্জাতিক পোর্ট কল, বিশালাকার শিপিং লাইনের সাথে নিবিড় সমন্বয় এবং অসংখ্য বহুমুখী স্টেকহোল্ডারদের একসাথে পরিচালনা করতে হয়। এই বিশাল রূপান্তর আমাকে প্রচণ্ড চাপের মুখে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা এনে দিয়েছে এবং একই সাথে বহুবিধ সংকট সমান্তরালভাবে সামলানোর মানসিক দৃঢ়তা তৈরি করেছে, যা আজও আমার পেশাগত জীবনের প্রধান চালিকাশক্তি।
প্রশ্ন: জিবিএক্স লজিস্টিকসের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব অপারেশন হিসেবে আপনার দৈনন্দিন কার্যপরিধি ও কৌশলগত অগ্রাধিকারগুলো কীভাবে নির্ধারণ করেন?
মুনতাসির রুবাইয়াত: বর্তমান অবস্থানে আমার ভূমিকা ক্যারিয়ারের শুরুর দিককার রুটিন অপারেশনাল কাজের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। এখন আমার দৈনন্দিন কাজের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। দিনের একটি বড় অংশ আমাকে বিভিন্ন জটিল অপারেশনাল অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হয়, যেকোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে দ্রুত দিকনির্দেশনা দিতে হয় এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে আগাম পরিকল্পনা সাজাতে হয়।
তবে একজন দলনেতা হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় আত্মতৃপ্তি ও সাফল্য হলো একটি সম্পূর্ণ স্বনির্ভর ও দক্ষ টিম গড়ে তোলা। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ছোট ছোট সমস্যায় নিজেকে সরাসরি যুক্ত থাকতে হতো। কিন্তু এখন আমার পাশে এমন একদল নিবেদিতপ্রাণ ও অভিজ্ঞ পেশাদার রয়েছেন, যাদের ওপর আমি নির্দ্বিধায় পূর্ণ আস্থা রাখতে পারি। তারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে দৈনন্দিন জটিল অপারেশনাল সিদ্ধান্তগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সামলে নিচ্ছেন। এর ফলে আমি নিজেকে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক কৌশল প্রণয়ন, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণ এবং প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক উন্নয়নের মতো বৃহত্তর নীতিগত বিষয়ে নিয়োজিত রাখতে পারছি। প্রতিষ্ঠান কোনো একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হওয়াই নেতৃত্বের আসল সার্থকতা।
প্রশ্ন: বর্তমান বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের অস্থিরতার মাঝে প্রতিষ্ঠানের অপারেশনাল নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখতে আপনারা কী ধরনের কর্মপরিকল্পনা নিচ্ছেন?
মুনতাসির রুবাইয়াত: বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনীতি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার এই জটিল যুগে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইন নিরবচ্ছিন্ন রাখা একটি সার্বক্ষণিক যুদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রধান কৌশল হলো উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রকৃত প্রভাব বা গ্র্যাভিটি খুব দ্রুত এবং নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কোনো পরিবর্তন বা অচলাবস্থা তৈরি হলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তার সম্ভাব্য অভিঘাত বিশ্লেষণ করি। কোন বাণিজ্যিক রুটে বা কোন নির্দিষ্ট শিপিং লাইনে কনটেইনার আটকে যেতে পারে, কোথায় অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে এবং কোথায় বিকল্প ট্রানজিট বা পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে—তা আমরা আগাম পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করি।
এই গভীর মূল্যায়নের একমাত্র লক্ষ্য হলো আমাদের সেবাগ্রহীতা বা ক্লায়েন্টদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি শতভাগ রক্ষা করা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাহ্যিক পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল বা অনিশ্চিত হোক না কেন, পূর্বনির্ধারিত সময়ে সঠিক গন্তব্যে কার্গো পৌঁছে দেওয়াই জিবিএক্স লজিস্টিকসের সামগ্রিক নির্ভরযোগ্যতার মূল ভিত্তি।
প্রশ্ন: চট্টগ্রাম বন্দর ও দেশের সামগ্রিক লজিস্টিকস অবকাঠামো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে কতটা প্রস্তুত বলে আপনি মনে করেন?
মুনতাসির রুবাইয়াত: চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা ও অবকাঠামোগত কাঠামোর কথা বিবেচনা করলে বলতে হয়, সীমিত ভৌগোলিক পরিসরে বছরে প্রায় ৩২ লাখের বেশি টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা একেবারেই চাট্টিখানি কথা নয়। এটি নিশ্চিতভাবেই বন্দরের কর্মকর্তা, কর্মচারী, শ্রমিক এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার এক অসামান্য কর্মদক্ষতার পরিচায়ক।
তবে সামগ্রিক সাপ্লাই চেইনের বাস্তব চিত্রে কেবল বন্দরের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা দিয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। বন্দর পরিচালনা কর্তৃপক্ষ যতই দ্রুত কাজ করুক না কেন, কাস্টমসের নীতিগত ও পদ্ধতিগত কিছু জটিলতার কারণে পুরো আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া এবং কনটেইনার টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম অনেকটাই মন্থর হয়ে পড়ে। ডকুমেন্টেশন যাচাই, দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়ায় যে বিপুল সময় নষ্ট হয়, তা সহজ করা গেলে বন্দরের বিদ্যমান সামর্থ্য আন্তর্জাতিক মানে দৃশ্যমান হতো। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল ভৌত অবকাঠামোর অপর্যাপ্ততায় নয়, বরং নীতিগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জটিলতার ভেতরেও গভীরভাবে প্রোথিত।
প্রশ্ন: টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমাতে এবং সার্বিক দক্ষতা বাড়াতে নীতিগত বা কাঠামোগত কী ধরনের পরিবর্তন সবচেয়ে জরুরি?
মুনতাসির রুবাইয়াত: আমার সুস্পষ্ট পর্যবেক্ষণ হলো, সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও ফলপ্রসূ পরিবর্তন আনা সম্ভব কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়ার কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে। নতুন বন্দর জেটি নির্মাণ কিংবা অফ-ডকের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে প্রচুর বৈদেশিক বিনিয়োগ ও দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু কাস্টমস পদ্ধতি সহজীকরণ তুলনামূলকভাবে দ্রুত কার্যকর করা যায় এবং তার সুফলও রাতারাতি দৃশ্যমান হয়।
এর জন্য প্রথমত প্রয়োজন কাস্টমস প্রক্রিয়ার শতভাগ অটোমেশন এবং সত্যিকারের পেপারলেস ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, যাতে নথিপত্র হাতে হাতে যাচাইয়ের পুরোনো সংস্কৃতি পুরোপুরি বন্ধ হয়। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি কনটেইনার বা চালান ঢালাওভাবে পরীক্ষা না করে আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক রিস্ক-বেজড অ্যাসেসমেন্ট পদ্ধতি পুরোদমে চালু করা দরকার। এতে সৎ ও নিয়মিত ব্যবসায়ীদের পণ্য দ্রুততম সময়ে খালাস পাবে এবং অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রতা কমবে। তৃতীয়ত, কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ, টার্মিনাল অপারেটর এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ন্যাশনাল সিঙ্গেল-উইন্ডো ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। এই প্রশাসনিক ও নীতিগত সংস্কারগুলো নিশ্চিত করা গেলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের আগেই বর্তমান পরিকাঠামো দিয়েই টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম অবিশ্বাস্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
প্রশ্ন: বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য রুটের সংকট বাংলাদেশের শিপিংয়ে কী ধরনের অভিঘাত ফেলছে?
মুনতাসির রুবাইয়াত: আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও জ্বালানি তেলের অস্থিতিশীল বাজার আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যে মূলত দুই প্রান্ত থেকে আঘাত হানছে। একদিকে জ্বালানি ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশীয় কারখানায় উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে লোহিত সাগর বা গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার কারণে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে বিকল্প দীর্ঘ পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাবে বৈশ্বিক ফ্রেইট রেট এবং পণ্যের ট্রানজিট সময় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই বাড়তি উৎপাদন খরচ এবং উচ্চ পরিবহন ব্যয়ের যৌথ চাপ দিনশেষে আঘাত করছে আমাদের রপ্তানিকারকদের মুনাফার ওপর। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পণ্যের দাম রাতারাতি বাড়ানো প্রায় অসম্ভব, ফলে এই অতিরিক্ত ব্যয় শোষণ করতে গিয়ে রপ্তানি খাতের কন্ট্রিবিউশন মার্জিন উদ্বেগজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। এই কঠিন বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি পর্যায়ে অপচয় রোধ, পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সক্ষমতার সর্বোচ্চ টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
প্রশ্ন: শিপিং ও লজিস্টিকসে ডিজিটালাইজেশন এবং আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগে জিবিএক্স লজিস্টিকস কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে?
মুনতাসির রুবাইয়াত: আমরা একটি সম্পূর্ণ আধুনিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক লজিস্টিকস ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছি। বুকিং প্রদান, কার্গো ট্র্যাকিং এবং ডকুমেন্টেশন প্রক্রিয়ায় আমরা উন্নত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অটোমেশন ব্যবহার করছি, যা দীর্ঘদিনের সনাতন ম্যানুয়াল কাগজপত্রের নির্ভরতা পুরোপুরি কমিয়ে এনেছে। এর ফলে আমাদের গ্রাহকরা তাদের পণ্যের সর্বশেষ অবস্থান ও গতিবিধি সম্পর্কে মুহূর্তেই রিয়েল-টাইম তথ্য পাচ্ছেন। মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও ডেটা অ্যানালিটিকসের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করে আমরা পরিচালন সময় ও ব্যয়ের সর্বোচ্চ সাশ্রয় করছি।
প্রশ্ন: এই সম্ভাবনাময় খাতে নতুন প্রজন্মের ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ কেমন এবং তাদের জন্য আপনার সুনির্দিষ্ট পরামর্শ কী?
মুনতাসির রুবাইয়াত: বাংলাদেশের অর্থনীতির সামগ্রিক বিকাশ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্রমাগত প্রসারের সাথে সাথে এই খাতে দক্ষ মানবসম্পদের চাহিদা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তবে তরুণ প্রজন্মের প্রতি আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো, এই পেশায় কেবল তাত্ত্বিক বা কেতাবি জ্ঞানের চেয়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার মূল্য অনেক বেশি।
ক্যারিয়ারের প্রথম কয়েক বছর অত্যন্ত ধৈর্য ধরে ব্যবসার মূল গভীরে প্রবেশ করতে হবে এবং পুরো সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি ছোট প্রক্রিয়া কীভাবে একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত, তা সরাসরি কাজ করে অনুধাবন করতে হবে। শুরুতে হয়তো কাজগুলোকে কঠিন কিংবা জটিল মনে হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি ধাপের খুঁটিনাটি মাঠপর্যায়ে রপ্ত না করলে পরবর্তীতে বড় দায়িত্ব সামলানো সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি চমৎকার যোগাযোগ দক্ষতা, বহুবিধ সংকট ব্যবস্থাপনার কৌশল, দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিকতা এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত জ্ঞানে নিজেকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করতে হবে। এই গুণাবলি অর্জন করতে পারলে শিপিং ও লজিস্টিকস খাতে এক উজ্জ্বল, দীর্ঘস্থায়ী ও আন্তর্জাতিক মানের নেতৃত্বমূলক ক্যারিয়ার গড়া নিঃসন্দেহে সম্ভব।
মুনতাসির রুবাইয়াত প্রসঙ্গে: দেশের শীর্ষস্থানীয় লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান জিবিএক্স লজিস্টিকস লিমিটেড-এ প্রায় এক যুগ ধরে ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব অপারেশন হিসেবে কৌশলগত নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর থেকে অদ্যাবধি তিনি প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক অপারেশনাল নেটওয়ার্ক, ভেসেল ও পোর্ট ম্যানেজমেন্ট এবং বহুমুখী ক্লায়েন্ট সলিউশন সাফল্যের সাথে পরিচালনা করছেন। তিনি বৈশ্বিক সুপরিচিত কনগ্লোমারেট এমজিএইচ গ্রুপে ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত সাড়ে ১২ বছরেরও বেশি সময় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এরও আগে ১৯৯৯ সালের মার্চ থেকে ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ট্রান্সমোডাল কোম্পানি লিমিটেডে তার শিপিং ক্যারিয়ারের শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে ওঠে। শিক্ষাজীবনে তিনি চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে এইচএসসি সম্পন্ন করার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাইন্যান্সে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি নীতিগত পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্য সংগঠন বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশনেও।