Home বিশেষ সাক্ষাৎকার দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ ও অলস জীবনযাত্রায় হাড়ের ঝুঁকি: সমাধানের পথ জানালেন অর্থোপেডিক...

দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ ও অলস জীবনযাত্রায় হাড়ের ঝুঁকি: সমাধানের পথ জানালেন অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ ড. কেপি কোসিগান

ড. কেপি কোসিগান

আধুনিক জীবনধারা, হাড়-জোড়ের স্বাস্থ্য ও অর্থোপেডিক চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত: ড. কেপি কোসিগান-এর  সাক্ষাৎকার

বিশেষজ্ঞ পরিচিতি

ড. কেপি কোসিগান ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও খ্যাতনামা অর্থোপেডিক ও জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট সার্জন। তিনি ভারতের চেন্নাইয়ে অবস্থিত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অ্যাপোলো হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের একজন অন্যতম শীর্ষ বিশেষজ্ঞ। যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালসমূহ থেকে অর্থোপেডিক চিকিৎসায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই সার্জন হাঁটু, কোমর (হিপ) ও জোড়ের জটিল আর্থ্রাইটিস চিকিৎসা, আর্কিওপ্লাস্টি এবং অ্যাডভান্সড জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট সার্জারিতে অত্যন্ত সুপরিচিত। ক্রীড়াবিদ ও অ্যাথলেটদের চোট পুনর্বাসন এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ন্যূনতম অস্ত্রোপচার পদ্ধতিতে চিকিৎসা প্রদানের জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁর বিশেষ সুনাম রয়েছে।

হেলথ ডেস্ক:

স্বনামধন্য অ্যাপোলো হাসপাতাল, চেন্নাইয়ের অর্থোপেডিক বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট এবং প্রখ্যাত কনসালটেন্ট অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট সার্জন ড. কেপি কোসিগান-এর সাথে বিশেষ এই সাক্ষাৎকারটি নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন: আজকাল নানা পেশার কর্মজীবী মানুষদের মধ্যে হাড় ও জোড়ের নানা সমস্যা দেখা যাচ্ছে। এই পডকাস্টটি দেখছেন এমন চাকরিজীবীদের তাদের হাড় ও জোড়ের (জয়েন্ট) স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে কী কী বিষয় অবশ্যই মেনে চলতে হবে?

ড. কেপি কোসিগান: প্রথমত, অবশ্যই কিছু নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম বা ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি বজায় রাখতে হবে।

আমার চিকিৎসাসেবার কারণে অনেক সময় দিনে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। তবে আমাদের কাজের ধরনটাই এমন যে, সারাদিনের বড় একটা অংশ জুড়েই আমাদের হাঁটাচলা ও দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়। অন্যদিকে, যারা প্রধানত ডেস্ক জব বা আইটি খাতের মতো পেশায় নিয়োজিত, তাদের ক্ষেত্রে খুব কম বয়সেই ব্যাকপেইন, জোড়ে ব্যথা কিংবা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে আড়ষ্টতা শুরু হতে দেখা যায়। তাই তাদের দৈনন্দিন রুটিনে কিছু শারীরিক কাজকর্ম যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।

এর মধ্যে সবচেয়ে সহজ ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি হলো হাঁটা। কারও যদি জিমে যাওয়ার সময় না থাকে, তবে না যাক; সাঁতার জানার পরও যদি সময় না পান, তাতেও সমস্যা নেই। কিন্তু দৈনিক অন্তত ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার হাঁটা উচিত। আপনার যদি নিজস্ব বিশাল কোনো অফিস ক্যাম্পাস থাকে, তবে সেই ক্যাম্পাসের ভেতরেই হেঁটে এটি সম্পন্ন করতে পারেন। কিংবা অফিসে যাওয়ার পথে গাড়ি থেকে সামান্য কিছুটা পথ আগে নেমে বাকি পথ হেঁটে গিয়েও এই লক্ষ্য পূরণ করতে পারেন।

দীর্ঘ সময় একভাবে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা—দুটোই এড়িয়ে চলা উচিত। অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা আছে যে, কেবল বছরের পর বছর ভারী বস্তু ওঠানোর মতো কঠোর পরিশ্রম করলেই বুঝি পিঠে বা জোড়ে ব্যথা হয়; তা কিন্তু নয়। যারা টানা এক জায়গায় বসে কাজ করেন, ভুল বসার ভঙ্গির (পোশ্চার) কারণে তাদেরও ব্যাকপেইন কিংবা জয়েন্টে আড়ষ্টতা তৈরি হয়। তাই কাজের ফাঁকে সোজা হয়ে বসুন, শরীরের অবস্থান বা পজিশন পরিবর্তন করুন, একটু উঠে হেঁটে আসুন এবং কয়েক চুমুক পানি পান করুন।

বিশেষ করে ঠান্ডা আবহাওয়া ছেড়ে আবহাওয়া যখন ধীরে ধীরে গরমের দিকে যায়, তখন আমরা কতটুকু পানি পান করছি তা অনেকেই ভুলে যাই। শরীর যেন ডিহাইড্রেটেড না হয়ে পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানি, তাজা ফলমূলের রস বা অন্য যেকোনো উপায়ে শরীরে হাইড্রেশন বজায় রাখতে হবে।

এর পাশাপাশি আরেকটি বড় শর্ত হলো পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া। শুনতে খুব সহজ মনে হলেও বাস্তব জীবনে এটি মেনে চলা বেশ কঠিন। কারণ আমাদের কাজের ক্ষেত্রে নানা ধরনের ডেডলাইন বা পেশাগত চাপ থাকে, যা প্রতিদিন সঠিক সময়ে ঘুমানো বা বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দেয় না। তবে পুরো সপ্তাহের নিরিখে হলেও ঘুমের এই ঘাটতি সমন্বয় করা উচিত। সপ্তাহে দু-একদিন যদি কাজের চাপে কম বিশ্রাম হয়, তবে অন্য কোনো ছুটির দিনে বা সুযোগ বুঝে কিছুটা অতিরিক্ত সময় ঘুমিয়ে বা বিশ্রাম নিয়ে তা পূরণ করতে হবে। কারণ সারাদিনের জমে থাকা ক্লান্তি ও স্ট্রেস থেকে পেশিগুলো (মসেল) যেন আবার স্বাভাবিক অবস্থায় বা রিকভারিতে ফিরতে পারে, তার জন্য বিশ্রাম আবশ্যক। নতুবা এটি পরবর্তীতে স্থায়ী বা ক্রনিক ব্যথায় রূপ নেবে।

প্রশ্ন: প্রতিদিনের কাজের ব্যস্ততার মধ্যে মানুষের এমন ৩টি অভ্যাসের কথা যদি বলেন, যা অলক্ষ্যে তাদের হাড় ও জয়েন্টের চরম ক্ষতি সাধন করছে?

ড. কেপি কোসিগান: অলক্ষ্যে ক্ষতি করা তিনটি ক্ষতিকর অভ্যাস হলো:

১. কায়িক পরিশ্রমহীন অলস জীবনযাপন (সিডেন্টারি লাইফস্টাইল)। মানুষ এখন এতটাই আলসে হয়ে পড়েছে যে, রাস্তায় ৫০ থেকে ১০০ গজ দূরের কোনো গন্তব্যে যাওয়ার প্রয়োজন হলেও তারা হাঁটতে চান না, যানবাহনে উঠতে চান। ২. স্থূলতা বা শরীরের অতিরিক্ত ওজন। এটি বর্তমানে মহামারী আকার ধারণ করেছে। এখন আর কেবল মধ্যবয়সী বা প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে স্থূলতা সীমাবদ্ধ নেই; এটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাধুলার চেয়ে বইয়ের পড়ালেখার ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, যার ফলে শিশুদের শারীরিক স্বাস্থ্য চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে। ৩. অসুষম বা অপরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাস। যেকোনো ধরনের সুষম খাবারই শরীরের জন্য দরকারি। কিন্তু অনেকে প্রতিদিন একই ধরনের খাবার টানা খেয়ে যান। ফলে সুষম পুষ্টি পায় না শরীর।

এর পাশাপাশি বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের মাঝে দুধ বা দুধজাতীয় পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের অভ্যাস মারাত্মকভাবে কমে গেছে এবং তারা শরীরে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো লাগাচ্ছে না। অথচ হাড়ের স্বাভাবিক বিকাশ ও সুরক্ষায় এগুলোর ভূমিকা অপরিহার্য।

প্রশ্ন: হাড় ও জয়েন্টের স্থায়ী সুরক্ষায় খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত এবং খাবার তালিকায় কোন বিষয়গুলো রাখা দরকার?

ড. কেপি কোসিগান: মূল কথা হলো খাবারের বৈচিত্র্য বজায় রেখে একটি সুষম ডায়েট চার্ট মেনে চলা। আমি রোগীদের সবসময় সুষম খাবার গ্রহণে উৎসাহিত করি।

  • দুধ ও দুধজাতীয় খাবার: প্রজননক্ষমতা ও হাড়ের সুরক্ষায় যাদের হৃদরোগ বা লিপিডজনিত মারাত্মক কোনো বিধিনিষেধ নেই, তারা পুষ্টি নিশ্চিত করতে প্রতিদিন দুধ বা দুধ থেকে তৈরি পণ্য খাবার তালিকায় রাখতে পারেন।
  • সবুজ শাকসবজি: পালংশাক বা ব্রোকলির মতো সবুজ শাকসবজি অত্যন্ত পুষ্টিকর। তবে আমাদের দেশে এগুলো অতিরিক্ত সেদ্ধ করে বা ভেজে খাওয়ার যে ক্ষতিকর প্রবণতা রয়েছে, তা পরিহার করা দরকার। বিদেশের মানুষ সবজি কাঁচা বা আধাসেদ্ধ অবস্থায় খায় বলে তাদের হাড়ের স্বাস্থ্য ও ফিটনেস অনেক ভালো থাকে।
  • মাছ ও সামুদ্রিক খাবার: আমিষভোজীদের জন্য যেকোনো ধরনের মাছ এবং সামুদ্রিক খাবার ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি-এর অন্যতম প্রধান উৎস।
  • তাজা ফলমূল: সার্বিক শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে নিয়মিত মৌসুমি তাজা ফলমূল গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

তবে এখানে একটি জরুরি বিষয়ে সাবধান হতে হবে—অতিরিক্ত রেড মিট বা লাল মাংস গ্রহণ পরিহার করা উচিত। যাদের প্রবণতা আছে, এটি তাদের শরীরে ইউরিক অ্যাসিড বাড়িয়ে দেয়, যা থেকে পরবর্তীতে জয়েন্টে মারাত্মক ইনফ্লামেশন ও বাতের ব্যথা শুরু হয়।

প্রশ্ন: সাধারণ মানুষের মধ্যে মাঝেমধ্যেই আঙ্গুল ফুটানোর (আঙ্গুলের গাঁট থেকে শব্দ বের করা) অভ্যাস দেখা যায়। এটি কি বাতের (আর্থ্রাইটিস) মতো কোনো রোগ তৈরি করে?

ড. কেপি কোসিগান: মানুষের আঙ্গুল ফোটানোর ফলে যে শব্দ তৈরি হয়, তার বৈজ্ঞানিক কারণ হলো জোড়ের ভেতরের ফ্লুইডে জমা হওয়া বায়ুর বুদ্বুদ বা ভ্যাকুয়াম ফেটে যাওয়া। কেউ যদি খুব ঘন ঘন কিংবা প্রচণ্ড চাপ দিয়ে ক্রমাগত এটি করতে থাকেন, তবে জোড়ের লিগামেন্ট বা সফট টিস্যুর হালকা ক্ষতি হতে পারে। তবে মাঝেমধ্যে আঙ্গুলের গাঁট ফোটানোর সাথে সরাসরি আর্থ্রাইটিস বা বাত রোগের কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই।

আর বিষয়টি খেয়াল করলে দেখবেন, মানুষ সাধারণত কেবল আঙ্গুলের জোড়ই ফুটিয়ে থাকে। আমাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানে আঙ্গুলের জোড়ে আর্থ্রাইটিস হওয়ার কেস কতটুকু পাওয়া যায়? খুবই কম। আর্থ্রাইটিস সাধারণত বড় প্রধান জোড়গুলোতে হয়—যেমন হাঁটু বা কাঁধ। আর এই হাঁটু বা কাঁধের জোড় তো আর চাইলেই কেউ আঙ্গুলের মতো ফুটাতে পারে না!

প্রশ্ন: হাঁটু ও হিপ ব্যথায় ভুগছেন এমন বয়োজ্যেষ্ঠ বা প্রবীণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী? বিশেষ করে প্রবীণরা জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট বা জোড় প্রতিস্থাপন সার্জারির নাম শুনলেই মারাত্মক ভয় পান, এ বিষয়ে কিছু বলুন।

ড. কেপি কোসিগান: প্রবীণ বা বয়োজ্যেষ্ঠদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা নিয়ে বিগত ১০-১৫ বছরে আমার অভিজ্ঞতায় আমূল পরিবর্তন দেখেছি। এমনকি ৮০ থেকে ৮৫ বছর বয়সের প্রবীণরাও এখন হাসিমুখে সার্জারির জন্য এগিয়ে আসছেন, যা চিকিৎসা জগতের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। কারণ আমাদের উপমহাদেশে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার সাথে সাথে গড় আয়ু বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রবীণদের অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ক্ষয়ের কারণে পা পিছলে পড়ে গিয়ে কিংবা বাথরুমে যাওয়ার তাড়াহুড়োর কারণে হিপ ফ্র্যাকচার হওয়াটা খুব সাধারণ একটি ঘটনা। আর এসব ক্ষেত্রে তাদের স্বাভাবিক চলাচলের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো সার্জারি।

অনেকে মনে করেন—হাঁটু বা হিপ (উরুর জোড়) রিপ্লেসমেন্ট করা মানে শরীরের অঙ্গ বা মূল হাড়টাই বুঝি কেটে ফেলে দেওয়া হচ্ছে এবং রোগী আর কোনোদিন হাঁটতে পারবেন না! আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, এটি সম্পূর্ণ একটি ভুল ধারণা বা অন্ধবিশ্বাস।

প্রকৃতপক্ষে জোড় প্রতিস্থাপনের সময় কোনো মূল হাড় ফেলে দেওয়া হয় না (টিউমার বা বিশেষ রোগ না থাকলে)। বয়সের কারণে হাড়ের প্রান্তে থাকা তরুণাস্থি বা কার্টিলেজ (Cartilage) যখন ক্ষয়ে যায়, তখনই দুটি খসখসে হাড়ের ঘর্ষণে তীব্র ব্যথার সৃষ্টি হয়। সার্জারির মাধ্যমে আমরা কেবল সেই নষ্ট হয়ে যাওয়া কার্টিলেজ বা ক্ষয়ে যাওয়া প্রলেপটুকু নিখুঁতভাবে ছেঁটে মসৃণ করে নিই। এরপর নতুন ইমপ্ল্যান্ট বা কৃত্রিম ক্যাপ বসানোর উপযোগী আকৃতি তৈরি করে তা প্রতিস্থাপন করি। এটি পুরো জোড় ফেলে দেওয়া নয়, বরং ক্ষয়ে যাওয়া পৃষ্ঠকে পুনরায় মসৃণ (Re-surfaced) করার একটি চিকিৎসা।

চোখের ক্যাটারেক্ট বা ছানি অপারেশনের মতোই অর্থোপেডিক সার্জনদের কাছে জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট হলো অন্যতম সবচেয়ে সফল ও নিরাপদ সার্জারি। ৮০-৮৫ বছর বয়সেও সফল সার্জারির পর প্রবীণ রোগীরা আবার সুস্থ হয়ে বিদেশে সন্তানদের কাছে যাচ্ছেন, দেশের ভেতরের বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং আগের মতো স্বাভাবিক হাঁটাচলা করতে পারছেন। বয়স কেবল একটি গাণিতিক সংখ্যা; মন ও মাংসপেশি সতেজ থাকলে ব্যথার কাছে নতি স্বীকার না করে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে জীবনমান উন্নত করা উচিত।

প্রশ্ন: অনেক রোগী আছেন যারা ডাক্তারের পরামর্শ না নিয়ে দীর্ঘদিন কেবল ব্যথানাশক স্প্রে, মলম বা জেলের ওপর নির্ভর করে থাকেন। এই বাহ্যিক মলমগুলো কি আসলেও জয়েন্টের ব্যথায় কাজ করে?

ড. কেপি কোসিগান: যদি কোনো আকস্মিক স্প্রেইন (মোচড়), মাংসপেশিতে টান বা হালকা আঘাতের ব্যথা হয়, তবে বাহ্যিক আইস থেরাপি ও ব্যথানাশক জেলের ব্যবহার সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। এগুলো বাহ্যিকভাবে প্রয়োগ করার কারণে রক্তপ্রবাহে খুব বেশি প্রভাব না ফেলে কেবল সাময়িক আরাম ও কিছুটা প্লাসিবো ইফেক্ট (মানসিক তৃপ্তি) তৈরি করে।

তবে যদি মূল সমস্যাটি হয় জোড়ের গভীরে—যেমন শেষ ধাপের অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা কার্টিলেজ ক্ষয়, তবে বাহ্যিক এসব মলম বা স্প্রে কখনোই তা নিরাময় করতে পারবে না। অনবরত মলম মেখে আসল চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া থেকে বিরত থাকা কোনো বুদ্ধিমত্তার কাজ নয়।

ইউরোপ-আমেরিকার মতো উন্নত বিশ্বে কিন্তু ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশন ছাড়া নির্দিষ্ট মাত্রার বাইরে এসব প্রডাক্ট চিকিৎসায় ব্যবহার করার নিয়ম নেই, কারণ এগুলো কোনো রোগ সারায় না। তাই মলমের ওপর সাময়িক ভরসা না করে ব্যথার তীব্রতা বাড়লে বা বারবার প্রয়োগের প্রয়োজন পড়লে বিলম্ব না করে অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের কাছে এসে সঠিক ডায়াগনসিস করানোই শ্রেয়।

প্রশ্ন: একজন অ্যাথলেট বা স্পোর্টস পার্সোনালিটিকে চিকিৎসা দেওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন? বিশেষ করে কোভিডের চরম বিপর্যয়ের দিনগুলোতে তাদের ইনজুরি বা ইনভেস্টিগেশন পরিচালনা করা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?

ড. কেপি কোসিগান: সাধারণ রোগীদের চিকিৎসার চেয়ে ক্রীড়াবিদদের চিকিৎসা অনেকটাই আলাদা এবং চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে করোনা মহামারীর চরম আতঙ্কের সময়ে যখন বিশ্ব স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখনও খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক ফিটনেস ধরে রাখতে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চালু রাখা হয়েছিল। কারণ ঘরে বন্দি কোটি কোটি মানুষের বিনোদন এবং মানসিক চাপ কমানোর একটি বড় মাধ্যম ছিল স্পোর্টস।

সেসময় পুরো ফ্র্যাঞ্চাইজি বা দলকে কঠোর ‘বায়ো-বাবল’ বা সুরক্ষিত বলয়ের মধ্যে রাখা হতো। নিয়মিত স্ক্রিনিং, কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করে অত্যন্ত সুরক্ষিত পরিবেশে খেলা অনুষ্ঠিত হতো। কোনো খেলোয়াড় সেই বায়ো-বাবলের ভেতর আহত হলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসে ইনভেস্টিগেশন বা চিকিৎসা দেওয়া ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল এক কাজ।

আমাদের অ্যাপোলো হাসপাতালে আমরা তখন খেলোয়াড়দের চিকিৎসার জন্য একটি নিবেদিতপ্রান ‘গ্রীন করিডোর’ তৈরি করেছিলাম। সার্জন, অ্যানেস্থেটিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট সহ পুরো মেডিকেল টিম পিপিই স্যুট, গ্লাভস, ফেসশিল্ড, মাস্ক পরে সম্পূর্ণ সতর্ক অবস্থায় তাদের স্ক্যান, এক্স-রে, প্লাস্টার কিংবা ইনজেকশন দিতেন। প্রতিটি পরীক্ষার পর পুরো কক্ষ ও ব্যবহৃত মেশিনারি জীবাণুমুক্ত করা হতো, যেন তারা নিমিষেই সুস্থ হয়ে নিরাপদে আবার সেই বায়ো-বাবলে ফিরে যেতে পারেন। আমাদের এই সার্বক্ষণিক কঠোর সতর্কতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলেই আইপিএলের মতো মেগা টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া বিপুলসংখ্যক খেলোয়াড়ের কেউই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফেরার পর করোনা পজিটিভ হননি। পুরো দলের এই সমন্বিত কাজ সত্যিই অভাবনীয় ছিল।

ভিজিট করুন www.businesstoday24.com