Home Uncategorized নাবিক জীবন, সিডিসি কথা বলে

নাবিক জীবন, সিডিসি কথা বলে

নাবিক জীবন, সিডিসি কথা বলে
জুলদিয়ার হাওয়ায় বোনা স্বপ্ন
১৯৭৩ সাল। সদ্য স্বাধীন বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে চট্টগ্রামের আনোয়ারার জুলদিয়ায় তখন নতুন দিনের সূর্য উঠছে। সেখানে সদ্য পথচলা শুরু করেছে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি। আমরা ছিলাম ইতিহাসের অংশ— বাংলাদেশের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী।
জুলাইয়ের বুক চিরে যখন একাডেমির আঙিনায় পা রাখি, তখন বুকভরা সমুদ্র ছোঁয়ার অদম্য স্বপ্ন। কঠোর শৃঙ্খলা, সমুদ্রবিজ্ঞানের পাঠ আর আধাসামরিক প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে কেটে গেল দুটি রূপালী বছর।
১৯৭৫ সালের জুলাই। একাডেমি থেকে প্রকাশিত হলো চূড়ান্ত উত্তীর্ণের তালিকা। ৪২ জন তরুণ নাবিকের সেই তালিকায় নটিক্যাল বিভাগে মেধা তালিকায় আমার নাম উঠে এল তৃতীয় স্থানে। বিজয়ের আনন্দে যখন রাজধানীর পথ ধরছি, একাডেমি থেকে জানিয়ে দেওয়া হলো—শীঘ্রই বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) থেকে চিঠি যাবে যোগদানের বার্তা নিয়ে।
 বারুদের গন্ধ আর একটি কালো ভোর
অপেক্ষার পালা শেষ হলো আগস্টের প্রথম সপ্তাহে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বড় বোনের বাসায় ডাকপিয়ন পৌঁছে দিয়ে গেল বহু কাঙ্ক্ষিত সেই বার্তা। মতিঝিলের দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকার ‘সুলতান ভবন’—সেখানেই ছিল বিএসসির মূল কার্যালয়। মেধা তালিকার প্রথম ছয়জনকে সেখানে উপস্থিত হতে বলা হয়েছে।
সুলতান ভবনে রিপোর্ট করার পর কর্তাব্যক্তিরা জানিয়ে দিলেন চূড়ান্ত বার্তা—জাহাজে ওঠার পূর্ণ প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে তার আগে চট্টগ্রামে গিয়ে শিপিং অফিস থেকে সংগ্রহ করতে হবে সিডিসি (Continuous Discharge Certificate) এবং আইডি কার্ড।
শুরু হলো প্রস্তুতি। প্রয়োজনীয় কেনাকাটা, পোশাক-আশাক আর গোছগাছ। দেখতে দেখতে চলে এল ১৪ই আগস্টের রাত। পরদিন সকালে ঢাকা থেকে বাসে চেপে চট্টগ্রামের পথ ধরতে হবে। সুটকেসে স্বপ্ন আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে যখন ঘুমাতে গেলাম, তখনো জানি না কেমন এক কালরাত অপেক্ষা করছে গোটা জাতির জন্য।
১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫। ভোরের আলো ফোটেনি তখনো। ফজরের আজানের পরপরই কেঁপে উঠল মোহাম্মদপুরের চারপাশ। কানে এল তীব্র, নিরবচ্ছিন্ন গোলাগুলির শব্দ!
বুকটা কেঁপে উঠল আচমকা। ছুটে গিয়ে বড় বোনকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী হচ্ছে?”
বোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাশ থেকে দুলাভাই অভয় দেওয়ার সুরে বলে উঠলেন, “না না, এটা কিছু না। আজ তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হবে, তাই হয়তো ওরা আনন্দ উৎসব করছে, পটকা ফোটাচ্ছে।”
আমরা তখনো জানতাম না, ঐ বারুদের গন্ধ আনন্দ উৎসবের ছিল না—তা ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রক্তক্ষরণের।
 রক্তের পথ চিরে চট্টগ্রামের অভিমুখে
পরিকল্পনামাফিক সব কাজ গুটিয়ে নিলাম। মতিঝিলের বাংলাদেশ ব্যাংক (তৎকালীন স্টেট ব্যাংক অব বাংলাদেশ)-এর সামনে থেকে সকাল সাড়ে ছ’টায় চট্টগ্রামের বাস ছাড়বে। ফজরের পরপরই আমরা বাসার আঙিনা ছাড়লাম।
দুলাভাই নিজেই তাঁর ফোক্সওয়াগন গাড়িটি চালিয়ে আমাকে বাসে তুলে দিতে নিয়ে চললেন। গাড়ি যখন সংসদ ভবনের পাশ দিয়ে যাচ্ছে, পাশেই চোখে পড়ল রক্ষী বাহিনীর হেডকোয়ার্টার—যেখানে বর্তমানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার মাজার অবস্থিত। পরিবেশটা তখনো বেশ নিথর, অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ল না।
সঠিক সময়েই আমাদের বাস সাড়ে ছ’টায় মতিঝিল থেকে ছাড়ল। যাত্রী ছিল মোটে ১৫ থেকে ২০ জন। বাস যখন ঐতিহ্যবাহী ইত্তেফাক অফিসের সামনে দিয়ে পার হচ্ছে, জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতেই চমকে উঠলাম। একটা বিশাল সামরিক ট্যাংক দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ওপর! কিন্তু তখনও ঢাকা শহর পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, ঘটনার ভয়াবহতা আমাদের মাথায় ঢোকেনি।
বাস দ্রুত গতিতে ছুটে চলল ডেমরা ফেরিঘাটের দিকে—তখন তো আর আজকের কাঁচপুর ব্রিজ ছিল না, নদী পার হতে হতো ফেরিতে। ফেরি পার হয়ে ওপারে পৌঁছাতেই বাতাসে ভেসে এল এক মর্মান্তিক আর অবিশ্বাস্য খবর!
পথচলতি এক লোক চিৎকার করে বলে উঠল—দেশে নাকি বড় গণ্ডগোল হয়ে গেছে! শেখ মুজিবুর রহমানকে নাকি মেরে ফেলা হয়েছে!
মুহূর্তের মধ্যে বাসের ভেতরটা যেন বরফ হয়ে গেল। থমকে দাঁড়াল বাসের চাকা। ডেমরা পার হয়ে রাস্তার পাশে বাস থামিয়ে যাত্রীদের মধ্যে শুরু হয়ে গেল হট্টগোল।
একদল চিৎকার করে উঠল, “আমরা আর সামনে যাব না, চলো ঢাকায় ফিরে যাই!”
অন্য দল বলল, “যা হওয়ার হয়েছে, আমরা যাব।”
বাস চালক শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরে বললেন, “যেভাবেই হোক আমাকে চিটাগাং পৌঁছাতেই হবে। আপনারা যারা নেমে যেতে চান নেমে যান, আর যারা যেতে চান বসে থাকুন।”
আমার সামনে তো তখন একটাই লক্ষ্য—আমাকে যেভাবেই হোক জাহাজে যোগ দিতেই হবে! ভয়কে পেছনে ফেলে বাসে থেকে গেলাম আমি সহ মাত্র চার-পাঁচজন যাত্রী।
বাস ছুটল ঝড়ের গতিতে। দাউদকান্দি ফেরি, মেঘনা ফেরি পেরিয়ে বাস যখন কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করছে, তখন সামরিক বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেছে। সাঁজোয়া পোশাকের সেনারা আমাদের বাস থামাল। সবাইকে বাস থেকে নামিয়ে এনে একে একে পরীক্ষা করা শুরু হলো। হাত তুলে সবার কনুইয়ের চামড়া উল্টে দেখা হচ্ছিল!
উদ্দেশ্য—সেনাবাহিনীর কোনো পলাতক জোয়ান বা পোশাক বদলে পালানো কোনো সৈনিক বাসের ভেতরে লুকিয়ে আছে কি না।
আমাদের গায়ে সামরিক ছাঁটের কোনো চিহ্ন না পাওয়ায় সেনারা বাস ছেড়ে দিল। এরপর যেন বাসের গতি আরও বেড়ে গেল। ঢাকা থেকে আসা দিনের প্রথম এই বাসটিতে ছিল চট্টগ্রামগামী অজস্র জাতীয় দৈনিক পত্রিকা।
ফেনীর কাছাকাছি পৌঁছাতেই বাসের কন্ডাক্টর ভয়ে কেঁপে উঠে চালককে বলল, “ওস্তাদ, বাসে তো এক গাদা পত্রিকা রয়ে গেছে! সব পত্রিকার পাতায় পাতায় তো শেখ মুজিবের ছবি আর খবর। পথে জানাজানি হলে তো মহা বিপদ হবে!”
চালক বুদ্ধিমত্তা দেখালেন। ফেনীর কাছে একটা বড় পুকুর দেখে বাস থামিয়ে ঢাকার সমস্ত পত্রিকা—যার মধ্যে সিংহভাগই ছিল ‘দৈনিক ইত্তেফাক’—পুকুরের জলে ফেলে দেওয়া হলো।
সমস্ত বাধা পেরিয়ে দুপুর ঠিক ১টার সময় বাস চট্টগ্রামে পৌঁছাল। আমি তড়িঘড়ি করে দেওয়ানহাটের মোড়ে নেমে একটা রিকশা নিলাম। গন্তব্য—আমার বড় ভাইয়ের বাসভবন, রেলওয়ে কোয়ার্টার।
রিকশা থেকে নেমে দেখি পুরো পরিবার বাসার নিচে দাঁড়িয়ে আমার পথ চেয়ে আছে! আমার দুলাভাই নাকি ঢাকায় খবরের ভয়াবহতা জেনে ডেমরা ফেরিঘাট পর্যন্ত গাড়ি চালিয়ে ছুটে এসেছিলেন আমাকে ফিরিয়ে নিতে—কিন্তু ততক্ষণে আমার বাস নদী পার হয়ে অনেক দূর চলে গেছে!
আমাকে সশরীরে দেখার পর মা কেঁদে ফেললেন। সবাই আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর-সোহাগে ভাসিয়ে দিল। আশ্বাসের নিঃশ্বাস ফেলল পুরো পরিবার। ল্যান্ডফোনের ডায়াল ঘুরিয়ে ঢাকায় বড় বোনের বাসায় খবর জানিয়ে দেওয়া হলো—আমি নিরাপদে চট্টগ্রামে পৌঁছে গিয়েছি।
 ‘বাংলার উপহার’ ও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি
পরের দিন ১৬ই আগস্ট। চট্টগ্রাম জুড়ে থমথমে নিস্তব্ধতা। কোনো ঝুঁকি না নিয়ে সেদিন বাসাতেই কাটালাম। ১৭ বা ১৮ই আগস্টের দিকে রওনা হলাম বিএসসি অফিসের দিকে। গিয়ে দেখি পরিস্থিতি স্বাভাবিক, অফিস খোলা।
কর্তাব্যক্তিরা বললেন, “আপনার সিডিসি তোলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুন। আপনাকে বিএসসির জাহাজ ‘বাংলার উপহার’-এ দেওয়া হচ্ছে।”
বুকভরা উত্তেজনা আর চোখে হাজারও রঙিন স্বপ্ন নিয়ে আমি আর আমার বন্ধু, ক্যাডেট জাফর একসাথে পা রাখলাম ‘বাংলার উপহার’ জাহাজে।
শুরু হলো আমাদের সমুদ্র জীবনের প্রথম অধ্যায়। আমরা ভেবেছিলাম একাডেমি থেকে কঠিন মিলিটারি ট্রেনিং পার করে এসেছি, জাহাজের জীবন হয়তো রোমাঞ্চে ভরা হবে। সিনিয়র অফিসাররা আমাদের স্বাগত জানিয়ে কাজ বুঝিয়ে দেবেন, কেবিন দেখিয়ে দেবেন। কিন্তু জাহাজের গ্যাংওয়ে দিয়ে ওপরে উঠতেই বাস্তবতার প্রথম ধাক্কাটা অপেক্ষা করছিল!
আমরা যখন সুটকেস হাতে দুই তলার সিঁড়ি দিয়ে উঠছি, তখন ওপর থেকে রাশভারী গলায় একটা আওয়াজ এল— “Chief, send them to me!”
কথাটি যিনি বললেন, তিনি হলেন জাহাজের পোলিশ ক্যাপ্টেন—ভোদান কোরসাক। সেই আমলে বিএসসির জাহাজ কম থাকলেও অধিকাংশ জাহাজের দায়িত্বে ছিলেন বিদেশি, বিশেষ করে ব্রিটিশ ও পোলিশ অধিনায়করা।
ক্যাপ্টেনের রুমে গিয়ে আমরা সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। ক্যাপ্টেন ভোদান কোরসাক আমাদের দিকে একনজর তাকিয়ে অবহেলার সুরে বললেন, “You look very small! You go to my toilet and clean it!”
শুনেই মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ল! এত পড়াশোনা, এত প্রশিক্ষণ শেষ করে জাহাজে এসে প্রথম কাজ—ক্যাপ্টেনের টয়লেট পরিষ্কার করা?
ভেতরে ঢুকে দেখি সত্যিই তিনি টয়লেটটি ভীষণ নোংরা করে রেখেছেন। ভাবলাম, ফ্ল্যাশ করে দিয়ে পানি ঢেলে দিলেই তো হয়! কিন্তু হ্যান্ডেল চাপতেই দেখি ফ্ল্যাশ কাজ করছে না। ধূর্ত ক্যাপ্টেন আগেই পানির লাইন বন্ধ করে রেখেছিলেন, যাতে আমাকে নিজ হাতেই সব পরিষ্কার করতে হয়!
আমি বের হয়ে এসে বললাম, “Sir, the flush is not working.”
ক্যাপ্টেন শীতল গলায় উত্তর দিলেন, “That is not my job! You clean it!”
আত্মসম্মানে তীব্র আঘাত লাগলেও নিজেকে সামলে নিলাম। বালতিতে পানি এনে, কমোড ব্রাশ হাতে নিয়ে ঘষে ঘষে পুরো টয়লেট চকচকে করে পরিষ্কার করলাম।
কাজ শেষে বললাম, “Sir, job done.”
ক্যাপ্টেন মাথা নেড়ে বললেন, “Okay, you can go and report to the Chief Officer.” হাতে একটা কোকের ক্যান ধরিয়ে দিলেন। 
আমরা চিফ অফিসারের কাছে গিয়ে কিছুটা নালিশের সুরে ঘটনাটা বললাম। ভেবেছিলাম চিফ অফিসার তো আমাদেরই মেরিন একাডেমির প্রবীণ প্রাক্তন ছাত্র, তিনি হয়তো সহানুভূতি দেখাবেন।
কিন্তু চিফ অফিসার গম্ভীর মুখে এক ধমক দিয়ে বললেন, “Don’t talk much! This is part of your job !”
লোহার জাহাজে রোদের দিনপঞ্জি
আমাদের থাকার জন্য জাহাজের ভেতরে দেওয়া হলো একটা খুদে কেবিন। আমি উঠে পড়লাম ওপরের বাংকিং বেডে।
সকাল তখন প্রায় ১০টা কি ১১টা। কেবিনে জিনিসপত্র রাখার জন্য আধঘণ্টা সময়ও পেলাম না। হঠাৎ বাইরে থেকে হাঁক এল— “Come on, come on, quick, quick! wear boiler suit and come to the deck!”
তাড়াতাড়ি বয়লার স্যুট গায়ে জড়িয়ে ছুটে গেলাম ডেকে। চিফ অফিসার আমাদের দুজনের হাতে দুটি ভারী চিপিং হ্যামার (হাতুড়ি) ধরিয়ে দিয়ে জাহাজের একটা অংশ দেখিয়ে বললেন, “এই জায়গাটার মরচে ছাড়াও, চিপিং করো!”
আগস্ট মাসের তীব্র তাপদাহ। লোহার তৈরি জাহাজ যেন একটা ফুটন্ত কড়াই! সেই ধিকিধিকি রোদ আর উত্তপ্ত লোহার ওপর দাঁড়িয়ে হাতুড়ি দিয়ে মরচে ছাড়ানোর কাজ শুরু করলাম।
দুপুর ১২টা বাজতেই লাঞ্চের বিরতি হলো। চিফ অফিসার এসে বললেন, “Okay cadets, go and clean yourselves.”
আমরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। দ্রুত বয়লার স্যুট খুলে শরীর ধুয়ে আমাদের অফিসিয়াল ক্যাডেট ইউনিফর্ম পরে ডাইনিং হলে গেলাম। সবচেয়ে জুনিয়র ক্যাডেট হিসেবে ভেবেছিলাম এক কোণে শান্তিতে দুটো ভাত খাব।
হঠাৎ চিফ অফিসার ডেকে উঠলেন, “No no, Both of you come and sit beside me.
একদিকে সারা দিনের মারাত্মক শারীরিক ক্লান্তি ও পেটে তীব্র ক্ষুধা, অন্যদিকে অত বড় একজন সিনিয়র অফিসারের পাশে বসে কাঁচাকাঁচা চোখে চামচ আর কাটাচামচ দিয়ে খাওয়ার সেই কঠিন পরীক্ষা! প্রতিটা গ্রাস যেন গলায় আটকে যাচ্ছিল।
খাওয়ার শেষ হতেই চিফ অফিসার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, “Okay, take 15 minutes rest. Then back to the deck!”
মাত্র ১৫ মিনিটের বিরতি! আবার সেই বয়লার স্যুট পরা, আবার সেই রোদের তাপে লোহার ডেকে হাতুড়ি পেটা করা। সূর্য যখন মাথার ওপর থেকে পশ্চিমে ঢলে পড়ল, বিকেল ৫টায় অবশেষে আমাদের মুক্তি মিলল।
গোসল সেরে, শরীর থেকে লোহার ধুলোবালি ধুয়ে সন্ধ্যা ৬টায় আবার ডাইনিং টেবিলে চিফ অফিসারের সামনে বসে নীরব রাতের খাবার পর্ব শেষ করলাম।
ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া শরীর দুটো নিয়ে যখন অবশেষে আমাদের সেই ছোট্ট কেবিনে গিয়ে ঢুকলাম, আর নিজেদের সামলে রাখা গেল না। সারাদিনের সমস্ত অপমান, শরীরের যন্ত্রণা আর মনের ভেতরের জমাটবদ্ধ আক্রোশ আর ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি এক মুহূর্তে ফেটে পড়ল!
রুমের দরজা বন্ধ করে আমরা দুই বন্ধু মিলে ক্যাপ্টেন ভোদান কোরসাক আর সেই কঠোর চিফ অফিসারের ওপর মনের যত গালাগাল আর ক্ষোভ ছিল—সব উগড়ে দিতে লাগলাম।
এভাবেই অশ্রু, ক্ষোভ, রক্তচক্ষু আর চরম রোমাঞ্চের মধ্য দিয়ে সূচনা হয়েছিল আমাদের দূর সমুদ্রের জীবন।
প্রথম বিদেশি পোর্ট জিবুতি 
প্রায় ১২ দিন বঙ্গোপসাগর আর আরব সাগর পাড়ি দিয়ে বাংলার উপহার পৌঁছলো আফ্রিকার ছোট দেশ জিবুতি। উদ্দেশ্য বাংকার নেয়া। যাত্রা শুরু হলো একদিন পরেই।
লাল সাগরের নীল জল কেটে যখন আমাদের জাহাজ ‘বাংলার উপহার’ সুদান পোর্টের নোঙর করলো, তখন বিকেলের কড়া রোদটা একটু যেন ম্রিয়মাণ হয়ে আসছে। বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর আর লোহিত সাগরের কয়েক হাজার নটিক্যাল মাইল নোনা হাওয়া মেখে প্রাচীন আফ্রিকান বন্দরে পদার্পণ। জাহাজ বন্দরে নোঙর ফেলতেই পুরো নাবিকদলে এক ধরনের অলিখিত চঞ্চলতা শুরু হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ভেসে থাকার পর তীরের গন্ধ, ধুলোবালি আর মানুষের মুখ দেখার তৃষ্ণা সমুদ্রের মানুষদের বড় বেশি উতলা করে তোলে।
আমার সাথে নামলেন জাহাজের ফিফথ ইঞ্জিনিয়ার মতিউল মওলা ভাই। প্রয়াত মতিউল মওলা ভাই মানুষটা ছিলেন যেমন সরল, তেমনি অনুভূতির দিক দিয়ে বেশ খাঁটি। ইঞ্জিনের ঘোর লাগা অন্ধকার আর বয়লারের তীব্র উত্তাপের বাইরে এসে তীরের বাতাসে পা রাখতেই উনার মুখের চামড়া যেন একটু শিথিল হয়ে আসত। তবে সেকালের ইঞ্জিনরুমের কাজ তো আর আজকের মতো স্বয়ংক্রিয় ছিল না—ঘাম, গ্রিজ আর আগুনের তাপ গায়ে মেখে কঠিন পরিশ্রম করতে হতো। তাই তীরে নামতেই মতিউল মওলা ভাই যেন একটা দ্বিতীয় জীবন খুঁজে পেতেন।
আমাদের হাতে তখন এক প্যাকেট বিদেশি সিগারেট। বন্দর এলাকা পার হয়ে শহরের দিকে একটু এগোতেই লোকাল ক্রেতার দেখা মিলল। ভালো দামে সিগারেটগুলো হাতবদল হতেই মতিউল মওলা ভাইয়ের পকেটে যেমন খসখসে নগদ অর্থের ঝংকার, তেমনি চোখেমুখেও এক অদ্ভুত রোমাঞ্চের আভা। তখনই শহরের ধূলোমাখা রাস্তার ওপারে নজর যেতেই মতিউল ভাই আমার কনুইয়ে একটা মৃদু ধাক্কা দিলেন।
“হাবিব, দ্যাখো দ্যাখো! ওদিকে একটু তাকাও তো! কত সুন্দর কয়েকটা আরবি মেয়ে যাচ্ছে!”
আমি হেসে বললাম, “ভাই, সুন্দর তো বুঝলাম, কিন্তু আরবি মুলুকে তো আর শুধু তাকিয়ে থাকলে কাজ হবে না, কথাবার্তা না বললে তো কূল-কিনারা পাওয়া যাবে না।”
আমার চেয়ে তিন-চার বছরের সিনিয়র কর্মকর্তা উনি, কিন্তু উনার মনের সরল বালকভাবটা তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। চোখেমুখে আবদার ফুটিয়ে বললেন, “আমার না আরবি মেয়ে বড় পছন্দ হে! তুমি একটু একটা ব্যবস্থা করে দাও না ভাই? কটা দরকারি আরবি শব্দ অন্তত শিখিয়ে দাও!”
জাহাজে মাল ওঠানো-নামানোর দায়িত্বে থাকা স্টিভিডোরদের যে সুপারভাইজার ছিলেন, লোকটা ছিলেন বেশ ধার্মিক ও গম্ভীর মেজাজের। আমি উনার কাছে গিয়ে ধরলাম, “ভাই, সুপ্রভাত বলতে তো ‘সুবাহ আল খাইর’ জানি, কিন্তু কাউকে যদি বলতে চাই যে তুমি খুব সুন্দর, তবে সেটা কীভাবে বলব?”
সুপারভাইজার সাহেব একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে বললেন, “জামীলা! ‘জামীলা’ অর্থ সুন্দরী রমণী।”
কিন্তু মুখস্থবিদ্যার ঘোর আর ভাষার সূক্ষ্ম প্যাঁচের মারপ্যাঁচে আসল আর নকল গোলমাল হয়ে গেল। পরেরদিন জাহাজের ডেক থেকে শহরে নামার সময় মতিউল মওলা ভাই অনবরত সেই জাদুকরী বাক্যটি জপতে লাগলেন, যেমন করে ছোটবেলায় পরীক্ষার আগে ছাত্ররা মুখস্থ পড়া আওড়ায়।
সুদান পোর্টের লাগোয়া শহরটি তখন আকারে একেবারেই ছোট—আমাদের দেশের কোনো প্রত্যন্ত উপজেলা সদরের মতোই শান্ত ও কম জনবহুল। রোদে পোড়া বালুময় গলির মাথায় কয়েকজন স্থানীয় তরুণী হেঁটে যাচ্ছিল। মতিউল ভাই উৎসাহ ধরে রাখতে না পেরে বুক ফুলিয়ে একগাল হাসি হেসে ঠিক তাদের সামনে গিয়ে সগর্বে বকে উঠলেন, “আনা আনা আইজু বিন্তে জামীলা!”
যার সহজ অর্থ দাঁড়ায়—”আমি একটি সুন্দরী রমণী চাই!”
কথাটি বাতাসে ভেসে ওঠার সাথে সাথে ঘটে গেল এক অলৌকিক আর আকস্মিক পরিবর্তন। মেয়েটি থমকে দাঁড়াল। তার কৃষ্ণকালো দুটি চোখে পলকের মধ্যে ফুটে উঠল বিস্ময়, তারপর তীব্র ক্ষোভ! কটমট করে আমাদের দিকে তাকিয়ে সে এমন এক বিকট চিৎকার দিল এবং ঘুরেই কিসের যেন খোঁজে দৌড় লাগাল।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে আমাদের আর এক মুহূর্তও লাগল না। মতিউল মওলা ভাইয়ের হাতের সিগারেট যেন খসে পড়ার জোগাড়! “আরে ভাই, এ তো বাপ-ভাই ডেকে এনে পিঠের চামড়া তুলে ফেলবে!”
ব্যস! কোনো দিকে আর না তাকিয়ে দুই নাবিকের দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য উল্টো দৌড়! আরবি মেয়ের ভালোবাসার সাধ এক লহমায় উবে গিয়ে জায়গা নিল নিজের পিঠ বাঁচানোর তীব্র আকুতি। হাঁপাতে হাঁপাতে ‘ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন’—একদম জাহাজের গ্যাংওয়ে ধরে সোজা কেবিনে।
পরে সেই স্টিভিডোর সুপারভাইজারকে যখন হাঁপাতে হাঁপাতে পুরো ঘটনাটা খোলাসা করলাম, উনি তো মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। “নো নো নো! এ তোমরা কী বলেছ! এভাবে কখনো সম্ভ্রান্ত কোনো মেয়েকে বলা যায় নাকি!”
সেদিন আর আমাদের জাহাজের বাইরে এক পা-ও ফেলা হয়নি। পাছে ওই ছোট্ট শহরের গলিতে কেউ চিনে ফেলে আর আমাদের কপালে ‘জামীলা’ থেকে নিশ্চিত বড় কোনো ‘ঝামেলা’ নেমে আসে!
পরদিন মতিউল মওলা ভাই নিজের কপালে হাত দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, “ভাইরে, আর যা-ই করো, আমারে আর কোনোদিন ওই ‘জামীলা’ জপতে বইলো না!”
সমুদ্রের কত জল গড়িয়ে গেল, মতিউল মওলা ভাইও আজ আর এই পৃথিবীতে নেই। কিন্তু লোহিত সাগরের সেই ছোট্ট বন্দরের ধুলোবালি আর আমাদের দূরন্ত দৌড়ের স্মৃতি আজও মনের গহীনে এক চিলতে মিঠে রোদের মতো হেসে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ‘জামীলা’র ফাঁদে পড়েও সেযাত্রা বড় কোনো ‘ঝামেলা’র হাত থেকে যে রেহাই পেয়েছিলাম, সেটাই ছিল সেদিনের বঙ্গোপসাগর থেকে আসা দুই নাবিকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
পোর্ট সুদানের তপ্ত রোদে তখন খাঁ খাঁ করছে চারিদিক। তবে আমাদের জাহাজের পণ্য খালাসের কাজটা শেষ হয়ে গেল বেশ দ্রুতই। সাগরের নোনা হাওয়ায় গা ভাসিয়ে একটু জিরিয়ে নেওয়ার ফুরসত মিলবে কি না ভাবছিলাম, ঠিক তখনই বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন থেকে ক্যাপ্টেনের টেবিলে এসে পৌঁছাল এক জরুরি তারবার্তা। জাহাজ খালি করে বসে থাকার জো নেই; হুকুম এসেছে—এই খালি জাহাজ হাঁকিয়ে ছুটতে হবে সুদূর স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ সুইডেনে, কার্লসহ্যাম নামের এক অচেনা বন্দরে।
হিসেব কষে দেখা গেল, লোহিত সাগর পেরিয়ে সুয়েজ খাল ধরে ভূমধ্যসাগর আর আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে কার্লসহ্যামের দূরত্ব কম করে হলেও সাড়ে চার হাজার নটিক্যাল মাইল। পথটা চাট্টিখানি কথা নয়, বিশেষ করে খালি জাহাজে যখন সাগরের ঢেউয়ের দোলাটা একটু বেশিই চড়ে বসে। তবে ঈশ্বরের কৃপায় পথটা কেটে গেল বেশ নির্বিঘ্নেই। ব্রিটেনের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে ব্রিকসামে যখন পৌঁছালাম, তখন আবহাওয়া বেশ শান্ত। সেখান থেকে জাহাজে তোলা হলো অভিজ্ঞ নর্থ সি পাইলটকে। উত্তর সাগরের জটিল জলপথ পেরিয়ে অবশেষে একদিন আমাদের দানবাকৃতির জাহাজটি গিয়ে ভিড়ল সুইডেনের ছোট্ট কার্লসহ্যামের জেটিতে।
কার্লসহ্যাম ছবির মতো সাজানো এক শান্ত মফস্বল শহর। মূলত উন্নত মানের সিজন কাঠের বাণিজ্যের জন্যই এই বন্দরের খ্যাতি। তবে আমাদের জাহাজটি যখন খালের মতো সরু জলপথ চিরে একেবারে শহরের কোল ঘেঁষে ভেতরে ঢুকে পড়ল, তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হলো। স্থানীয়দের কাছে এত বড় জাহাজের আগমন ছিল একেবারেই অবিশ্বাস্য। পরদিন সকালে স্থানীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর পাতায় চোখ বুলিয়ে তো আমরা তাজ্জব! ফলাও করে ছাপা হয়েছে—কার্লসহ্যামের ইতিহাসে নাকি এত বড় জাহাজ এর আগে কখনো নোঙর ফেলেনি। জেটি আর শহরের কোনো দূরত্ব ছিল না বললেই চলে; ব্রিজে দাঁড়িয়ে ডেক থেকে নিচের দিকে তাকালে মনে হতো যেন গোটা শহরটাই আমাদের পায়ের তলায় হাতছানি দিচ্ছে।
বিকেলটা তো ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে কৌতূহলী চোখে শহর দেখে দেখেই কেটে গেল। আসল চমকটা অপেক্ষা করছিল পরদিন ভোরে। ঘুমভাঙা চোখে ডেকের রেলিংয়ে গিয়ে দাঁড়ায়ে দেখি এলাহি কাণ্ড! নিচে হাজারো মানুষের ভিড়। আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই দল বেঁধে জেটিতে হাজির হয়েছে আমাদের এই বিশাল জাহাজটা একনজর দেখার জন্য। আমরা তখন জাহাজে দুই নবীন ক্যাডেট—আমি আর বর্তমানের ক্যাপ্টেন জাফর। নিজেদের খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছিল বটে, তবে একটু ভয়ও ছিল। স্থানীয়রা নিচ থেকে ইশারা আর ভাঙা ইংরেজিতে আকুতি জানাতে লাগল তারা জাহাজের ভেতরে এসে দেখতে চায়। এত বড় সিদ্ধান্ত তো আমাদের হাতে নেই। ছুটলাম ক্যাপ্টেন বোদন কোরসাক আর আমাদের রাশভারী চিফ অফিসার মোখলেসুর রহমান সাহেবের কাছে।
ক্যাপ্টেন কোরসাক আর মোখলেসুর সাহেব কিছুক্ষণ গুম হয়ে ভাবলেন। তারপর মুখ তুলে বললেন, ঠিক আছে, ওদের উপরে আসতে দাও। অনুমতি মেলামাত্র শুরু হলো সিঁড়ি বেয়ে মানুষের স্রোত। শত শত কৌতূহলী চোখ ছুঁয়ে দেখছিল জাহাজের প্রতিটি ইঞ্চি। সেই ভিড়ের মাঝে কয়েকটি নিষ্পাপ সুইডিশ শিশু-কিশোর এসে ভিড় জমাল আমাদের কেবিনে। ওদের চোখেমুখে রোমাঞ্চ উপচে পড়ছে। আমাদের টেবিলে সাধারণ কিছু ম্যাচবক্স রাখা ছিল; দূর প্রাচ্য আর বিলেতি ছাপ মারা সেই সামান্য দিয়াশলাইয়ের বাক্সগুলো দেখেই ওদের সে কি নিখাদ আনন্দ! পরম আগ্রহে ওরা সেগুলো চেয়ে নিল। আমরাও ভালোবেসে ওদের হাতে তুলে দিলাম।
পরদিন বিকেলে ঘটল আরেক মিষ্টি ঘটনা। গতকাল আমাদের কেবিনে যে ছেলেরা এসেছিল, তারা হঠাৎ দুটি সুন্দর সাইকেল ঠেলে নিয়ে হাজির হলো গ্যাংওয়ের মুখে। সাইকেল দুটি আমাদের হাতে তুলে দিয়ে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল, তোমরা তো আমাদের মেহমান, এই সাইকেলে চড়ে মন ভরে আমাদের পুরো শহর ঘুরে এসো। সেই সাইকেলে চেপে কার্লসহ্যামের পরিচ্ছন্ন অলিগলিতে ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতি আজও আমার মনের মণিকোঠায় অমলিন।
সেখানেই এক বিকেলে আমরা অংশ নিয়েছিলাম একটি স্থানীয় মেলায়। আমাদের জাহাজের সুইডিশ এজেন্ট মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক। কথার ফাঁকে আমি তাকে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের দেশ তো পৃথিবীর অন্যতম সুখী দেশ হিসেবে পরিচিত, আপনাদের কোনো সামাজিক অভাব বা কষ্ট চোখে পড়ে না। তা আপনাদের জীবনে আসলে কোনো সমস্যা আছে? কথাটা শুনে ভদ্রলোক একগাল হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, আমাদের কোনো সমস্যা নেই, আর এটাই হলো আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা! মানুষের জীবনে কোনো উদ্বেগ নেই, লড়াই নেই—এই একঘেয়ে নিস্তরঙ্গ সুখই নাকি তাদের দীর্ঘশ্বাসের কারণ। গভীর সেই দার্শনিকের মতো কথা শুনে আমি আর জাফর কেবল মুখ চাওয়াচাওয়ি করেছিলাম। সেখান থেকে বাংলাদেশের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ সিজন কাঠ বোঝাই করে আমরা বিদায় জানালাম কার্লসহ্যামকে।
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ঠিক হলো নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত বন্দর রটারড্যাম। সমুদ্রের বুকে জীবনের গতিপথ ঠিক এভাবেই বাঁক নেয়। রটারড্যামের আকাশ তখন মেঘলা। সেখানে ভারতের জন্য বেশ বড় চালানের ময়দা লোড করা হলো। রটারড্যামে কার্গোর কাজ সেরে আমরা যখন জার্মানির হামবুর্গে নোঙর ফেললাম, তখন নতুন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হলো। এলবে নদীর বুকে আমাদের জাহাজ নোঙর করল বটে, কিন্তু নদীর মাঝখানে বার্জ ভিড়িয়ে সেখানে ভারী মেশিনারি ও যন্ত্রপাতি লোড করা হচ্ছিল। আমাদের তখন তরুণ বয়স, হামবুর্গের বিখ্যাত শহরটা একনজর ঘুরে দেখার জন্য মনটা ছটফট করছিল।
ছুটে গেলাম মোখলেসুর রহমান সাহেবের কাছে শোর লিভের অনুমতির দরখাস্ত নিয়ে। কিন্তু চিফ অফিসার একবাক্যে নাকচ করে দিয়ে কঠিন স্বরে বললেন, নো, নো শোর লিভ ফর ইউ! আমরা যতই মিনতি করি, তিনি ততই অনড়। একপর্যায়ে তিনি গম্ভীর মুখে বুঝিয়ে দিলেন, নদীর মাঝখানে মালামাল লোড হচ্ছে, কোনো ঝামেলা হলে সামলানো যাবে না। তাছাড়া বড়দের মুখে শুনলাম, হামবুর্গের রাতের শহর নানা রকম বিপথগামী প্রলোভন আর অখ্যাত ব্রোথেল-পাড়ার জন্য কুখ্যাত। তরুণ ক্যাডেটদের সেসব চক্কর থেকে বাঁচাতেই অভিভাবকতুল্য চিফ অফিসার আমাদের ডেক ছাড়ার অনুমতি দেননি। অগত্যা মন খারাপ করে জাহাজের রেলিং ধরে দূর থেকেই হামবুর্গের আলোর ঝলকানি দেখে সান্ত্বনা খুঁজতে হলো।
হামবুর্গ থেকে আমরা গেলাম লন্ডনের টেমসের মোহনায়, ঐতিহাসিক টিলবারি পোর্টে। সেখানে সামান্য কিছু কার্গো তোলা হলো বটে, কিন্তু ভাগ্যের ফেরে সেখানেও নামার সুযোগ জুটল না। এরপর সমস্ত মালামাল গুছিয়ে জাহাজ মুখ ঘোরাল ভারত মহাসাগরের দিকে। সুদূর লন্ডন থেকে টানা সাত হাজার তিনশো নটিক্যাল মাইল সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে আমাদের জাহাজ এসে নোঙর ফেলল মাদ্রাজে। মাদ্রাজের তীব্র ভ্যাপসা গরমে বেশ কিছুদিন ধরে নামানো হলো রটারড্যাম থেকে তুলে আনা সেই ময়দার বস্তা আর ভারী সব যন্ত্রপাতি।
মাদ্রাজের কাজ চুকিয়ে আমরা যখন কলকাতা বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম, তখনো আমরা কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি কী এক বজ্রপাত আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ক্যালকাটা পোর্টের মোহনায় পৌঁছে জাহাজ যখন জেটিতে ভিড়ছে, চারপাশের পরিবেশে এক অস্বাভাবিক স্তব্ধতা আর থমথমে ভাব দেখতে পেলাম। পাইলট থেকে শুরু করে জেটির কুলি, স্টেভেডর আর শ্রমিকদের মুখগুলো রক্তশূন্য, গম্ভীর। আমরা সিঁড়ি দিয়ে নামতেই সাধারণ ভারতীয় শ্রমিকরা কান্নায় ভেঙে পড়ে হাহাকার করে উঠল। ওদের ক্ষুব্ধ আর শোকাতুর কণ্ঠের একটাই আর্তনাদ—তোমরা এটা কী করলে! তোমরা তোমাদের বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেললে?
পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টের সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের খবর তখন গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। সাগরে বিচ্ছিন্ন থাকায় আমরা কিছুই জানতে পারিনি। হঠাৎ এই নৃশংস খবর শুনে আমাদের পায়ের নিচ থেকে যেন জাহাজের লোহার ডেক সরে গেল। বাঙালি নাবিক হিসেবে আমাদের বুকের ভেতর কী পরিমাণ রক্তক্ষরণ হচ্ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। জেটির মানুষগুলোর চোখে আমাদের দিকে এক মিশ্র আক্ষেপ আর করুণার দৃষ্টি। স্থানীয় এজেন্ট আর কর্মকর্তাদের আমি বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস চেপে শুধু এইটুকুই বললাম, আমরা জাহাজের সামান্য নাবিক, পলিটিক্সের খবর আমাদের জানা নেই; কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই শোক সইবার শক্তি আমাদেরও নেই। সেই মানুষগুলোর চোখে বঙ্গবন্ধুর প্রতি যে অকৃত্রিম ভালোবাসা আর আক্ষেপ দেখেছিলাম, তা কোনোদিন ভোলার নয়।
কলকাতায় বাকি পণ্য খালাসের পুরো সময়টা আমাদের কাটল এক অবর্ণনীয় বিষাদ আর গ্লানির ভেতর দিয়ে। এরপর অবশেষে একদিন জাহাজ এসে পৌঁছাল আমাদের চেনা ঘরের আঙিনায়—চট্টগ্রাম বন্দরে। নোঙর পড়ার পর সমস্ত মালামাল খালাসের মাধ্যমে শেষ হলো আমাদের জীবনের প্রথম দীর্ঘ, রোমাঞ্চকর এবং দিনশেষে এক গভীর বেদনায় মোড়া সমুদ্রযাত্রা।
সমুদ্রজয়ের প্রথম অধ্যায়: স্মৃতিঘেরা জীবনগাথা
চারটি দীর্ঘ ও কঠিন বছরের ডেক ক্যাডেট জীবন শেষ করার পর অবশেষে সামনে এসে দাঁড়াল সেই বহু কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত—পরীক্ষাপর্ব। প্রথম পরীক্ষা, সেকেন্ড অফিসার হওয়ার লড়াই।  বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) থেকে কোনো স্কলারশিপ আমি পাই নাই। তবে মনের ভেতরে একটা দারুণ আত্মতৃপ্তি আর বড় ধরনের গর্বের বিষয় ছিল—আমি আমার ব্যাচের সবার আগে সি-টাইম শেষ করেছি। তাই স্কলারশিপের আশায় বসে না থেকে সিদ্ধান্ত নিলাম, নিজের খরচেই পরীক্ষা দিতে বিলেতে যাব।
নিজের খরচে যেতে হলে বিএসসির একটা নিয়মনীতি ছিল। তারা ছয় মাসের স্টাডি লিভের সমপরিমাণ বেতনের বৈদেশিক মুদ্রা  দিত। পারমানেন্ট অফিসার হিসেবে ছয় মাসের যে বেতনটা পেতাম, ওইটাকে তারা কনভার্ট করে পাউন্ড হিসেবে আমাদের হাতে বুঝিয়ে দিত। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের এটা জানা খুব দরকার যে আমাদের সেই সময়ের ব্যবস্থাগুলো কেমন ছিল।
আমার স্পষ্ট খেয়াল আছে, প্রথম যাত্রা করে যখন লন্ডনে পৌঁছে সেখানকার শিপিং কর্পোরেশন অফিসে গিয়ে রিপোর্ট করি, তখন আমার হাতে ৪,২৭৯ পাউন্ডের একটা চেক তুলে দেওয়া হয়েছিল। বলল, “আপনি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুমে সেখানে জমা করবেন”। ব্যস, আমাদের পরীক্ষা প্রস্তুতির মূল যাত্রা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে গেল। আর এই যাত্রার সূচনা হয়েছিল আমাদের ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে।
বরফে ঢাকা বিলেত ও অনিশ্চিত সাউথশিল্ড
১৯৭৯ সালের ৫ই জানুয়ারি। তৎকালীন তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে ডাইরেক্ট ম্যাকডোনাল্ড ডগলাস বিমানে চেপে আমরা রওনা হলাম। বিমানে উঠে দেখি আমাদের বেশ কয়েকজন সিনিয়রও আছেন, যাঁরা সম্ভবত সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বা অন্যান্য উচ্চতর কোর্স করতে যাচ্ছেন। আমার সাথে ছিল আমারই ব্যাচমেট ক্যাপ্টেন সাবেদ (যে এখন সিঙ্গাপুরে থাকে)।
ঢাকা থেকে লন্ডন তৎকালীন সরাসরি ফ্লাইট ছিল, তাই যাত্রাটা ভালোই কাটছিল। কিন্তু লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরের কাছাকাছি পৌঁছাতেই দেখা গেল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য—চারিদিকে শুধু বরফ আর বরফ! কুয়াশা আর ঘন বরফের কারণে হিথ্রোতে প্লেন ল্যান্ড করতেই দিচ্ছে না। লন্ডনে তো তিনটা বিমানবন্দর—স্ট্যান্ডস্টেড, গ্যাটউইক আর হিথ্রো। তখন আমাদের বিমানটিকে স্ট্যান্ডস্টেড এয়ারপোর্টে নামিয়ে দেওয়া হলো। সেখান থেকে ল্যান্ড করার পর ওদের নিজস্ব গাড়িতে করে আমাদের হিথ্রো বিমানবন্দরে নিয়ে আসা হলো।
হিথ্রোতে নামার ঠিক আগে, বিমানের ভেতরে আমার এক সিনিয়র ভাই (নামটা ঠিক মনে নেই, সম্ভবত চীফ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য যাচ্ছিলেন) জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা লন্ডনে উঠেছ কোথায়?” আমি বললাম, “আমি তো জানি না!” উনি তো অবাক! বললেন, “বলো কী! তোমাদের থাকার কোনো জায়গা নেই? এভাবে চলে আসছ কেন?” আমি হেসে বললাম, “আইসা পড়ছি!” তখন আমার বন্ধু সাবেদ বলল, “ডোন্ট ওয়ারি, আমার এক ভাই এখানে থাকে, দেখি ওখানে কিছু ম্যানেজ করা যায় কিনা।” অর্থাৎ, বলতে গেলে চরম এক অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়েই আমরা বিলেতের মাটিতে পা রাখলাম।
লন্ডনে নামার পর সাবেদ তার ভাইয়ের বাসার ঠিকানা দিল এবং আমরা সেখানে গিয়ে উঠলাম। গিয়ে দেখি ঠান্ডার মধ্যে উনার ভাইয়ের জুবুথুবু অবস্থা! উনি নিজেও খুব কষ্টে ছিলেন। কিন্তু আমাদের তো কোনো উপায় ছিল না। ভাবলাম, কোনো রকমে একটা রাত কাটাই, কারণ সেদিন ছিল রোববার। পরের দিন সোমবারে আমরা বিএসসি অফিসে যাব।
পরের দিন বিএসসি অফিসে যাওয়ার পর কর্মকর্তারা বললেন, “এই যে তোমাদের চেক, আর এই তোমাদের কাগজপত্র। ইউ হ্যাভ বিন গ্র্যান্টেড দিস।” চেক হাতে পাওয়ার পর আমরা সেখান থেকে চলে গেলাম রেলস্টেশনে। ধরলাম একটা এক্সপ্রেস ট্রেন—প্রথমবার দেখলাম ইন্টারসিটি ট্রেন! লন্ডন থেকে নিউক্যাসেল, ভাড়া ছিল মাত্র ১৬ পাউন্ড। ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাসের কথা বলছি।
আমরা যখন নিউক্যাসেল নামলাম, সেটা তো আরও উত্তরের এলাকা—চারিদিকে বরফে ধবধব করছে! কিন্তু আমাদের যেতে হবে আরও একটি ছোট শহরে, যেখানে আমাদের মেরিন কলেজ অবস্থিত। সেটার নাম সাউথশিল্ড।
এখন নিউক্যাসেল থেকে সাউথশিল্ডে কীভাবে যাব? কোনো জানাশোনা বা চেনা পরিচিত কিচ্ছু নেই, কোথায় উঠব তা-ও জানি না! আমি আর সাবেদ লাগেজ নিয়ে খালি ঘুরতেছি আর ভাবছি কই যাওয়া যায়। তখন সাবেদ বলল, “আরে, সাউথশিল্ডে তো অনেক বাঙালি হোটেল আর রেস্টুরেন্ট আছে, এখানে এক না এক বাঙালিকে ঠিকই পেয়ে যাব।”
ঠিকই ঘুরতে ঘুরতে আমরা এক বাঙালিকে পেয়ে গেলাম—নাম রাফাতুর রহমান। উনি আমাদের অনেক সিনিয়র ছিলেন, কিন্তু সি-টাইম শেষ করে পরীক্ষায় পাস করতে পারেননি। একপর্যায়ে টাকা-পয়সা শেষ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে রেস্টুরেন্টে কাজ শুরু করেছিলেন। রফাতুর রহমান ভাই লোক হিসেবে দারুণ দয়াপরশ ও ভালো ছিলেন।
আমদের দেখে উনি বললেন, “আগে তোমরা বসো, খাও।” আমরা বললাম, “ভাই, আমরা অনেক কষ্ট করে আসছি।” উনি আশ্বস্ত করে বললেন, “কোনো কষ্ট নেই, তোমাদের উঠার ব্যবস্থা আমি করে দিচ্ছি।”
আমরা খাওয়া-দাওয়া শেষ করলাম। উনি বললেন, “এবার আমার সাথে এসো।” ছোট শহর, হাঁটতে হাঁটতে আমরা মে স্ট্রিন্ট (মে স্ট্রিট, সাউথশিল্ড) নামে একটা জায়গায় আসলাম। উনি একটা বাড়ি দেখিয়ে বললেন, এই বাসায় ক্যাপ্টেন খায়রুল আনাম নামে একজন থাকেন (যিনি তখন চিফ অফিসারের কোর্স করছিলেন) এবং আরও অনেক বাংলাদেশী থাকেন। সাবেদ অন্য এক জায়গায় উঠলো। আমি বললাম, “তাহলে আমি আনাম ভাইয়ের ওখানে যাই।” শুরু হলো আমাদের নতুন পর্বের ছাত্রজীবন।
এক টানে পাস ও স্কটল্যান্ডের স্ট্রবেরি মেমোরি
আমাদের এই ছাত্রজীবনটা ছিল বেশ স্বল্পমেয়াদী। পড়ালেখার পাঠ আমি খুব দ্রুতই শেষ করে ফেলেছিলাম। জানুয়ারি মাসেই কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম, তারপর ঠিক ছয় মাসের মাথায় জুলাই মাসে আমি সেকেন্ড মেট পরীক্ষা দেই এবং এক টানেই পাস করে গেলাম!
ঐ সময়টাতে আমরা তিন বন্ধু একসাথে থাকতাম—আমার সিনিয়র ক্যাপ্টেন খাইরুল আনাম, আমি, আর আমাদের ব্যাচমেট ক্যাপ্টেন শাহেদ চৌধুরী, যে পরে এসে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিল।
পরীক্ষা দেওয়ার পর থেকেই বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানি থেকে চাকরির অফার আসতে শুরু করল। নিয়ম অনুযায়ী বিএসসি বলেছিল, “তোমরা পরীক্ষায় পাস করার পর সরাসরি লন্ডন অফিসে রিপোর্ট করবে এবং তোমাদের দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।” বিএসসি এটাও জানতো যে ক্যাডেটরা পাস করার পর অন্তত ছয় মাস বাইরে কাজ করে কিছু টাকা জোগাড় করে দেশে ফেরে। আমরাও সেরকম একটা সুযোগ খুঁজছিলাম।
পরীক্ষা পাশ করার পর একটা অদ্ভুত মেসেজ আসল। মেসেজে বলা হলো, “ইউ ক্যান কল ইউএসএ।” এবং নাম্বার দিয়ে বলা হলো ‘রিভার্স দ্য চার্জ’ (অর্থাৎ ফোন চার্জ তারা দেবে)।
আমি তৎক্ষণাৎ বাইরে একটা বুথ থেকে নির্দিষ্ট নম্বরে ফোন করলাম। ফোনটা ধরলেন কে জানেন? জনাব আব্দুল আউয়াল মিন্টু! উনি আমাকে বললেন, “হ্যাঁ, তোমরা তো এখানে অনেক অফিসার আছো যারা চাকরির জন্য চেষ্টা করছ। তোমাকে আমি একটা অফার দিচ্ছি। আমি এখানকার ‘ব্রেসনান শিপিং কোম্পানি’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট।”  উনি ছিলেন আমাদের একাডেমির ৬ষ্ঠ ব্যাচের ক্যাডেট।
আমি বললাম, “ঠিক আছে স্যার, আমি আপনাকে জানাব  এবং বললাম, স্যার আমি আমার এক বন্ধুর বাসায় একটু ছুটি কাটাতে যেতে চাই।” উনি বললেন, “হ্যাঁ, যাও। তবে তোমাকে জানিয়ে রাখি, তোমার স্যালারি হবে ১৬০০ ডলার।”
চিন্তা করা যায়? ঐ সময়ে ১৬০০ ডলার স্যালারি! আমি আমার রুমমেট ক্যাপ্টেন খাইরুল ভাইয়ের সাথে পরামর্শ করতেই উনি বললেন, “না না, এখনই তাড়াহুড়ো করো না। ওয়েট করো, আরও অনেক ভালো অফার পাবে। ইউ জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি।”
আমি ভাবলাম, ঠিকই তো, একটু অপেক্ষা করি। তখনো কিন্তু পরীক্ষার পাস করার মূল হার্ডকপি সার্টিফিকেট পাইনি, একটা অফিশিয়াল স্লিপ বা ‘চিট’ পেয়েছিলাম যেখানে লেখা ছিল ‘ইউ হ্যাভ পাসড’। ঐ কাগজটা নিয়েই আমরা বন্ধুরা মিলে বেশ খাওয়া-দাওয়া আর আনন্দ-উৎসব করলাম।
তারপরে আমি চলে গেলাম ডান্ডি। সাউথশিল্ড থেকে ডান্ডি ইন্টারসিটিতে প্রায় তিন ঘণ্টার রাস্তা। ডান্ডিতে যাওয়ার পেছনে একটা বিশেষ কারণ ছিল। সেখানে আমার এক পুরনো স্কটিশ বন্ধু থাকতেন—ক্যাপ্টেন এলাস্টার ক্যাম্পবেল। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে উনার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল।
ডান্ডির কাছেই একটা সুন্দর উপশহরে ক্যাপ্টেন ক্যাম্পবেলের বিশাল এক বাড়ি। উনি আমাকে খুব সাদরে গ্রহণ করলেন, ঘুরালেন-ফেরালেন। একদিন দেখলাম ওখানে স্ট্রবেরি তোলার কাজ চলছে। আমি দেখে বললাম, “আমিও স্ট্রবেরি তুলব!” উনি বললেন, “ঠিক আছে, তুমি তাহলে অন-পেমেন্টে তোলো। এক ঘণ্টায় যতগুলো তুলবে, তোমাকে নির্দিষ্ট পাউন্ড দেওয়া হবে।”
প্রতি ঘণ্টার জন্য এক পাউন্ড! খারাপ কী? তিন-চার ঘণ্টা স্ট্রবেরি তুলে তিন-চার পাউন্ড কামিয়ে ফেললাম, আর সেই সাথে নিজের পেটেও চালান করলাম প্রচুর তাজা স্ট্রবেরি। প্রথম জীবনের এই অভিজ্ঞতাটা ছিল চমৎকার।
ক্যাম্পবেল সাহেবের বাড়িতে এক রাত থাকার পর দ্বিতীয় রাতেই একটা ফোন আসল। কারণ পাস করার পর আমি অনেক শিপিং কোম্পানিতে আমার কন্টাক্ট নম্বর ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। ফোনের ওপাশ থেকে বলা হলো, “একটা ভালো অফার আছে। তুমি যদি চাকরি করতে চাও, আমরা তোমাকে টেলিগ্রাম পাঠাচ্ছি।” (তখন টেলিগ্রাম খুব দ্রুত পৌঁছাত)।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “বেতন কত?” বলল, “১৯০০ ডলার!” জিজ্ঞেস করলাম, “কোথায় জয়েন করতে হবে?” বলল, “লিভারপুলে গিয়ে জয়েন করতে হবে।” আমি মনে মনে ভাবলাম, যাক সবকিছু অন্তত ইংল্যান্ডের ভেতরেই আছে।
আমি আবার আমার সেই বন্ধু ক্যাপ্টেন খাইরুলের সাথে ফোনে যোগাযোগ করে বললাম, “১৯০০ ডলারের অফার এসেছে।” উনি বললেন, “খুব ভালো অফার! যদিও ২০০০ ডলারেও অনেকে গেছে, তবুও তুমি আর দেরি না করে জয়েন করে যাও।” এরপর আমি লিভারপুলে এমভি আরাম বি জাহাজে সেকেন্ড অফিসার হিসেবে যোগ দিলাম।
আম-ছালা, স্ক্র্যাপ ইয়ার্ড ও মাদাগাস্কারের অভিজ্ঞতা
জাহাজ থেকে মাল খালাসের (ডিসচার্জ) সময় মাঝেমধ্যেই তীরের লোকজন বা এজেন্টের মাধ্যমে লোকাল জিনিসপত্র কেনার সুযোগ হতো। একবার এমনই এক বন্দরে জাহাজের এজেন্টের কাছে জিজ্ঞেস করা হলো স্থানীয় আম পাওয়া যাবে কিনা। এজেন্ট আশ্বাস দিল এবং জনপ্রতি মাত্র ১ ডলার করে মোট ২ ডলার নেওয়া হলো।
কিন্তু এর পরের ঘটনা বেশ মজার। প্রতিদিন একটা করে বার্জ আসে, জাহাজে কার্গো ওঠে—কিন্তু আমের দেখা নেই! জাহাজের সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার রসিকতা করে বলেই ফেললেন, “বাংলায় একটা প্রবাদ আছে না, আমও গেল, ছালাও গেল! আমাদের টাকাটাও মনে হয় গেল।”
তবে পরে ভুল ভাঙল। ঘাটে বেশ শোরগোল ফেলে এক ঢাউস বার্জ এসে হাজির। ক্যাডেটদের দ্রুত ক্রেন নামাতে বলা হলো। নিচে নেমে পাওয়া গেল বিশালাকার দুই বস্তা তাজা আম—মাত্র ২ ডলারে!
আমগুলো উদ্ধার করে ক্রুরা কেবিনের সামনে রাখল। পুরো জাহাজে যেন এক আনন্দের উৎসব শুরু হয়ে গেল। সবাই মিলে পেট পুরে আম খাওয়া হলো। জাহাজের বিদেশি ক্যাপ্টেনকে প্রথমে অনেক সাধাসাধি করে এক ফালি আম কেটে দেওয়া হলো। মিষ্টি আর রসাল সেই আম মুখে দিয়েই ক্যাপ্টেনের চোখ-মুখ বদলে গেল। কুনুই বেয়ে রস গড়াচ্ছে, আর তিনি পরম তৃপ্তিতে তাও খেয়েছেন। তিনি মুগ্ধ হয়ে বললেন, “আই উইল নাও অর্ডার!” ক্যাপ্টেন নিজেও আবার এক বস্তা আম অর্ডার করে ফেললেন।
আমের এই রসালো পর্ব শেষ করে, মালামাল লোড শেষে সিঙ্গাপুর হয়ে জাহাজ পৌঁছাল জাপানে। সেখানে এক নতুন বার্তা অপেক্ষা করছিল। কোম্পানি সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই জাহাজ আর চালানো হবে না, স্ক্র্যাপ (ভাঙা) করার জন্য বেচে দেওয়া হবে।
জাপান থেকে তিন-চার দিনের পথ অতিক্রম করে জাহাজটিকে তাইওয়ানের স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হলো। সব ক্রু ও অফিসারদের নামিয়ে হোটেলে তোলা হলো। লন্ডনে অবস্থিত ইসরায়েলি মালিকানাধীন মূল কোম্পানি থেকে বার্তা এলো—সেকেন্ড অফিসার হিসেবে পারফরম্যান্স ভালো হওয়ায় ডিমান্ড অনেক বেড়ে গেছে, তাই তাকে অন্য আরেকটা জাহাজে পোস্টিং দেওয়া হবে। কিন্তু বিপত্তি বাঁধল পাসপোর্টে! তৎকালীন বাংলাদেশি পাসপোর্টে স্পষ্ট লেখা থাকত: “এক্সেপ্ট তাইওয়ান অ্যান্ড ইসরায়েল”। ফলে তাইওয়ান থেকে তাকে সরাসরি নতুন জাহাজে পাঠানো আইনি জটিলতার কারণে সম্ভব হচ্ছিল না।
আরেকটি জাহাজের অভিজ্ঞতার কথা ধরা যাক, যখন জাহাজ নোঙর করল মাদাগাস্কারে। নেভিগেশন চার্ট ধরে বহুকষ্টে পোর্টে পৌঁছানো গেল। তবে এটাকে বন্দর না বলে এক বিশাল জঙ্গল বলাই ভালো! চারপাশ নিঝুম, কোনো আলো নেই। চারপাশে শুধু ঘন জঙ্গল আর শান্ত সমুদ্র।
পরদিন সকালে এক অদ্ভুত ‘ডুক ডুক’ শব্দে সবার নজর গেল সমুদ্রের দিকে। ভিএইচএফ রেডিওর কোনো যোগাযোগ ছাড়াই একটি ছোট টাগবোট জাহাজের দিকে আসছে। চিফ অফিসার খানিকটা শঙ্কিত হয়ে বললেন, “ডাকাত নাকি রে বাবা!”
টাগবোট থেকে একজন লোক ইশারায় তাদের সিঁড়ি নামাতে বলল এবং নিজেকে এজেন্ট হিসেবে পরিচয় দিল। ব্রিজে উঠে এসেই লোকটির প্রথম কথা, “তোমাদের জাহাজের পজিশন ঠিক নেই, নোঙর আরেকটু দূরে ফেলতে হবে।”
চিফ অফিসার দ্রুত গিয়ে নোঙর তুললেন। লোকটি নির্দেশ দিল, “ইঞ্জিন চালু করো… একটু সামনে যাও… ওকে, স্টপ! ড্রপ নোঙর!”
পজিশন চার্ট খাতা খুলে দেখা গেল, জাহাজ ঠিক আগের জায়গাতেই আছে! বিষয়টি দেখে তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, “তুমি তো এজেন্ট, পাইলট হলে কবে থেকে?” লোকটির সপ্রতিভ উত্তর, “আই অ্যাম এজেন্ট, আই অ্যাম পাইলট, আই অ্যাম এভরিথিং!” সমুদ্রের বুকে তার সাথে আর তর্ক না বাড়িয়ে সবাই শান্ত রইল।
এরপর জানতে চাওয়া হলো কার্গো লোডিং কবে শুরু হবে। সে জানাল, প্রতিদিন একটি করে বার্জ আসবে এবং সমুদ্রের মাঝেই জাহাজে ‘ক্রোম ওর’ লোড করা হবে। এভাবেই এই নির্জন জঙ্গলঘেরা দ্বীপে আট থেকে নয় হাজার টন ক্রোম ওর লোড করার অভিযান শুরু হয়েছিল। #
আটলান্টিকের ঢেউ ও হৃদয়ের ধ্রুবতারা
সমুদ্রের অসীম নীল জলরাশি যখন দিগন্তের সীমানা মুছে দেয়, তখন নিঃসঙ্গ জাহাজের বিশালতায় বেঁচে থাকার জন্য মানুষের একটিই ধ্রুবতারা লাগে—ভালোবাসার মানুষের স্মৃতির উষ্ণতা। আমার কাছে সেই ধ্রুবতারাটি ছিল তাঁর মুখ।
১৯৭৬ সাল। বড় ভাইয়ের বিয়ের সুবাদে চট্টগ্রাম রেলওয়ে কোয়ার্টারের শান্ত ও মেঠো পথে হাঁটাহাঁটির দিনগুলোতে প্রথমবার তাকে দেখেছিলাম। ঢাকায় তখন সে নবম-দশম শ্রেণিতে পড়ে, সম্পর্কে আমার আপন ভাবীর ছোট বোন। প্রথম দর্শনেই যেন এক অদৃশ্য জাদুদণ্ড আমাকে ছুঁয়ে গিয়েছিল। রেলওয়ে কোয়ার্টারের সামনে তাঁকে নিয়ে একটু হাঁটার সেই সংক্ষিপ্ত সময়গুলোতেই হৃদয়ের গহীনে এক সুগভীর প্রেমের অঙ্কুরোদ্গম ঘটেছিল, যা পরবর্তী সময়ে আমার জীবনের গতিপথই বদলে দেয়।
নাবিকের পেশা মানেই ঘরবাড়ি ছেড়ে হাজার হাজার মাইল দূরের অচেনা ভুবনে ভেসে থাকা। কিন্তু আমার সমস্ত মন সর্বদা পড়ে থাকত ঢাকার সেই পরিচিত মানুষটির কাছে। জাহাজে বসে মাঝরাত্রে যখন বিশাল সমুদ্রের নীরবতা আমাকে ঘিরে ধরত, তখন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকার রঙিন পাতা থেকে সুন্দর কোনো ফুলের ছবি খুব যত্ন করে কেটে নিতাম। সেই ছবির নিচে লিখে দিতাম হৃদয়ের আকুল করা দু-লাইন অনুভূতি। তারপর বন্দর ছোঁয়ামাত্রই এজেন্টের মাধ্যমে পোস্ট করে দিতাম তাঁর কাছে। শুরু হলো চিঠি দেওয়া-নেওয়ার এক অদ্ভুত মায়াবী অধ্যায়।
ডান্ডি পোর্টের রোমাঞ্চ ও কেবিনের সেই সুবিশাল ছবি
ইউকে-কন্টিনেন্টাল রুটে তখন আমাদের একাধিক জাহাজ চলাচল করত। দেশের পরিবারগুলো আমাদের চিঠি পাঠাত লন্ডনের ‘সাউথওয়ার্ক’ বিএসসি আঞ্চলিক অফিসে। সেখান থেকে বিএসসির কর্মীরা বিভিন্ন জাহাজের গন্তব্য বুঝে চিঠিগুলো স্কটল্যান্ডের ডান্ডি পোর্টে ফরোয়ার্ড করে দিত। এক-দেড় মাস সমুদ্রের অতলে কাটানোর পর ডান্ডি পোর্টে নোঙর ফেলতেই আমাদের প্রধান থ্রিল ছিল—‘কার কটা চিঠি এসেছে?’
ক্যাপ্টেন যখন নিজের রুমে ডেকে সহাস্যে বলতেন, “এই হাবিব, নাও তোমার তিনটি চিঠি!”—তখন বুকের ভেতর এক অচেনা তোলপাড় শুরু হতো। সপ্তাহের পর সপ্তাহ জমে থাকা সেইসব চিঠির ভিড়ে সবচেয়ে বেশি প্রতীক্ষিত ছিল আমার প্রেয়সীর চিঠিটি।
প্রেমের এই রূপকথা শুধু চিঠিতেই থমকে থাকেনি। সঙ্গে থাকা কোডাক ক্যামেরায় একসময় তাঁর একটি ছোট ছবি তুলেছিলাম। পরবর্তীতে ডান্ডি পোর্টে পৌঁছে সেই ছোট্ট ছবিটিকে ল্যাব থেকে এত সুবিশাল সাইজে প্রিন্ট করিয়েছিলাম, যা ছিল যেকোনো মানুষের কল্পনার বাইরে! সেই বিশাল ছবি আমি আমার জাহাজের কেবিনের দেয়ালে টাঙিয়ে রাখতাম।
জাহাজে প্রতি সপ্তাহে বা ১৫ দিন পর পর যখন নিয়মমতো ‘ক্যাপ্টেনস রাউন্ড’ হতো—জাহাজের ঘরদোর পরিষ্কার আছে কিনা বা কোনো সমস্যা আছে কিনা দেখার জন্য—তখন ক্যাপ্টেন সাহেব ও তাঁর স্ত্রী আমার কেবিনে ঢুকেই সেই টাঙানো ছবি দেখে হেসে খুন হতে। আমাকে নিয়ে প্রচুর খোঁচা দিতেন, লজ্জা দিতেন আর মিষ্টি জোকস করতেন। ডান্ডিতে সবচেয়ে বেশি চিঠি আসত আমারই, আর ক্যাপ্টেন ও ভাবীর সেই খুনসুটিগুলো সমুদ্রের একঘেয়ে জীবনকে এক অদ্ভুত আনন্দে ভরিয়ে দিত।
প্রতিকূলতার ঝড় ও দক্ষিণ শিল্ডসের দিনগুলো
কিন্তু প্রতিটি রূপকথার প্রেমেই থাকে কঠিন ঝড়ের আগমনী বার্তা। আমাদের এই সম্পর্ক দুই পরিবারের কাছে খুব সহজভাবে গৃহীত হয়নি। বিশেষ করে আমার নিজের পরিবার বা বড় বোন এটি একদমই পছন্দ করতেন না। “একই ঘরে আবার কিসের সম্পর্ক?”—এমন নানান কঠিন প্রশ্ন ও রক্তচক্ষুর মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাকে। আম্মা এবং বড় বোন ছিলেন বেশ শক্ত মেজাজের মানুষ, তাই সরাসরি তাঁদের অমতে গিয়ে কিছু করা অসম্ভব ছিল। কিন্তু সাগরের নীল জলরাশির নীরবতা আর হাজার মাইলের ব্যবধান অতিক্রম করা ওই রঙিন চিঠিগুলো আমাদের আত্মিক বন্ধনকে প্রতিদিন আরও দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করেছিল।
আমার সমস্ত মন পড়ে ছিল কেবল একটি জিনিসের ওপর—কখন শেষ হবে এই দীর্ঘ সি-টাইমের অপেক্ষা। অবশেষে ১৯৭৯ সালে সমুদ্রের নির্দিষ্ট কাজের মেয়াদ (সি-টাইম) পূর্ণ করে ফার্স্ট ক্লাস নেভিগেশনাল সার্টিফিকেটের (সেকেন্ড মেট) পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসেলের সাউথ শিল্ডস শহরে পৌঁছালাম।
মাথার ভেতর তখন একটাই নিখুঁত পরিকল্পনা—ডিগ্রি পেলেই জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করব, কারণ সেকেন্ড মেটদের সমুদ্রযাত্রায় পরিবারকে সাথে রাখার অধিকার মেলে। পরীক্ষার কঠিন পড়াশোনা আর দেশের মাটিতে ফেলে আসা ভালোবাসার তীব্র টান—সব মিলিয়ে দ্রুত দেশে ফেরার এক বিপুল ব্যাকুলতা তৈরি হয়েছিল আমার ভেতরে।
শ্রাবণের বৃষ্টি, পুরান ঢাকার কাজী অফিস ও এক ঐতিহাসিক বিয়ে
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সময়ে লন্ডনের পাট চুকিয়ে দেশে ফিরে আসি। প্রেমটা দুই পরিবারের কাছে কিছুটা জানা থাকলেও, হঠাৎ বিয়ের সিদ্ধান্তের কথা বড় ভাই বা কঠোর স্বভাবের মাকে সরাসরি জানানোর মতো সাহস আমাদের হচ্ছিল না। তবে আমাদের ভালোবাসার গভীরতা ও অটল সংকল্প দেখে শেষ পর্যন্ত এক ফুফা পরম মমতায় আমাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন।
আশির দশকের আগস্ট মাসের এক বৃষ্টিমুখর দিন। চট্টগ্রাম থেকে বন্ধু মান্নান হেলালের সাহায্যে আমরা রওনা হলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। ঢাকার পুরান ঢাকার এক কাজী অফিসে গিয়ে পরিবারের অজান্তে পরম গোপনীয়তায় আমরা দুজন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলাম। সেদিন আমাদের এই ঐতিহাসিক বিয়ের সাক্ষী হিসেবে রেজিস্টারে স্বাক্ষর করেছিলেন মান্নান, হেলালের ছোট ভাই—যিনি পরবর্তীতে বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর প্রধান পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
প্রেমিকা থেকে রাতারাতি আমার স্ত্রী হয়ে যাওয়া সেই তরুণী তখন হোম ইকোনমিক্স কলেজের ছাত্রী। বিয়ের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তাঁকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বাসায় পৌঁছে দিলাম। ঘটনাটি বেশ কিছুদিনের জন্য পরিবারের তীব্র নজরদারি থেকে একদম আড়ালে রেখেছিলাম আমরা।
গোপনে দেখা করা, আড়ালে ভালোবাসার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা আর দীর্ঘ চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে আমাদের ভালোবাসার পূর্ণতা পেল। সকল প্রতিকূলতার জমাট বরফ গলিয়ে, আমরা আমাদের নতুন সংসার গুছিয়ে নিলাম।
প্রেমের সেই রোমাঞ্চকর অধ্যায়, শত বাধা ডিঙানোর ইতিহাস, শ্রাবণের বৃষ্টির স্মৃতি আর সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের গর্জন বুকে নিয়েই আবার জীবনের নতুন যাত্রা শুরু করলাম। আমাদের ভালোবাসার নতুন ভয়েজ সফল হলো, আর সমুদ্রের নীল জলরাশিতে ভেসে চলার জন্য আবার পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে উঠল আমাদের প্রিয় জাহাজ ‘বাংলার আশা’।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও জীবনের রোমাঞ্চ তখনো বাকি ছিল। এর মধ্যেই আমি উঠে পড়লাম ‘বাংলার নূর’ জাহাজে, যেখানে অ্যাক্টিং চিফ অফিসার অর্থাৎ ফার্স্ট অফিসার হিসেবে আমার দায়িত্ব পড়েছিল। সার্টিফিকেট হাতে থাকায় পদবীটা মিললেও মনে মনে খুঁজছিলাম একটাই সুযোগ—এবার যেকোনো উপায়ে তাকে জাহাজে আমার কাছে নিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) ক্রু সেকশনের কর্মকর্তা বদিউল আলম সাহেবের কাছে গিয়ে সোজা বললাম, “আমি তো বিয়ে করেছি, আমার স্ত্রীকে জাহাজে সাথে নেওয়ার অনুমতি দিতে হবে।”
তিনি একটু হেসে বললেন, “আমি তো তোমার ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু শুনেছি। তবে সাধারণত আমরা তো সেকেন্ড মেটদের এই সুযোগ দিই না।”
আমিও নাছোড়বান্দা, স্পষ্ট জানিয়ে দিলাম, “অনুমতি না দিলে আমি এবার ভয়েজেই যেতে পারব না!”
আমার নাছোড়বান্দা মনোভাব দেখে তিনি শেষমেশ রাজি হলেন, “ঠিক আছে, বউ নিয়ে এসো।”
এখন পেছন ফিরে ভাবলে অবাক লাগে, তখন এত সাহস আমার কোথা থেকে এসেছিল! অনুমতি পাওয়ার পরপরই দ্রুত ঢাকায় ছুটে গেলাম। তাকে গিয়ে শুধু বললাম, “প্যাকআপ! যা আছে গুছিয়ে নাও।”
সৌভাগ্যবশত, ওদের বাসা থেকে কোনো বাধা এলো না। সেখান থেকে সোজা ঢাকা বিমানবন্দর, তারপর চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামে এসে উঠলাম আগ্রাবাদে হোটেল হাওয়াইতে। ঘটনাক্রমে ঠিক একই সময়ে আমার জুনিয়র বন্ধু এবং শিপিং জগতের পরিচিত মুখ নাজমুলও খুলনা থেকে তার নতুন বউকে (আমাদের ডলি ভাবি) নিয়ে একই হোটেলের পাশের রুমে উঠেছিল। দুই বন্ধু মিলে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরুর সেই আনন্দময় দিনগুলো আজও স্পষ্ট মনে পড়ে।
আউটার অ্যাঙ্করেজ ও নরওয়েজিয়ান ক্যাপ্টেনের অভ্যর্থনা
অফিসিয়াল সমস্ত প্রক্রিয়া ও শিপিং অফিসের কাগজপত্রের কাজ শেষ করে এবার জাহাজে ওঠার পালা। শহরের কোলাহল ছেড়ে আমাদের প্রিয় জাহাজ ‘বাংলার নূর’ তখন নোঙর ফেলে অপেক্ষা করছিল উত্তাল আউটার অ্যাঙ্করেজে।
বিশাল সমুদ্রের মাঝে এক ইয়াং মেয়ের জন্য দড়ির ল্যাডার (Jacob’s Ladder) বেয়ে জাহাজে ওঠা কতটা কষ্টকর ও রোমাঞ্চকর হতে পারে, তা কেবল যে দেখেছে সেই বুঝবে। তবে বয়স কম আর মনের জোর থাকায় সে বেশ শক্ত হাতেই সেই সিঁড়ি পেরিয়ে জাহাজে পা রাখল।
জাহাজে ওঠার পর নরওয়েজিয়ান ক্যাপ্টেন সাহেব আমাদের যেভাবে সংবর্ধনা জানালেন, তা এক অপূর্ব স্মৃতি হয়ে আছে। প্রথম দর্শনেই আমার স্ত্রীর হাঁটু পেরিয়ে নেমে যাওয়া দীর্ঘ চুলগুলোর দিকে তিনি অনেকক্ষণ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আমাদের পরম মমতায় নিজের কেবিনে নিয়ে গেলেন।
কেবিনে ঢুকেই তিনি তাঁর দুই মেয়ের ছবি দেখিয়ে হেসে বললেন, “দেখো, আমার এই দুই মেয়ে কিন্তু তোমার চেয়েও বয়সে বড়। সুতরাং আজ থেকে তুমি আমার মেয়ের মতো!”
তারপর পরম স্নেহে তার দীর্ঘ চুল ছুঁয়ে বললেন, “ডোন্ট মাইন্ড।”
আমার স্ত্রী তো হঠাৎ এই অনভিপ্রেত ও উষ্ণ অভ্যর্থনায় পুরোপুরি অবাক হয়ে গিয়েছিল! কোথায় এলো সে, আর কী অদ্ভুত এক মায়াবী জগত এই জাহাজ!
ভোর চারটার ডিউটি ও সমুদ্রের নীল ক্যানভাস
জাহাজে আমাদের দিনগুলো কাটতে লাগল এক অচেনা ছন্দে। মাঝরাতে কিংবা ভোরে আমার ডিউটি থাকত ভোর চারটা থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত। গভীর রাতে আমি যখন ব্রিজে ডিউটিতে যেতাম, সেও অলসতা ভেঙে আমার সাথে উঠে পড়ত। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের হিমশীতল হাওয়ায় ভেসে যাওয়া, রাতের অন্ধকার চিরে ভোরের আলোর আগমন দেখা—এসব অভিজ্ঞতা আমাদের রূপকথার মতো লাগত।
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়ার পর দীর্ঘ ১৬ দিনের টানা সমুদ্রযাত্রা শেষে আমরা পৌঁছালাম সৌদি আরবের রাস্তানুফুর বন্দরে। সেখানে দুদিন ধরে তেল লোড করা হলো। কঠোর নিরাপত্তার কারণে ডাঙ্গায় নামার কোনো সুযোগ ছিল না, কিন্তু জাহাজের চার দেয়ালের মাঝেই আমাদের নিজস্ব এক সুন্দর পৃথিবী গড়ে উঠেছিল।
তেল লোড শেষ করে আবার যখন চট্টগ্রামে ফিরে এলাম, তখন পরিবারের থমথমে পরিস্থিতির কারণে আমাদের আবারও হোটেলে গিয়ে উঠতে হয়েছিল। আমার ভাই তখন চরম অসন্তুষ্ট, পারিবারিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে এমন কাণ্ড করা সহজভাবে মেনে নেননি কেউ। কিন্তু সমস্ত বাধা আর প্রতিকূলতাকে দূরে সরিয়ে রেখে আমরা আমাদের ভালোবাসার পথেই অবিচল ছিলাম।
সমুদ্রের বুকে নয়টি বছর ও স্মৃতির জলছবি
‘বাংলার নূর’-এর সেই স্মরণীয় ভয়েজের পর আমি নিজে আরও কয়েকটি সফর করেছি একাকী, আবার কখনো তাকে সাথে নিয়ে। পরবর্তী সময়ে আমার পুরো ক্যাপ্টেন লাইফটাই হয়ে উঠেছিল আনন্দে ভরপুর।
আমার পুরো নৌ-জীবনে যাওয়া-আসার মধ্যে সে প্রায় নয়টি বছর আমার সাথে সাগরে সাগরে ভেসে কাটিয়েছে। এমনকি আমাদের ছোট মেয়েটিও চার বছর জাহাজের এই রোমাঞ্চকর জীবনের অংশ ছিল। একনাগাড়ে না হলেও, তাদের এই আসা-যাওয়া ও সমুদ্রের বুকে ভেসে থাকার দিনগুলো আমাদের সংসারকে ভরিয়ে তুলেছিল এক অদ্ভুত তৃপ্তি ও ভালোবাসায়।
আটলান্টিকের উত্তাল ঢেউ, অচেনা বন্দরের কোলাহল আর জাহাজের কেবিনে জমে থাকা সেই দিনগুলো আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন—যা আমাদের ভালোবাসার ভয়েজকে চিরকালের জন্য এক রূপকথা বানিয়ে রেখে দিয়েছে।