Home অপরাজিতা গহিরা গ্রামে ব্রিটিশদের সাথে বিপ্লবীদের সেই সম্মুখ যুদ্ধ

গহিরা গ্রামে ব্রিটিশদের সাথে বিপ্লবীদের সেই সম্মুখ যুদ্ধ

ছবি: এ আই

কল্পনা দত্তের আত্মসমর্পণ

সরেজমিন আনোয়ারা 
কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: ১৯৩৩ সালের ১৯ মে। ঝুম বৃষ্টির রাত। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত আনোয়ারার উপকূলীয় গ্রাম গহিরা তখন নিঝুম, শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত গ্রামের একটি বাড়ির ভেতরে তখন জ্বলছে স্বাধীনতার মশাল। ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন স্বাধিকার আন্দোলনের মহানায়ক মাস্টারদা সূর্য সেনের অন্যতম প্রধান দুই সেনাপতি—অগ্নিকন্যা কল্পনা দত্ত এবং বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার। সাথে আছেন তরুণ বিপ্লবী সুধী (সুধীন্দ্র দাশগুপ্ত), অর্ধেন্দু গুহ এবং শৈলেশ্বর চক্রবর্তী।
কিন্তু সেই রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে গহিরা গ্রামে নেমে এসেছিল ব্রিটিশ রাজের এক নির্মম আঘাত, যা চট্টগ্রামের বিপ্লবী ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল চিরতরে।
গহিরার ক্ষীরোদপ্রভা চৌধুরানীর বাড়ি ও বিপ্লবীদের আশ্রয়
১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পটিয়ার গৈরালা গ্রামে মাস্টারদা সূর্য সেন গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিপ্লবী দল কিছুটা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। দলের হাল ধরেন তারকেশ্বর দস্তিদার এবং কল্পনা দত্ত। ব্রিটিশ পুলিশের হন্যে হয়ে খোঁজার মুখে তারা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেন আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের গহিরা গ্রামের ক্ষীরোদপ্রভা চৌধুরানীর বাড়িটি (যা স্থানীয়ভাবে তালুকদার বাড়ি বা জমিদার বাড়ির অংশ হিসেবে পরিচিত ছিল)। দেশপ্রেমিক ক্ষীরোদপ্রভা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই বিপ্লবীদের পরম যত্নে আশ্রয় দিয়েছিলেন।
ব্রিটিশ ফৌজের ঘেরাও ও ঐতিহাসিক সম্মুখ যুদ্ধ
গহিরা গ্রামে বিপ্লবীদের এই গোপন আস্তানার খবর কোনোভাবে পৌঁছে যায় ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কাছে। ১৯ মে গভীর রাতে ক্যাপ্টেন টেইটের নেতৃত্বে ব্রিটিশ মিলিটারির এক বিশাল দল এবং পুলিশ বাহিনী পুরো বাড়িটি চারপাশ থেকে কর্ডন বা অবরুদ্ধ করে ফেলে।
পুলিশের উপস্থিত টের পেয়েই ঘরের ভেতর থেকে গর্জে ওঠে বিপ্লবীদের পিস্তল। শুরু হয় দুপক্ষের মধ্যে তুমুল ও ব্যাপক গোলাগুলি। বৃষ্টির শব্দের চেয়েও তীব্র হয়ে ওঠে বুলেটের আওয়াজ। ব্রিটিশ বাহিনীর আধুনিক রাইফেলের ঝাঁক ঝাঁক গুলির জবাবে বিপ্লবীরা তাদের সীমিত গোলাবারুদ নিয়েই বীরত্বের সাথে লড়াই চালিয়ে যান। এই সম্মুখ সমরে ঘরের ভেতরেই ব্রিটিশদের গুলিতে বুকঝাঁজরা হয়ে নিহত হন তরুণ বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদার ও মনোরঞ্জন দাসগুপ্ত (কারো মতে অর্ধেন্দু গুহ)।
গোলাবারুদ শেষ এবং অগ্নিকন্যার আত্মসমর্পণ
কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা এই অসম লড়াইয়ে একপর্যায়ে বিপ্লবীদের হাতের গোলাবারুদ শেষ হয়ে আসে। বাড়ির চারপাশ তখন শত শত ব্রিটিশ সৈন্যে পরিবেষ্টিত। এই পরিস্থিতিতে আর কোনো রক্তক্ষয় না করে এবং আশ্রয়দাতা পরিবারের সদস্যদের জীবন রক্ষা করতে তারকেশ্বর দস্তিদার ও কল্পনা দত্ত আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নেন। বীর দর্পে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন অগ্নিকন্যা কল্পনা দত্ত। ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনী তাঁদের বন্দি করে।
ইতিহাসের মোড় পরিবর্তন ও চট্টগ্রাম আদালত
গহিরা গ্রামের এই ঐতিহাসিক ও রোমহর্ষক অভিযানের পর বন্দি বিপ্লবীদের নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রাম আদালতে। ঐতিহাসিক ‘দ্বিতীয় চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলা’র বিচার শুরু হয়। এই মামলায় বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসি হলেও কল্পনা দত্তকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৩৯ সালে তিনি জেল থেকে মুক্তি পান।
স্মৃতির অন্তরালে গহিরার সেই ঐতিহাসিক স্থান
আজকের শান্ত গহিরা গ্রামের বুক চিরে বয়ে যাওয়া বাতাস এখনো যেন সেই ১৯৩৩ সালের ১৯ মে-র বারুদের গন্ধ আর বুলেটের শব্দ মনে করিয়ে দেয়। দেশের স্বাধীনতার জন্য গহিরার মাটিতে অগ্নিকন্যা কল্পনা দত্তের এই বীরত্বপূর্ণ লড়াই ও আত্মসমর্পণ চট্টগ্রামের বিপ্লবী ইতিহাসের এক অম্লান এবং অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।
আরও নানা বিষয় জানত ভিজিট করুন: www.businesstoday24.com