Home অন্যান্য পাথুরে পাহাড়ের রহস্য: নবী সালেহ (আ.)-এর উষ্ট্রী ও এক অলৌকিক ফাটল

পাথুরে পাহাড়ের রহস্য: নবী সালেহ (আ.)-এর উষ্ট্রী ও এক অলৌকিক ফাটল

জাবাল ইত্তিন। ছবি সংগৃহীত

পর্ব-৫

ওমান স্মৃতির দুই দশক: স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে দেখা

কামরুল ইসলাম

সালালাহর মফিজুর রহমানের সেই বিশাল বাসভবন থেকে আমরা যখন জাবাল ইত্তিন (Jabal Ittin) পাহাড়ের পাদদেশ ধরে এগোচ্ছিলাম, তখন চারপাশের পরিবেশ ছিল রহস্যময় আর গাম্ভীর্যপূর্ণ। সালালাহর প্রতিটি পাহাড় যেন কোনো না কোনো প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী। সাংবাদিক হিসেবে আমাদের কৌতূহল ছিল আধুনিক ওমানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই হাজার বছরের পুরনো লোকগাথা আর ধর্মীয় ঐতিহ্যের দিকে। আমাদের গন্তব্য ছিল এমন এক পাহাড়, যার শরীরে আজও মিশে আছে এক অলৌকিক ঘটনার চিহ্ন।
সামুদ জাতির অবাধ্যতা ও নবী সালেহ (আ.)-এর মুজিজা
ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, সামুদ জাতির অবাধ্যতার পর আল্লাহ তাআলা নবী সালেহ (আ.)-এর দোয়ায় পাহাড়ের বুক চিরে এক অলৌকিক উষ্ট্রী বা উটনি বের করে এনেছিলেন। শর্ত ছিল কেউ সেই উষ্ট্রীর ক্ষতি করবে না। কিন্তু অবাধ্য জাতি সেই উষ্ট্রীকে হত্যা করে। স্থানীয় লোকগাথা ও প্রবীণদের বর্ণনা অনুযায়ী, উষ্ট্রীটিকে হত্যার পর তার বাচ্চাটি প্রাণভয়ে দৌড়ে গিয়ে একটি পাহাড়ের সরু ফাটল দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং অলৌকিকভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়।
সেই রহস্যময় পাহাড় ও রক্তের দাগ
মফিজুর রহমান আমাদের নিয়ে গেলেন ঠিক সেই পাহাড়ের সামনে। পাহাড়ের গায়ে একটি সরু প্রবেশপথ বা ফাটল আজও দৃশ্যমান। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, সেই ফাটলের চারপাশে পাথরের গায়ে লালচে রঙের কিছু স্পষ্ট দাগ দেখা যায়। স্থানীয়দের দৃঢ় বিশ্বাস, উষ্ট্রীটি বা তার বাচ্চাটি যখন সেই পাহাড়ের ভেতরে প্রবেশ করছিল, তখন এটি আহত হয়েছিল। সেই রক্তের দাগই অলৌকিকভাবে পাথরের সাথে মিশে গিয়ে হাজার বছর ধরে অমলিন হয়ে আছে। সাংবাদিকের যুক্তি দিয়ে অনেক কিছু বিশ্লেষণ করা গেলেও, সেই পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে এক ধরনের অলৌকিক শিহরণ অনুভব না করে পারা যায় না।
লোকগাথা ও বিন আলী (Bin Ali)-এর স্মৃতি
সালালাহর এই পাহাড়টি নিয়ে আরও কিছু জনশ্রুতিও সেখানে প্রচলিত আছে। কেউ কেউ একে নবী বিন আলী (Bin Ali) বা অন্য কোনো আউলিয়ার মাজার সংলগ্ন পাহাড় হিসেবে বর্ণনা করেন। সেখানকার মানুষ বিশ্বাস করেন, কোনো এক পুণ্যবতী নারী বা অলৌকিক সত্তাও এই পাহাড়ের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন। ইতিহাস আর বিশ্বাসের এই মেলবন্ধন ওমানের এই রুক্ষ পাহাড়গুলোকে এক গভীর আধ্যাত্মিক রূপ দিয়েছে।
মেঘে ঢাকা পাহাড় ও মফিজুর রহমানের বর্ণনা
আমরা যখন সেই পাহাড়ের ফাটলটি দেখছিলাম, তখন জাবাল ইত্তিনের চূড়ায় মেঘের আনাগোনা। কুয়াশাচ্ছন্ন সেই পরিবেশে লালচে দাগ সংবলিত পাথরটি যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠছিল। মফিজুর রহমান আমাদের বলছিলেন, সারা বছর বহু মানুষ এখানে আসেন এই অলৌকিক চিহ্নটি দেখতে। এটি কেবল পর্যটন নয়, বরং বিশ্বাসের এক বড় জায়গা। সালালাহর মানুষ আজও পরম শ্রদ্ধার সাথে এই স্থানটি আগলে রেখেছেন।
আধ্যাত্মিকতা ও সাংবাদিকতার মেলবন্ধন
পাহাড়ের সেই ফাটল আর ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া সামুদ জাতির গল্প শুনতে শুনতে আমরা যখন নিচে নামছিলাম, তখন মনে হলো— সাংবাদিকতা আমাদের শেখায় দৃশ্যমান জগতকে দেখতে, কিন্তু ওমানের এই পাহাড়গুলো আমাদের শেখাল অদৃশ্যের প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে। আধুনিক ওমানের চাকচিক্যের চেয়েও এই প্রাচীন চিহ্নগুলোই আমাদের সফরের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়ে রইল।

পরবর্তী পর্বে থাকছে: মুগসায়েল সৈকতের সেই প্রলয়ংকরী গর্জন ও পাথুরে ফোয়ারার মহাবিস্ময়।