বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বন্দরে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়াকে কেন্দ্র করে তথাকথিত ‘শ্রমিক আন্দোলন’ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে চলা কর্মবিরতিতে বন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়লেও সচেতন মহলের দাবি—এই আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী সিন্ডিকেট’। মূলত বন্দরের আধুনিকায়ন এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি হলে নিজেদের আধিপত্য হারানোর ভয়েই একটি বিশেষ গোষ্ঠী শ্রমিকদের রাজপথে নামিয়ে দিয়েছে।
আন্দোলন কি দেশের স্বার্থে, নাকি বিশেষ মহলের?
এনসিটি ইজারা দেওয়া নিয়ে শ্রমিক নেতারা ‘দেশপ্রেম’ ও ‘জাতীয় সম্পদ রক্ষা’র বুলি আওড়ালেও পর্দার আড়ালে চিত্র ভিন্ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি দক্ষ অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হলে বন্দরের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং বর্তমান সিন্ডিকেটের খবরদারি বন্ধ হবে। আর ঠিক এই কারণেই কতিপয় প্রভাবশালী তাদের স্বার্থ রক্ষায় শ্রমিকদের ভুল বুঝিয়ে রাজপথে নামিয়েছে।
সাধারণ ব্যবসায়ীরা প্রশ্ন তুলছেন—বন্দরের আধুনিকায়নে যখনই উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখনই কেন শ্রমিক অসন্তোষ উসকে দেওয়া হয়? কেন বার্থ অপারেটিং এবং শিপ হ্যান্ডলিং সিন্ডিকেট ভাঙার দাবিতে কখনও কোনো আন্দোলন হয় না?
কঠোর তদন্তের দাবি
ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের সাথে কথা বললে তারা অভিমত দেন যে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের প্রধান এই অর্থনৈতিক গেটওয়েকে জিম্মি করার নেপথ্য নায়কদের খুঁজে বের করা জরুরি হয়ে পড়েছে। “যারা শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করা সময়ের দাবি। এটি কেবল কয়েক হাজার শ্রমিকের রুটি-রুজির প্রশ্ন নয়, বরং মুষ্টিমেয় কয়েকজনের পকেট ভারী করার অপচেষ্টা কি না—তা উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”
সিন্ডিকেটের কবজায় বন্দর: ভাঙছে না কেন পুরনো বলয়?
চট্টগ্রাম বন্দরের বার্থ অপারেটিং এবং শিপ হ্যান্ডলিং কার্যক্রম যুগ যুগ ধরে নির্দিষ্ট কিছু লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের হাতে জিম্মি। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দশকের পর দশক ধরে একচেটিয়া ব্যবসা করে আসছে।
কৌশলী টেন্ডার: সিন্ডিকেট রক্ষার ‘আইনি’ বর্ম
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বন্দরের বার্থ অপারেটর নিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট সময় পরপর টেন্ডার বা দরপত্র আহ্বান করা হলেও সেখানে সাধারণ কোনো প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের সুযোগ প্রায় অসম্ভব।
শর্তের বেড়াজাল: টেন্ডারের শর্তগুলো এমনভাবে অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও জটিলভাবে সাজানো হয়, যা কেবল বর্তমান সিন্ডিকেটের সদস্যদের পক্ষেই পূরণ করা সম্ভব। ফলে নতুন ও দক্ষ কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলেও এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে না।
নামমাত্র টেন্ডার: কাগজে-কলমে প্রতিযোগিতার কথা বলা হলেও বাস্তবে এটি একটি সাজানো প্রক্রিয়া মাত্র, যার মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে নির্দিষ্ট কয়েকজনের হাতেই বন্দরের নিয়ন্ত্রণ ঘুরপাক খাচ্ছে। এই ‘অদৃশ্য দেয়াল’ ভাঙার জন্য আজ পর্যন্ত কোনো শ্রমিক সংগঠন বা সংগ্রাম কমিটিকে আন্দোলন করতে দেখা যায়নি।
উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার অভাব: ব্যবসায়ীদের মতে, জাহাজের কন্টেইনার বা পণ্য হ্যান্ডলিং এমন কোনো জটিল প্রযুক্তিগত বিষয় নয় যে এটি অন্য কেউ পারবে না। কিন্তু নতুন কোনো পক্ষকে এখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না।
ব্যয় বৃদ্ধি: যদি এই সেবা খাতটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হতো, তবে প্রতিযোগিতার কারণে হ্যান্ডলিং খরচ অনেক কমে আসত। এর সরাসরি সুফল পেতেন দেশের সাধারণ আমদানিকারক, শিল্পপতি এবং ভোক্তারা। কিন্তু সেই ‘উন্মুক্ত বাজার’ ব্যবস্থার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান সিন্ডিকেট।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) বন্দর এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করলেও পর্দার আড়ালের ইন্ধনদাতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া এবং বর্তমান আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও জোরালো তদন্ত এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।