বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি,চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে আধুনিক ও লাভজনক টার্মিনাল হিসেবে পরিচিত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)-র অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক বৈশ্বিক বন্দর অপারেটর কোম্পানি ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-কে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলের আওতায় এই বৈশ্বিক জায়ান্টকে যুক্ত করার সরকারি সিদ্ধান্তকে ঘিরে যখন বন্দর ব্যবহারকারীদের একটি অংশ উদ্বেগ প্রকাশ করছে, তখন দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ও বন্দর আধুনিকায়নের স্বার্থে একে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও বন্দর বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বছরের পর বছর ধরে গুটিকয়েক দেশীয় কোম্পানির সিন্ডিকেটের হাত থেকে দেশের প্রধান এই প্রবেশদ্বারকে মুক্ত করতে বৈশ্বিক মানের অপারেটরের কোনো বিকল্প নেই।
সিন্ডিকেটের বেড়াজালে জিম্মি চট্টগ্রাম বন্দর
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটির কাজ ঘুরেফিরে কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশীয় কোম্পানির হাতেই বন্দি রয়েছে। একচেটিয়া আধিপত্য ও সিন্ডিকেটের কারণে বন্দরে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। নামমাত্র বিনিয়োগ করে এই চক্রটি হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেও বন্দরের সার্বিক সক্ষমতা বাড়াতে বা বৈশ্বিক শিপিং লাইনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক তৈরিতে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের কারণে বিদেশি বড় বড় লজিস্টিকস ও শিপিং কোম্পানিগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ ভেড়াতে দীর্ঘ সময় অপচয়সহ নানামুখী জটিলতার মুখোমুখি হয়েছে। বর্তমানে এই সিন্ডিকেটটি নিজেদের একচেটিয়া বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে নতুন করে ‘কনসোর্টিয়াম’ নামে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে, যা প্রকারান্তরে বন্দরের আধুনিকায়ন ও বিশ্বায়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করার শামিল। এই অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও বন্দরের রূপান্তর
অনুসন্ধানে জানা যায়, ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পোর্ট ও টার্মিনাল অপারেটর, যারা বর্তমানে বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে সফলতার সাথে বন্দর পরিচালনা করছে। বিভিন্ন দেশের বন্দরে ডিপি ওয়ার্ল্ড দায়িত্ব নেওয়ার পর সেখানে অবকাঠামো ও পরিচালনগত ক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে।
১. লন্ডন গেটওয়ে (যুক্তরাজ্য):
ডিপি ওয়ার্ল্ড এই বন্দরে কাজ শুরু করার পর এটি যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে আধুনিক এবং স্বয়ংক্রিয় বন্দরে পরিণত হয়েছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও লজিস্টিকস চেইনের সমন্বয়ে এখানে জাহাজ খালাসের সময় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, যা সামগ্রিক ব্রিটিশ অর্থনীতিতে গতি এনেছে।
২. জেবেল আলী বন্দর (দুবাই):
মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রধান বন্দরটি আজ বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও সেরা বন্দরে রূপান্তরিত হওয়ার পেছনে রয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ডের দূরদর্শী ব্যবস্থাপনা। শতভাগ ডিজিটাল কাস্টমস ও স্বয়ংক্রিয় টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের হাব হয়ে উঠেছে।
৩. ভারত ও আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন বন্দর:
ভারতের জওহরলাল নেহরু পোর্ট ও চেন্নাই বন্দরে ডিপি ওয়ার্ল্ডের আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া আফ্রিকার রুয়ান্ডা ও সেনেগালের মতো দেশের বন্দরগুলোতে তাদের বিনিয়োগ ও লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক অনুন্নত বন্দরগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছে।
কেন এনসিটিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের আগমন জরুরি?
বন্দর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো প্রতিষ্ঠান এনসিটির দায়িত্ব নিলে চট্টগ্রাম বন্দরের চেহারা আমূল বদলে যাবে। এর প্রধান যৌক্তিকতাগুলো হলো:
অটোমেশন ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ: ডিপি ওয়ার্ল্ড তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির মাধ্যমে টার্মিনাল ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করবে। এর ফলে পেপারলেস ও দ্রুততম সময়ে কন্টেইনার খালাস সম্ভব হবে, যা দেশীয় সিন্ডিকেটের অধীনে ধীরগতিতে চলছিল।
সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI): পিপিপি মডেলের আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটিতে বিপুল পরিমাণ নিজস্ব মূলধন ও আধুনিক যন্ত্রপাতি (যেমন কন্টেইনার স্ক্যানার, স্বয়ংক্রিয় ক্রেন) বিনিয়োগ করবে। এতে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে কোনো অর্থ খরচ করতে হবে না, বরং রাজস্ব আয় বহুগুণ বাড়বে।
বিশ্বের বড় শিপিং লাইনের আকর্ষণ: ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক থাকার কারণে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মাদার ভেসেল ও শিপিং লাইনগুলো সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে আসতে উৎসাহিত হবে। এতে করে সিঙ্গাপুর বা কলম্বো বন্দরের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং আমদানি-রপ্তানি খরচ এক ধাক্কায় অনেক কমে যাবে।
দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি: বিদেশি কোম্পানি দায়িত্ব নিলে স্থানীয় হাজার হাজার বন্দর শ্রমিকের কর্মসংস্থান তো কমবেই না, উল্টো তারা আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন। ফলে দেশের লজিস্টিকস খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে।
একটি দেশের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিকে চিরকাল গুটিকয়েক স্থানীয় কোম্পানির সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি রাখা যায় না। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারা সচল রাখতে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো দক্ষ ও অভিজ্ঞ অপারেটর নিয়োগ সময়ের দাবি।
নিয়মিত এমন গুরুত্বপূর্ণ সব খবরের আপডেট পেতে businesstoday24.com ফলো করুন