Home Second Lead ‘এমভি ওশান উইনার’-এর মারাত্মক নিরাপত্তা ঘাটতি ধরা পড়েছিল চট্টগ্রামেই

‘এমভি ওশান উইনার’-এর মারাত্মক নিরাপত্তা ঘাটতি ধরা পড়েছিল চট্টগ্রামেই

এমভি ওশান উইনার
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: উড়িষ্যা উপকূলে বঙ্গোপসাগরের গভীর জলে প্রায় ৭২ হাজার টন আকরিক লোহা নিয়ে নিমজ্জিত পানামা পতাকাবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার ‘এমভি ওশান উইনার’-এর মারাত্মক নিরাপত্তা ঘাটতি ধরা পড়েছিল চট্টগ্রাম বন্দর এলাকাতেই। পোর্ট স্টেট কন্ট্রোল (পিএসসি) জাহাজটির কারিগরি ও জীবন রক্ষাকারী বিভিন্ন সরঞ্জামে গুরুতর ত্রুটি শনাক্ত করলেও যথাযথ সংস্কার ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় এটিকে সাগরে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মেয়াদোত্তীর্ণ জাহাজটির চিহ্নিত ত্রুটিগুলো সমাধান না করাই বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।
আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা ডাটাবেস ‘ইকুয়াসিস’ (Equasis) এবং ইন্ডিয়ান ওশান মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (IOMOU)-এর তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে , ১৯৯৮ সালে চীনের সাংহাইয়ের হুডং-ঝংহুয়া শিপইয়ার্ডে নির্মিত জাহাজটির নিরাপদ কার্যক্ষমতার আন্তর্জাতিক নির্ধারিত সীমা ছিল ২৫ বছর। তবে সেই সীমা পেরিয়ে জাহাজটি ২৮ বছরে পদার্পণ করেছিল। ২২৫ মিটার দীর্ঘ ও ৭২,৯২৮ ডেডওয়েট টন (DWT) ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই জাহাজটি অতীতে ‘তিয়ারা গ্লোব’ ও ‘সান উইনার ২’ নামে চলাচল করত। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে নাম পরিবর্তন করে চীনের ফুঝৌ-ভিত্তিক ‘ওশান উইনার শিপিং কোম্পানি লিমিটেড’ একক জাহাজ হিসেবে এর পরিচালনা শুরু করে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত মে মাসের শেষের দিকে, যখন জাহাজটি সিঙ্গাপুরের পুলাউ বুকোম থেকে কার্গো নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছায়। জুন মাসে চট্টগ্রামে পিএসসি কর্তৃপক্ষের নিয়মিত ও নিবিড় পরিদর্শনে জাহাজটির তিনটি প্রধান নিরাপত্তা ঘাটতি ও কাঠামোগত দুর্বলতা আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত হয়। সে সময় দিক নির্ণয়ের প্রধান নেভিগেশনাল ম্যাগনেটিক কম্পাসটি সম্পূর্ণ অকার্যকর পাওয়া যায়। একই সাথে জরুরি উদ্ধারকাজের লাইফর‍্যাফট ও লাইফজ্যাকেট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ছিল, ইঞ্জিন রুমের কুলিং সিস্টেমে বিপজ্জনক লিকেজ ছিল এবং স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা অ্যালার্মগুলো বিকল ছিল।
জাহাজের হালের ক্ষয়প্রাপ্ত অংশ এবং অগ্নিনির্বাপক ফায়ার ডোর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ না হওয়ার মতো মারাত্মক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও টেকসই সংস্কার ছাড়াই জাহাজটিকে পরবর্তী যাত্রার ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
চট্টগ্রামে শনাক্ত হওয়া এসব গুরুতর ত্রুটি নিয়েই জাহাজটি চলাচল অব্যাহত রাখে। গত ২০ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টায় ভারতের পারাদ্বীপ বন্দর থেকে চীন ও সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে আকরিক লোহা বোঝাই করে যাত্রা করে জাহাজটি। এরপর ২২ আগস্ট দুপুরে পারাদ্বীপ থেকে ২৩০ থেকে ২৪০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পূর্বে গভীর সাগরে জাহাজটির সাথে নিয়ন্ত্রণকক্ষের সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অতিরিক্ত বোঝাইকৃত পণ্য, হালের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মুখে ভারসাম্য হারিয়ে সন্ধ্যার দিকে মাত্র আট মিনিটের মধ্যে পুরো জাহাজটি গভীর সাগরে তলিয়ে যায়।
জাহাজে মোট ২৪ জন ক্রু কর্মরত ছিলেন; যার মধ্যে ২০ জন চীনা, ৩ জন মিয়ানমার এবং ১ জন বাংলাদেশি নাবিক। নিখোঁজ বাংলাদেশি নাবিক হলেন জাহাজের চতুর্থ প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন, যাঁর বাড়ি সাতক্ষীরা জেলায়।
জাহাজটি ডুবে যাওয়ার পরপরই শ্রী বিজয়া পুরামে অবস্থিত মেরিটাইম রেসকিউ কোঅর্ডিনেশন সেন্টার (MRCC) থেকে জরুরি বিপদবার্তা জারি করা হয়। উদ্ধার অভিযানে নামে ভারতীয় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড। আকাশপথে তল্লাশির জন্য নৌবাহিনীর দূরপাল্লার পি-এইটআই (P-8I) নজরদারি বিমান এবং সাগরে কোস্টগার্ডের তিনটি বিশেষ উদ্ধারকারী জাহাজ—বরাদ, আনমোল ও বিজিতকে তাৎক্ষণিকভাবে মোতায়েন করা হয়। দুর্ঘটনার পর সাগরে ভাসমান লাইফর‍্যাফট থেকে নিকটবর্তী রাসায়নিক ট্যাঙ্কার ‘এমটি আইসোপোস’ (MT AISOPOS) দুইজন চীনা ক্রুকে জীবিত উদ্ধার করে, যাঁরা বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিখোঁজ বাংলাদেশি নাবিকের উদ্ধার তৎপরতা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএমওএ) সভাপতি ক্যাপ্টেন মো. আনাম চৌধুরী জানান, বঙ্গোপসাগরে ভারতীয় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের যৌথ অনুসন্ধান চলছে। এখন পর্যন্ত চতুর্থ প্রকৌশলী মামুনের কোনো সন্ধান মেলেনি। তবে যে নিয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে তিনি জাহাজটিতে যোগ দিয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে বিএমএমওএ সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। ভারতীয় নৌবাহিনীর ঘোষণা অনুযায়ী, নিখোঁজ বাংলাদেশি প্রকৌশলীসহ বাকি ২২ জন ক্রুর চূড়ান্ত পরিণতি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকবে।