চট্টগ্রামের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ মানেই দেশের ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার। শত বছরের পুরনো এই বাণিজ্যিক জনপদে পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ মানে কেবল ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়, বরং ব্যবসায়িক লেনদেনের নতুন এক দিগন্ত। এখানকার প্রতিটি সরু গলি আর শতাব্দী প্রাচীন দালানগুলো যেন এদিন নতুন সাজে প্রাণ ফিরে পায়।
খাতুনগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সাজসজ্জা
পহেলা বৈশাখের সকাল থেকেই খাতুনগঞ্জের দৃশ্যপট বদলে যায়। এখানকার শত শত ছোট-বড় আড়ত এবং গদিতে পড়ে যায় সাজ সাজ রব। দোকানের প্রবেশমুখে তাজা গাঁদা ফুলের মালা আর ডাব-আমপল্লবের মঙ্গলঘট বসানো হয়। পুরোনো জমানার ঐতিহ্যবাহী গদি ঘরগুলো ধুয়েমুছে পরিষ্কার করা হয়। প্রতিটি দোকানের সামনে লাল কাপড়ে সাদা হরফে লেখা থাকে ‘শুভ হালখাতা’।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক কিছু পাল্টালেও খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা আজও তাদের গদিতে সাদা তোশক আর বালিশ পেতে বসার যে সাবেকি প্রথা, তা সগৌরবে ধরে রেখেছেন।
বিশ্বাসের বন্ধন ও আপ্যায়ন
খাতুনগঞ্জের ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো ‘বিশ্বাস’। এখানকার ব্যবসায়ীরা মুখে মুখেই কোটি কোটি টাকার লেনদেন করেন। চৈত্র সংক্রান্তির দিনে পুরোনো হিসাবের ইতি টেনে পহেলা বৈশাখে নতুন খাতা খোলার মাধ্যমে সেই বিশ্বাসের নবায়ন ঘটে। এদিন ক্রেতা ও পাইকারদের সশরীরে উপস্থিতিতে মুখর থাকে খাতুনগঞ্জ। আগত অতিথিদের আপ্যায়নেও থাকে চট্টগ্রামের সেই চিরাচরিত আভিজাত্য।
মিষ্টিমুখ করানো তো বাধ্যতামূলক, সেই সাথে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানি মাংস কিংবা বিশেষ কোনো পদ দিয়ে অতিথিদের ভূরিভোজ করানো এখানে নিয়মিত চিত্র। মূলত বকেয়া আদায়ের চেয়েও সম্পর্কের উষ্ণতা বৃদ্ধিই এই হালখাতা উৎসবের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
আধুনিক যুগের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ
সময়ের সাথে সাথে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়িক ধরনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। হাতে লেখা বিশাল সেই খেরো খাতার জায়গা দখল করেছে কম্পিউটার সফটওয়্যার আর ডিজিটাল লেজার। তবুও পয়া বৈশাখের দিনে একটি লাল খাতা কেনা এবং তাতে প্রতীকী হিসেবে প্রথম হিসাবটি লিখে রাখা আজও এখানকার ব্যবসায়ীদের কাছে অত্যন্ত পয়া বা শুভ বলে গণ্য হয়।
চাক্তাই খালের জোয়ার-ভাটার সাথে পাল্লা দিয়ে যারা ব্যবসা করেন, তাদের কাছে এই হালখাতা উৎসব হলো এক বছরের ক্লান্তি শেষে নতুন উদ্যমে যাত্রা শুরু করার জ্বালানি।