পেশাগত সাংবাদিকতার চার দশকের দীর্ঘ পথচলা। এই দীর্ঘ সময়ে ধুলো জমা স্মৃতির পাতায় কত ঘটনা, কত বিচিত্র কাহিনি যে ভিড় করে আছে, তার ইয়ত্তা নেই। মাঝেমধ্যে যখন সেই পুরনো জরাজীর্ণ ডায়েরিটা খুলি, মনের আয়নায় ভেসে ওঠে রঙিন সব দিন। এ পর্যন্ত যা কিছু লিখেছি, তার সিংহভাগই জুড়ে আছে ‘দৈনিক সংবাদ’। আমার প্রথম কর্মস্থল, আমার প্রথম ভালোবাসা।
অনেকেই প্রশ্ন করেন, আরও যে দুটি দৈনিকে যে কাজ করেছি সেগুলো নিয়ে কি কিছু লেখার নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু মানুষের প্রথম প্রেম, প্রথম চাকরি কি অত সহজে ভোলা যায়? আমার ক্ষেত্রেও তাই। আজও মনে হয়— সংবাদ আমার, আর আমি সংবাদের।
২৬৩ নম্বর বংশাল রোডের সেই বাড়িটি আজও আমার স্মৃতির মণিকোঠায় জীবন্ত। রিকশাওয়ালাকে যখন বলতাম, “নিশাত সিনেমার (মানসি) বিপরীতে সংবাদ অফিস যাব,” তখন বুকটা এক অজানা ভালোলাগায় ভরে উঠত। (সংবাদ অফিস অনেক বছর হলো পুরানা পল্টনে স্থানান্তরিত হয়েছে।
আমি যখন সেখানে যোগ দিই, বয়সে এবং অভিজ্ঞতায় ছিলাম সবার চেয়ে কনিষ্ঠ। কিন্তু আমার সেই অগ্রজরা? তারা তাদের মর্যাদা যেমন রক্ষা করেছেন, তেমনি আমাকে আগলে রেখেছেন পরম মায়া ও স্নেহে। আজ এত বছর পরও অফিসের ঠিক কোন জায়গাটায় বসতাম, আমার পাশে কে ছিল— সব যেন দিব্যালোকের মতো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি।
মনে পড়ে শ্রদ্ধেয় নাসিমুন্নাহার নিনি আপুর কথা। তখন তিনি সিনিয়র সাব-এডিটর, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী। নামটা বারবার ভুল করে ‘মিমি আপু’ বলে ফেলতাম। হোসনী দালান এলাকায় ওনার বাসায় কত বেলা যে খেয়েছি, তার হিসাব নেই। আর এক বড় আপু রওশন আরা জলি; একবার প্রচণ্ড ভাইরাস জ্বরে যখন আমি শয্যাশায়ী, তখন তিনি নিজের বাসায় নিয়ে গিয়ে মাতৃস্নেহে সেবা-যত্ন করে আমাকে সুস্থ করে তুলেছিলেন। সেই ঋণ কি কোনোদিন শোধ করা সম্ভব?
খ্যাতিমান নারী নেত্রী নাসিমুন আরা হক মিনু আপুর কথাও খুব মনে পড়ে। ভীষণ ভালো একজন মানুষ, আজও মাঝেমধ্যে যোগাযোগ হয়। তবে আক্ষেপ রয়ে গেল মাসুমা খাতুন আপুকে নিয়ে। আমরা একসাথে কাজ করেছি, কিন্তু সংবাদ ছাড়ার পর আর কোনোদিন যোগাযোগ হয়নি, জানিনা তিনি এখন কেমন আছেন।
স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছেন কামদা প্রসাদ ভৌমিক। সে সময় তিনি আমাদের ইউনিট প্রধান ছিলেন। পরবর্তীতে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান এবং সেখানে একটি দৈনিকে কাজ শুরু করেন। কয়েক বছর আগে তিনি লোকান্তরিত হয়েছেন। তার স্নেহময় শাসন আজও মিস করি।
বংশাল রোডের সেই স্যাঁতসেঁতে গলি, কাগজের ঘ্রাণ আর আমাদের সেই আড্ডা— আহারে, কী সোনালী দিনই না ফেলে এসেছি! সময় বদলেছে, বদলেছে প্রযুক্তির ধরন, কিন্তু সংবাদের সেই ২৬৩ নম্বর বাড়ির আবেগটা আজও আগের মতোই সতেজ রয়ে গেছে।