Home Third Lead মরুর বুকে জলযান হাব: জাবেল আলীর বৈশ্বিক রূপান্তর

মরুর বুকে জলযান হাব: জাবেল আলীর বৈশ্বিক রূপান্তর

ডিপি ওয়ার্ল্ডের বন্দর জাদু: পর্ব-১

কামরুল হাসান
 দুবাই: মরুভূমির তপ্ত বালুরাশি ও খাঁ খাঁ করা উপকূল চিরে ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে যখন দুবাইয়ের কেন্দ্র থেকে ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে জাবেল আলী বন্দর খনন শুরু হয়, তখন বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতিবিদ ও নৌ-বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা একে অপরিণামদর্শী ও অতি-উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।
পারস্য উপসাগরের অগভীর তটে এত বড় একটি কৃত্রিম গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করে সেখানে বিশ্ববাণিজ্যের জাহাজ টানা সম্ভব কি না, তা নিয়ে ছিল গভীর সংশয়। তবে তৎকালীন দূরদর্শী শাসক শেখ রশিদ বিন সাঈদ আল মাকতুমের সেই সাহসী সিদ্ধান্তের ওপর দাঁড়িয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ড গড়ে তুলেছে এক আধুনিক লজিস্টিকস বিস্ময়। শুষ্ক বালুকাময় প্রান্তরে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ আজ বিশ্বের বৃহত্তম মানবনির্মিত পোতাশ্রয় এবং বৈশ্বিক শিপিং রুটের অন্যতম প্রধান ট্রান্সশিপমেন্ট হাব।
জাবেল আলীর এই রূপান্তরের সাক্ষী ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ আমিরাতি নাগরিক ও সাবেক বন্দর কর্মকর্তা সালেহ আল-মাররি। শুরুর দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ১৯৭০-এর দশকে যখন এই বন্দরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়, তখন এখানে বালুঝড় আর নোনা জলের বাতাস ছাড়া কিছুই ছিল না। স্থানীয় অনেকেই তখন ভেবেছিলেন মরুভূমির মাঝে এত বড় বন্দর তৈরি করে হয়তো কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। কিন্তু কয়েক দশকের ব্যবধানে ডিপি ওয়ার্ল্ড যে আধুনিক প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় টার্মিনাল এখানে গড়ে তুলেছে, তা আজ গোটা আরব বিশ্বের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। আমাদের চোখের সামনে একটি শান্ত উপকূল বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত বাণিজ্য রুটে পরিণত হয়েছে।
এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের পেছনে মূল চালিকাশক্তি ডিপি ওয়ার্ল্ডের নিখুঁত টার্মিনাল অটোমেশন ও প্রকৌশলগত নেতৃত্ব। বন্দরের টার্মিনালগুলোতে প্রথাগত ড্রাফট লিমিটেশন ও ধীরগতির ব্যবস্থাপনা ভেঙে স্থাপন করা হয়েছে অত্যাধুনিক রিমোট-কন্ট্রোলড কি গ্যান্ট্রি ক্রেন। ডিজিটাল সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারে পরিচালিত এসব ক্রেনের মাধ্যমে প্রতিটি ক্রেন প্রতি ঘণ্টায় ৩৫ থেকে ৪০টির বেশি কন্টেইনার মুভমেন্ট নিশ্চিত করছে। এর ফলে বিশালাকার আল্ট্রা লার্জ কন্টেইনার ভেসেলগুলো  অনায়াসেই ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে পূর্ণ লোড-আনলোড শেষ করে পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারছে। জাহাজের বার্থিংয়ের জন্য অপেক্ষার সময় কার্যত শূন্যে নামিয়ে এনে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলোর জন্য এটি এক অনন্য আস্থার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
শুধু জেটির দক্ষতাই নয়, বন্দরের অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার ব্যবস্থাপনায় ডিপি ওয়ার্ল্ড চালু করেছে এআই-চালিত ‘বক্সবে’ হাই-বে স্টোরেজ সিস্টেম। সনাতন বন্দর ইয়ার্ডে কন্টেইনারের স্তূপের নিচের বাক্স বের করতে যে বিপুল সময় ও ক্রেন মুভমেন্ট নষ্ট হতো, বক্সবে সিস্টেমে প্রতিটি কন্টেইনারকে আলাদা ধাতব র্যাকে সাজিয়ে সেই অপচয় সম্পূর্ণ দূর করা হয়েছে।
এই ডিজিটাল গতির বাস্তব সুফল ভোগ করছেন স্থানীয় পরিবহন ও সরবরাহ খাতের উদ্যোক্তারা। দুবাইয়ের দীর্ঘদিনের লজিস্টিকস ব্যবসায়ী আহমেদ আল-মনসুরি জানান, দুই দশক আগেও একটি কন্টেইনার ছাড় করাতে এবং ট্রাক নিয়ে বন্দর প্রাঙ্গণ থেকে বের হতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট হতো। কিন্তু ডিপি ওয়ার্ল্ডের পেপারলেস কাস্টমস, অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন (ওসিআর) চালিত ডিজিটাল স্মার্ট গেট এবং স্বয়ংক্রিয় স্লট বুকিং সিস্টেমের কারণে এখন একটি ট্রাকের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় নেমে এসেছে মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিটে। এতে জ্বালানি ও পরিচালনা খরচ কমে গিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
জাবেল আলী বন্দর কেবল একক কোনো টার্মিনাল নয়, বরং একে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছে জাবেল আলী ফ্রি জোন (জাফজা), যেখানে হাজার হাজার বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান তাদের আঞ্চলিক প্রক্রিয়াকরণ ও বিতরণ কেন্দ্র পরিচালনা করছে। উন্নত অবকাঠামো, স্বয়ংক্রিয় বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বিত শিল্প হাবের এই সফল মিথস্ক্রিয়া প্রমাণ করেছে যে প্রযুক্তি ও সঠিক নীতি থাকলে মরুভূমির যেকোনো ভূখণ্ডকেও বৈশ্বিক বাণিজ্যের অপরাজেয় প্রাণকেন্দ্রে রূপান্তর করা সম্ভব।
ভিজিট করুন www.businesstoday24.com