বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের মেজবানি ঐতিহ্য কিংবা জমকালো বিয়ের আয়োজন—ডেকোরেটার্স ছাড়া কোনো অনুষ্ঠানের কথা ভাবাই যায় না। তবে আনন্দের এই মুহূর্তগুলোকে পুঁজি করে চট্টগ্রামের একশ্রেণির অসাধু ডেকোরেটার্স মালিক ও কর্মচারীরা গড়ে তুলেছে এক অদৃশ্য ঠগবাজির ফাঁদ। অগ্রিম বুকিং থেকে শুরু করে অনুষ্ঠান শেষের হিসাব মেটানো পর্যন্ত ধাপে ধাপে অতিরিক্ত বিল, গায়েবি মালামালের চার্জ এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে গ্রাহকদের পকেট কাটা এখন নিত্যদিনের নিয়মে পরিণত হয়েছে।
অনুষ্ঠান শেষে হিসাব মেটানোর সময় ডেকোরেটার্সগুলোর সবচেয়ে বড় কারসাজি ধরা পড়ে ক্রোকারিজের তালিকায়। মেজবান বা বিয়ের খাবার টেবিলে ব্যবহৃত প্লেট, গ্লাস, জগ কিংবা বাটির হিসেবে অবাস্তব ভাঙচুর জরিমানা যোগ করা হয়।
নগরীর চকবাজারের বাসিন্দা সারোয়ার আলম নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “ছোট ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে আমরা ৮০০ জনের খাবারের আয়োজন করেছিলাম। অনুষ্ঠান শেষে ডেকোরেটার্স প্রতিনিধি হিসাব দিল ৯০টি কাচের গ্লাস ও ৪০টি সিরামিক প্লেট নাকি ভেঙে গেছে। অথচ অনুষ্ঠান চলাকালে মেঝেতে কোনো ভাঙা কাচের টুকরোই চোখে পড়েনি। মেহমান বিদায়ের পর সেই গভীর রাতে কোনো হিসাব মেলানোর সুযোগ থাকে না, বাধ্য হয়ে চার হাজার টাকা জরিমানা গুনে মুক্তি পেতে হয়েছে।”
আলোকসজ্জা ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ডেকোরেটার্সগুলোর প্রতারণা আরও সূক্ষ্ম। চুক্তির সময় বড় কেভির (KVA) ভারী জেনারেটর এবং সার্বক্ষণিক ব্যাকআপের নিশ্চয়তা দেওয়া হলেও বাস্তবে সরবরাহ করা হয় কম ক্ষমতার পুরোনো ইউনিট। মূল লাইনের বিদ্যুৎ সচল থাকলেও পুরো সময় জেনারেটর চলেছে দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত জ্বালানি ও ঘণ্টার হিসেবে বাড়তি বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়।
জিইসি মোড়ের একটি কমিউনিটি সেন্টারে মেয়ের বিয়ের আয়োজনকারী নুরুল ইসলাম চৌধুরী জানান, “বিদ্যুৎ পুরো সময় সচল থাকার পরও তারা চার ঘণ্টার ফুল লোড জেনারেটর বিল ও অতিরিক্ত ডিজেল চার্জ যুক্ত করে রাখে। আপত্তি জানালে তারা কর্মচারীদের ওপর দোষ চাপায় এবং একপর্যায়ে মেজাজ হারিয়ে অপমানজনক আচরণ শুরু করে।”
অনুষ্ঠানের দিন ঠিক আগ মুহূর্তে ডেকোরেটার্স কর্মচারীদের আচরণে নাটকীয় বদল আসে। ভিআইপি চেয়ার, টেবিলের কাপড় বা অতিরিক্ত ফ্যানের চাহিদাকে পুঁজি করে তখন কয়েক গুণ বেশি দর হাঁকা হয়। মেহমান চলে আসার কারণে আয়োজকদের দরদামের সুযোগ থাকে না। এর পাশাপাশি ওয়েটার ও লেবারদের দৈনিক মজুরি চুক্তির ভেতরে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও অনুষ্ঠান শেষে শুরু হয় উপরি বকশিশের জন্য বেপরোয়া চাপ। দাবি পূরণ না হলে খাবার পরিবেশনে গাফিলতি করা বা অবশিষ্ট মূল্যবান সামগ্রী ফেরত পাঠাতে গড়িমসি করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে ডেকোরেটার্স মালিক সমিতির এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অনিয়মের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “বড় মেজবানে অনেক সময় বিশৃঙ্খলায় কিছু জিনিস নষ্ট হয়, যা গ্রাহকরা মানতে চান না। তবে কিছু অপেশাদার বা অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত বিল আদায় করে পুরো ব্যবসার সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে। সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেলে সমিতির পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
অন্যদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, “ডেকোরেটার্স খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্বচ্ছ লিখিত ভাউচার এবং আইনি নীতিমালার অভাব। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুখের কথায় বা সাদা কাগজে অস্পষ্ট চুক্তিতে কাজ হয়। ফলে শেষ মুহূর্তে গ্রাহককে জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করলেও প্রমাণের অভাবে অনেকে আইনের আশ্রয় নিতে পারেন না। বুকিংয়ের সময় প্রতিটি জিনিসের দাম, ভাঙচুরের সুস্পষ্ট ক্ষতিপূরণ হার এবং ডেলিভারির সময় যৌথ গণনার শর্ত বাধ্যতামূলক করা ছাড়া এই নৈরাজ্য থামানো সম্ভব নয়।”
পারিবারিক মান-সম্মান রক্ষার্থে অধিকাংশ ভোক্তা প্রকাশ্য বিবাদে না জড়িয়ে মুখ বুজে এই বাড়তি অর্থ পরিশোধ করে দেন। ডেকোরেটার্স ব্যবসার ক্ষেত্রে লিখিত বিস্তারিত ইনভয়েস ও কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি নিশ্চিত না হলে উৎসবের নগরী চট্টগ্রামে এই সিন্ডিকেট বাণিজ্য বন্ধ করা কঠিন।