বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) প্রধান কার্যালয় বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম থেকে প্রশাসনিক রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরের আড়ালে চলমান চক্রান্তটি ফাঁস হওয়ার পর চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
১৯৯০ সালে দেশের জ্বালানি খাতের মূল অবকাঠামো ও কৌশলগত অবস্থান বিবেচনা করে এবং চট্টগ্রামকে দেশের প্রকৃত বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই বিপিসি চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু গত ৩৫ বছর ধরে একশ্রেণির আমলা ও স্বার্থান্বেষী মহল নানা অজুহাতে ঢাকাতেই অবস্থান করে এই সংস্থাকে চট্টগ্রামবিমুখ করার চেষ্টা চালিয়েছে।
সম্প্রতি একটি জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশের অজুহাতে মাত্র ছয় দিনের মাথায় যেভাবে অত্যন্ত ‘বিদ্যুৎ গতিতে’ মন্ত্রণালয় থেকে বিপিসি স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। এই ঢাকামুখী চক্রান্তের বিরুদ্ধে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) নবনির্বাচিত নেতৃত্ব এবং সরকারের নীতিগত অবস্থান চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক মর্যাদা রক্ষায় এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে।
বিপিসি সদরদপ্তর চট্টগ্রামে রাখার যৌক্তিকতা এবং চট্টগ্রামের জনগণের ক্ষোভকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও জোরালোভাবে সরকারের উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরেছেন চিটাগাং চেম্বারের নবনির্বাচিত সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নতুন ২৪ জন পরিচালককে সাথে নিয়ে তিনি সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকে বসেন এবং এই হীন চক্রান্তের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ দাবি জানান। একজন দূরদর্শী ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে মোহাম্মদ আমিরুল হকের এই তাৎক্ষণিক ও সাহসী পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। চট্টগ্রামের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার যেকোনো অপচেষ্টাকে রুখে দিতে চেম্বারের এই সময়োচিত নেতৃত্ব ব্যবসায়ী সমাজ তথা সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক দাবির প্রেক্ষিতে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর স্পষ্ট ও কঠোর সিদ্ধান্ত চট্টগ্রামের মানুষের ক্ষোভকে প্রশমিত করেছে এবং সরকারের প্রতি আস্থা আরও সুদৃঢ় করেছে। মন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়ে দিয়েছেন, বিপিসির প্রধান কার্যালয় কোনোভাবেই ঢাকায় স্থানান্তর করা হবে না, এটি চট্টগ্রামেই থাকবে। তাঁর এই কঠোর অবস্থান প্রমাণ করে যে, সরকার আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতে এবং চট্টগ্রামকে প্রকৃত অর্থেই দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখতে বদ্ধপরিকর। শুধু বিপিসি রক্ষা নয়, চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের বড়দারোগাহাট এলাকায় পণ্য পরিবহনের ওজন স্কেল নিয়ে সৃষ্ট দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করার বিষয়েও মন্ত্রীর আশ্বাস অত্যন্ত ইতিবাচক।
চট্টগ্রামের সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার এই আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা দেশের সুষম উন্নয়নের পরিপন্থী। বিপিসি সদরদপ্তর চট্টগ্রামে রাখার এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেবল একটি কার্যালয় রক্ষা নয়, বরং চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক সত্তা ও মর্যাদা ধরে রাখার লড়াইয়ে একটি বড় জয়।
আমরা চিটাগাং চেম্বারের নতুন সভাপতির বলিষ্ঠ দাবি এবং অর্থমন্ত্রীর এই ন্যায়সংগত ও দৃঢ় সিদ্ধান্তকে আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানাই। আশা করি, ভবিষ্যতে চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার যেকোনো চক্রান্ত এভাবেই সম্মিলিত ও দৃঢ় নেতৃত্বের মাধ্যমে নস্যাৎ করা হবে।