বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (সিইপিজেড) পরিশোধিত শিল্পবর্জ্য পানি পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রচলিত রাসায়নিক মানদণ্ড পূরণ করলেও তা পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক বিষাক্ত ঝুঁকি তৈরি করছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নাল জার্নাল অব ওয়াটার অ্যান্ড হেলথ (ISSN: 1477-8920, EISSN: 1996-7829)-এ অতি সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষক মুহাম্মদ সাইদুর রহমান, আবদুল জলিল ও সাব্বির আহমেদের যৌথ গবেষণায় সিইপিজেডের ওয়াশিং-ডাইং ও ফিনিশিং কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অন্তর্নিহিত সংকট এবং কর্ণফুলী নদীর ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়।
গবেষণা প্রতিবেদনে গবেষকরা উল্লেখ করেন, প্রচলিত বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপিতে প্রক্রিয়াজাতকরণের পর নির্গত পানির পিএইচ (pH) এবং মোট ভারী ধাতুর পরিমাণ আপাতদৃষ্টিতে পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা (ইসিআর ২০২৩)-এর সীমার মধ্যে থাকে। তবে বিস্তারিত রাসায়নিক ও জীবতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, এটি একটি ‘কমপ্লায়েন্ট বাট টক্সিক’ বা দৃশ্যত নিয়ম মেনেও বিষাক্ততার জটিল ফাঁদ তৈরি করছে। পরীক্ষার আওতায় থাকা কারখানাগুলোর বর্জ্যে ৫ দিনের বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড বা বিওডি প্রতি লিটারে ৯৫ থেকে ১৮০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পাওয়া গেছে, যা নির্ধারিত জাতীয় মানমাত্রা (৩০ মিগ্রা/লিটার)-এর চেয়ে সর্বোচ্চ ৬০০ শতাংশ বেশি। একইসঙ্গে কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড বা সিওডি প্রতি লিটারে ২৪০ থেকে ৩২৬ মিলিগ্রাম পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে, যা নির্ধারিত সীমার তুলনায় ৬৩ শতাংশ বেশি।
গবেষকরা বর্জ্য পানির সম্মিলিত দূষণ মাত্রা পরিমাপে ‘ইফ্লুয়েন্ট কোয়ালিটি ইনডেক্স’ (ইকিউআই) ব্যবহার করেন। এতে ওয়াশিং ও ফিনিশিং খাতের বর্জ্যে সর্বোচ্চ দূষণ বোঝা (EQI = ৩.১০) এবং উচ্চমাত্রার বিষাক্ততা চিহ্নিত হয়েছে। জলজ জীব ডাফনিয়া ম্যাগনা-র ওপর পরিচালিত তীব্র বিষাক্ততা পরীক্ষায় ওয়াশিং-ফিনিশিং কারখানার বর্জ্যে কার্যকারিতা মান (EC50) পাওয়া গেছে ১৮.৫ শতাংশ, যার অর্থ এই পানি জলজ প্রাণীর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং একে নিষ্ক্রিয় করতে স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ গুণের বেশি পানির প্রবাহ বা তরলীকরণ প্রয়োজন।
গবেষণায় ব্যবহৃত থার্মোডাইনামিক স্পেসিয়েশন মডেলিংয়ের তথ্যানুযায়ী, বর্জ্য পানিতে থাকা সিসা (Pb) এবং ক্রোমিয়ামের (Cr) মতো মোট ভারী ধাতুর পরিমাণ দৃশ্যত কম হলেও এগুলোর ৪৫ থেকে ৮৮ শতাংশই মূলত দ্রবীভূত জৈব যৌগের সঙ্গে জটিল বন্ধনে অবস্থান করে। সাধারণ ইটিপি বা পানি শোধনাগারগুলো এ ধরনের জৈব-ধাতব বন্ধন পৃথক করতে পারে না। ফলে এসব ভারী ধাতু মানবদেহে প্রবেশ করে পরিপাকতন্ত্রে ভেঙে গিয়ে সরাসরি বিষক্রিয়া তৈরি করতে পারে। মোট ক্রোমিয়ামের আড়ালে অত্যন্ত ক্ষতিকর হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম কিংবা স্নায়ুবিষ সিসার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব প্রচলিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা বা জিআইএস (GIS) ম্যাপিংয়ের সাহায্যে পরিচালিত স্থানিক ঝুঁকি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সিইপিজেডের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ +কারখানাগুলোর ৮০ শতাংশই কর্ণফুলী নদীর মাত্র দুই কিলোমিটারের একটি সংবেদনশীল অংশে বর্জ্য নিষ্কাশন করছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ কমে গেলে এই পুঞ্জীভূত দূষণের প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যায় এবং নদীর ভাটি অঞ্চলের প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার বাসিন্দা খাবার পানি, গোসল ও গৃহস্থালি ব্যবহারের মাধ্যমে সরাসরি স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন।
গবেষণা নিবন্ধে সুপারিশ করা হয়েছে যে, কেবল একক রাসায়নিক উপাদানের পাস-ফেল পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে সমন্বিত ঝুঁকি মূল্যায়ন ফ্রেমওয়ার্ক চালু করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে কর্ণফুলীর দুই কিলোমিটার উচ্চঝুঁকিপূর্ণ করিডোরকে বিশেষ ব্যবস্থাপনা অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে উন্নত টারশিয়ারি ট্রিটমেন্ট, অ্যাডভান্সড অক্সিডেশন ও নিয়মিত জীবতাত্ত্বিক বিষাক্ততা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার তাগিদ দিয়েছেন গবেষকরা।