Home অন্যান্য মুগসায়েল সৈকত: সমুদ্রের গর্জন ও পাথুরে ফোয়ারার মহাবিস্ময়

মুগসায়েল সৈকত: সমুদ্রের গর্জন ও পাথুরে ফোয়ারার মহাবিস্ময়

পর্ব-৬

ওমান স্মৃতির দুই দশক: স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে দেখা

কামরুল ইসলাম

সালালাহ শহর থেকে পশ্চিম দিকে যেতে যেতে পাহাড়ি রাস্তার বাঁক যখন সমুদ্রের নীল দিগন্তে গিয়ে মিশল, আমরা বুঝতে পারলাম পৌঁছাতে আর দেরি নেই। আমাদের গন্তব্য ওমানের অন্যতম রোমাঞ্চকর স্থান ‘আল মুগসায়েল সৈকত’ (Al Mughsail Beach)। মফিজুর রহমান সাহেব আমাদের আগেভাগেই সতর্ক করেছিলেন— এখানকার সমুদ্রের ঢেউ আর বাতাসের শক্তি অন্য যে কোনো জায়গার চেয়ে আলাদা।

মুগসায়েল সৈকতে পা রাখতেই চোখে পড়ল এর দিগন্ত বিস্তৃত রুপালি সিলভার রঙের বালুচর। এখানকার সমুদ্র বেশ উত্তাল। একেকটি বিশাল ঢেউ যখন তটরেখায় এসে আছড়ে পড়ে, তার গর্জন মাইলের পর মাইল দূর থেকে শোনা যায়। পর্যটকরা এখানে কেবল সমুদ্র দেখতে আসেন না, আসেন প্রকৃতির এক অবিশ্বাস্য খেলা উপভোগ করতে।

পাথুরে ফোয়ারা বা ‘ব্লো-হোলস’ (Blowholes)

এই সৈকতের আসল আকর্ষণ হলো এখানকার প্রাকৃতিক পাথুরে ফোয়ারা। সমুদ্রের পানির তোড়ে পাহাড়ের নিচের অংশে প্রাকৃতিকভাবেই কিছু ফাটল বা সুড়ঙ্গ তৈরি হয়েছে। যখন প্রচণ্ড গতিতে ঢেউ এসে সেই সুড়ঙ্গে ধাক্কা দেয়, তখন পাহাড়ের গায়ের ছিদ্র দিয়ে নোনা জল সজোরে আকাশের দিকে অন্তত ২০-৩০ ফুট ওপরে উঠে যায়।

আমরা যখন সেই পাথুরে ছিদ্রগুলোর একদম কাছে দাঁড়ালাম, তখন পানির সেই ঝাপটা আর প্রচণ্ড শব্দে (Loud Roar) চারপাশটা কেঁপে উঠছিল। মনে হচ্ছিল কোনো অদৃশ্য শক্তি নিচ থেকে জল ছুড়ে মারছে। সেই লোনা জলের ঝাপটায় আমাদের সবার পোশাক ভিজে একাকার, কিন্তু সাংবাদিক দলের কারোরই সেদিকে খেয়াল ছিল না। সবাই তখন প্রকৃতির সেই রুদ্ররূপ ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত।

আল মুজাইনিফ গুহা (Al Muzainif Cave)

সৈকতের ঠিক পাশেই রয়েছে বিশাল এক পাহাড়ের গুহা, যার নাম ‘আল মুজাইনিফ’। গুহাটি অনেকটা ছাদের মতো সমুদ্রের দিকে ঝুঁকে আছে। গুহার ভেতর থেকে বাইরের উত্তাল সমুদ্র আর পাথুরে ফোয়ারাগুলো দেখার দৃশ্যটি ছিল ভাষায় প্রকাশের অতীত। তপ্ত ওমানি রোদের মাঝে গুহার সেই শীতল ছায়া আমাদের প্রশান্তি দিচ্ছিল। মফিজুর রহমান আমাদের বলছিলেন, বর্ষাকালে (খরিফ মৌসুম) এখানকার রূপ আরও ভয়ঙ্কর ও সুন্দর হয়ে ওঠে।

খোর আল মুগসায়েল: পাখিদের স্বর্গরাজ্য

সৈকতের পূর্ব প্রান্তে জাবাল আল কামার পাহাড়ের পাদদেশে রয়েছে একটি প্রাকৃতিক সংরক্ষিত এলাকা বা ‘খোর আল মুগসায়েল’। সমুদ্রের নোনা জল আর পাহাড়ের স্বচ্ছ জলের এই মিলনস্থলে সারা বছর প্রচুর পরিযায়ী পাখি আসে। আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে হরেক রকমের বক আর নাম না জানা পাখির ওড়াউড়ি দেখলাম। রুক্ষ পাথুরে পাহাড়ের মাঝে এমন প্রাণবৈচিত্র্য দেখে সত্যিই অবাক হতে হয়।

মুগসায়েল সৈকতের সেই লোনা বাতাস আর ঢেউয়ের গর্জন আজও কানে বাজে। সেই সফরের স্মৃতি যেন ওমানের রুক্ষ প্রকৃতির গভীরে লুকিয়ে থাকা এক সজীব প্রাণশক্তির গল্প বলে।

পরবর্তী পর্বে থাকছে: অবিশ্বাস্য দীর্ঘ এক রওজা: হযরত ইমরান (আ.)-এর পবিত্র সান্নিধ্যে এবং সালালাহর অন্যান্য ঐতিহাসিক নিশান।