Home অন্যান্য বিশ্বমানের কৃষিশিল্পের পথে বাংলাদেশ: নেপথ্যে রাকিবুর রহমান টুটুলের দূরদর্শী ভাবনা

বিশ্বমানের কৃষিশিল্পের পথে বাংলাদেশ: নেপথ্যে রাকিবুর রহমান টুটুলের দূরদর্শী ভাবনা

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ ও কৃষি খাতকে সনাতনী পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক শিল্পে রূপান্তরের অন্যতম পথিকৃৎ মোহাম্মদ রাকিবুর রহমান (টুটুল)। মেধা, সততা এবং অদম্য উদ্যোক্তা মনোভাবকে পুঁজি করে ১৯৮৯ সালে ছাত্রাবস্থায় চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের মাটিতে মাত্র ৩০০টি লেয়ার মুরগি নিয়ে তিনি যে ক্ষুদ্র উদ্যোগের সূচনা করেছিলেন, সাড়ে তিন দশকের ব্যবধানে তা আজ দেশের জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার এক বিশাল শিল্প সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে।
নাহার এগ্রো গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তাঁর হাত ধরেই প্রান্তিক কৃষি অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে উচ্চপ্রযুক্তি, গবেষণা, নিখুঁত জেনেটিক্স ও পেশাদার করপোরেট ব্যবস্থাপনা।

সাহসী সূচনা ও ব্যবসায়িক বহুমুখীকরণ

পোলট্রি শিল্পের একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন রাকিবুর রহমান টুটুল। দেশে যখন আন্তর্জাতিক মানের একদিন বয়সী বাচ্চা কিংবা সুষম পুষ্টিকর খাদ্যের চরম সংকট ছিল, তখন তিনি বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধানের লক্ষ্যে ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজ সমৃদ্ধ সমন্বিত সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলেন। তাঁর দূরদর্শী নির্দেশনায় নাহার এগ্রো গ্রুপ আন্তর্জাতিক জেনেটিক্স মানদণ্ড মেনে গ্র্যান্ড প্যারেন্ট (GP) ও প্যারেন্ট স্টক (PS) খামার পরিচালনা করছে। নিজস্ব স্বয়ংক্রিয় হ্যাচারি ও আধুনিক ল্যাবরেটরির মাধ্যমে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন উচ্চ উৎপাদনশীল ব্রয়লার ও লেয়ারের একদিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদন করে তিনি দেশের খামারিদের মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনেন।

পুষ্টিসমৃদ্ধ প্রাণিখাদ্যের নিশ্চয়তা দিতে তিনি স্থাপন করেন সম্পূর্ণ কম্পিউটারাইজড ইউরোপীয় প্রযুক্তির ফিড মিলিং অবকাঠামো। সেখান থেকে দ্রুত বর্ধনশীল ব্রয়লার ফিড, লেয়ার ফিড, ভাসমান ও ডুবন্ত ফিশ ফিড এবং বাছুরের শারীরিক বৃদ্ধি ও দুগ্ধবতী গাভীর উৎপাদন বাড়ানোর বিশেষায়িত ক্যাটল ফিড বাজারজাত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ডেইরি ও কনজিউমার খাদ্য খাতে তিনি গড়ে তোলেন প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড ‘খাটি’ (KHATI)। কোনো ধরনের রাসায়নিক বা কৃত্রিম উপাদান ছাড়াই কাঁচা তরল দুধ (Raw Milk), প্রিমিয়াম ঘি, ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি দই ও পুষ্টিকর টক দই সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন তিনি।

মাটির উর্বরতা রক্ষা ও টেকসই পরিবেশের স্বার্থে খামারের শতভাগ বর্জ্য কাজে লাগিয়ে বায়োগ্যাস ও উচ্চমানের অর্গানিক বা জৈব সার উৎপাদনের উদ্যোগও তাঁর পরিবেশবান্ধব কৃষি দর্শনের বাস্তব প্রমাণ। এছাড়াও উচ্চ ফলনশীল বীজ প্রক্রিয়াকরণ, বাণিজ্যিক হর্টিকালচার ও আধুনিক অ্যাকুয়াকালচারেও তিনি প্রতিষ্ঠানটির সফল বিস্তার ঘটিয়েছেন।

প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও মাঠপর্যায়ের সেবা

ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি তৃণমূলের খামারিদের সুরক্ষা ও ক্ষমতায়নকে সবসময় অগ্রাধিকার দিয়েছেন রাকিবুর রহমান টুটুল। পোলট্রি ও গবাদিপশুর ভাইরাসজনিত জটিল রোগ দ্রুত ও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে তিনি মাঠপর্যায়ে সংযোজন করেছেন নিজস্ব ‘পকেট পিসিআর ল্যাব’ (Pocket PCR Lab) প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে প্রান্তিক খামারিরা মারাত্মক মহামারির হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন। অভিজ্ঞ পশু চিকিৎসকদের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রেসক্রিপশন ও পরামর্শ সেবা এবং আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনার ওপর নিয়মিত ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করে তিনি গ্রামীণ অর্থনীতিকে মজবুত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছেন।

দেশজুড়ে ভৌগোলিক নেটওয়ার্ক ও শিল্প ক্লাস্টার

বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে প্রধান কার্যালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তিনি দেশের কৌশলগত অঞ্চলগুলোতে উৎপাদন অবকাঠামো ছড়িয়ে দিয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগের মিরসরাইকে কেন্দ্র করে তিনি গড়ে তুলেছেন প্রধান সমন্বিত উৎপাদন ক্লাস্টার। সীতাকুণ্ড, ফটিকছড়ি এবং কক্সবাজারের চকরিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলে স্থাপন করেছেন একাধিক হ্যাচারি ইউনিট, ব্রিডার ফার্ম, ডেইরি শেড ও ফিড মিল। উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের খামারিদের কাছে দ্রুত ও সতেজ বাচ্চা এবং ফিড সরবরাহের লক্ষ্যে সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও বগুড়া অঞ্চলে গড়ে তুলেছেন আধুনিক ফিড প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র। এছাড়া ঢাকা ও আশপাশের বাজার সামলাতে গাজীপুর ও ময়মনসিংহ করিডোরে স্থাপন করেছেন কেন্দ্রীয় লজিস্টিক হাব। ৬৪টি জেলায় বিস্তৃত ডিলার নেটওয়ার্ক, নিজস্ব শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহন বহর ও সক্রিয় কোল্ড চেইনের মাধ্যমে তিনি প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন।

শিল্প নেতৃত্ব, অর্থনীতিতে প্রভাব ও ভবিষ্যৎ রূপকল্প

শুধু নিজস্ব শিল্পগোষ্ঠী পরিচালনায় সীমাবদ্ধ না থেকে রাকিবুর রহমান টুটুল দেশের পোলট্রি, ফিড এবং ডেইরি শিল্পের সার্বিক স্বার্থ সুরক্ষায় সবসময় বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করেছেন। ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন জাতীয় বাণিজ্য সংগঠনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি দেশীয় শিল্পের পক্ষে অনুকূল নীতি নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত নাহার এগ্রো গ্রুপের মাধ্যমে আজ হাজার হাজার কৃষিবিদ, প্রকৌশলী, ভেটেরিনারিয়ান, পশুপুষ্টিবিদ ও শ্রমিকের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। একই সাথে তাঁর উন্নত ইনপুট ও দিকনির্দেশনায় দেশজুড়ে অর্ধলক্ষাধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারি স্বাবলম্বী উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।

জাতীয় অর্থনীতি ও কৃষিশিল্পে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একাধিক জাতীয় পদক ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক হালাল সার্টিফিকেশন নিয়ে রেডি-টু-কুক কনজিউমার খাদ্য, প্রক্রিয়াজাত মুরগির মাংস (Further Processed Chicken) এবং অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানির এক বৃহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন। দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাকিবুর রহমান টুটুলের আজীবনের এই সাধনা ও দূরদর্শী নেতৃত্ব বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তাদের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা।

নিয়মিত ব্যবসায়িক, উদ্যোক্তা ও শিল্প খাতের নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন পেতে ভিজিট করুন www.businesstoday24.com