Home Third Lead রাজশাহী সুগার মিল: প্রতিদিন গড়ে লোকসান ১.৭৫ কোটি টাকা

রাজশাহী সুগার মিল: প্রতিদিন গড়ে লোকসান ১.৭৫ কোটি টাকা

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, রাজশাহী: শীতের আগমনে একসময় রাজশাহীর পবা এলাকায় বাতাসের সাথে ভেসে আসত আখ মাড়াইয়ের মিষ্টি ঘ্রাণ। উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রাজশাহী সুগার মিলকে ঘিরে ছিল হাজারো মানুষের কর্মব্যস্ততা। কিন্তু সেই জৌলুস এখন কেবলই স্মৃতি।
বর্তমানে ঋণের বোঝা আর আকাশছোঁয়া লোকসানে ধুঁকছে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি। গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মিলটি যখনই উৎপাদনে যায়, প্রতিদিন গড়ে প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়।
লোকসানের ভয়াবহ পরিসংখ্যান
গত পাঁচ বছরে রাজশাহী সুগার মিলটি সব মিলিয়ে মাত্র ১৭৩ দিন চালু ছিল। এই স্বল্প সময়ে মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মিলটি চালু থাকা অবস্থায় প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
বছরভিত্তিক লোকসানের চিত্র দেখলে এই সংকটের গভীরতা স্পষ্ট হয়:
  • ২০২১-২২ অর্থবছর: ১৯ দিন উৎপাদনে লোকসান ৬৩ কোটি টাকা।
  • ২০২২-২৩ অর্থবছর: ২১ দিন উৎপাদনে লোকসান প্রায় ৬৩ কোটি টাকা।
  • ২০২৩-২৪ অর্থবছর: ৩৫ দিন উৎপাদনে লোকসান ৬৬ কোটি টাকা।
  • ২০২৪-২৫ অর্থবছর: লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ৬৯ কোটি টাকা।
  • ২০২৫-২৬ অর্থবছর: লোকসানের অঙ্ক সর্বোচ্চ ৭০ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
উৎপাদন ব্যয় বনাম বিক্রয়মূল্য: এক অসম লড়াই
মিলের বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় যে, প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে খরচ হচ্ছে ৪০৫ টাকা ৬৮ পয়সা। অথচ বাজারে এই চিনি বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ১০০ থেকে ১২৫ টাকা কেজিতে। উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রয়মূল্য প্রায় চারগুণ কম হওয়ায় প্রতি কেজিতেই বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে।
সংকটের মূল কারণসমূহ
রাজশাহী সুগার মিলের এই করুণ দশার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ উঠে এসেছে:
১. তীব্র আখ সংকট: কৃষকরা এখন দীর্ঘমেয়াদি আখ চাষের চেয়ে স্বল্পমেয়াদি ও লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। অনেকে আখের জমিতে পুকুর কেটে মাছ চাষ করছেন। ফলে মিলটি তার ক্ষমতার তুলনায় পর্যাপ্ত আখ পাচ্ছে না। ২. পুরোনো যন্ত্রপাতি: ৬৫ বছরের পুরোনো আমলের যন্ত্রপাতি দিয়ে উৎপাদন চালানোর ফলে যান্ত্রিক ত্রুটি ও মেরামত ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। ৩. জনবল সংকট: দীর্ঘ ১২ বছর নিয়োগ বন্ধ থাকায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক কারিগরি পদ শূন্য। ২ হাজার অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র চার শতাধিক কর্মী কর্মরত আছেন। ৪. গুড় ব্যবসায়ীদের দাপট: মিলের চেয়ে গুড় ব্যবসায়ীরা আখের দাম বেশি দেওয়ায় কৃষকরা সরাসরি তাদের কাছে আখ বিক্রি করে দিচ্ছেন।
উত্তরণের পথ ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
মিলের কর্মকর্তারা মনে করেন, শুধু চিনি উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে এই মিল বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। লোকসান কমাতে ও মিলকে আধুনিক করতে বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:
বহুমুখী পণ্য উৎপাদন: শুধু চিনি নয়, আখ থেকে ইথানল, জৈব সার এবং কো-জেনারেশনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা।
আধুনিকায়ন: পুরোনো যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করে আধুনিক প্রযুক্তির বিএমআরই (BMRE) করা।
কৃষকদের প্রণোদনা: আখ চাষে চাষিদের আগ্রহী করতে সময়মতো পাওনা পরিশোধ এবং উচ্চ ফলনশীল বীজের সরবরাহ নিশ্চিত করা।
অফ-সিজন ব্যবহার: মাড়াই মৌসুম বাদে বছরের বাকি সময় আম বা অন্য ফলের জুস ফ্যাক্টরি স্থাপন করে মিলের আয় বৃদ্ধি করা।
সঠিক পরিকল্পনা এবং আধুনিকায়ন ছাড়া উত্তরবঙ্গের এই শিল্প রক্ষার আর কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও খবরের জন্য businesstoday24.com ফলো করুন