Home আন্তর্জাতিক লন্ডনের জাদুঘরে বন্দি বাংলার সোনালী অতীত

লন্ডনের জাদুঘরে বন্দি বাংলার সোনালী অতীত

লুণ্ঠন, উপহার নাকি জোরপূর্বক বাজেয়াপ্ত?

আজহার মুনিম শাফিন, লন্ডন:
লন্ডনের গ্রেট রাসেল স্ট্রিটের ঐতিহাসিক ব্রিটিশ মিউজিয়াম। বিশ্ব সভ্যতার হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী এই জাদুঘরের গ্যালারিগুলোতে কান পাতলে শোনা যায় এক দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস। সেখানে সংরক্ষিত প্রাচীন মুদ্রা, কষ্টিপাথরের দেব-দেবী, মসলিন আর নকশিকাঁথার শরীরে লেগে আছে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের ধুলোবালি ও ঐতিহ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হাজার মাইল দূরের এই সুদূর লন্ডনে কীভাবে পৌঁছাল  এই অমূল্য প্রত্নসম্পদ? এগুলো কি স্বেচ্ছায় দেওয়া উপহার, নাকি ঔপনিবেশিক ক্ষমতার জোরে করা ঐতিহাসিক লুণ্ঠন? ইতিহাস ঘেঁটে এর পেছনে মূলত দুটি বড় সত্যের সন্ধান মেলে।
১. ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন ও জোরপূর্বক বাজেয়াপ্তকরণ
ব্রিটিশ মিউজিয়ামে থাকা বাংলার প্রাচীনতম ও সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর সিংহভাগই মূলত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন (১৭৫৭-১৮৫৮) এবং পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ রাজের (১৮৫৮-১৯৪৭) সরাসরি শাসনামলে জোরপূর্বক বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়ে আসা হয়েছিল।
যুদ্ধ ও ক্ষমতার পালাবদল
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় এই লুণ্ঠনের অধ্যায়। মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় জয়ী হয়ে লর্ড ক্লাইভ এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বাংলার রাজকোষ বা ট্রেজারি কার্যত শূন্য করে ফেলেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন আঞ্চলিক যুদ্ধ এবং বক্সারের যুদ্ধের পর বাংলার নবাব, মনসবদার ও স্থানীয় জমিদারদের কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ সোনা, রৌপ্য, রত্নপাথর এবং ঐতিহাসিক স্মারক সরাসরি ব্রিটিশরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়, যার একটি বড় অংশ কালক্রমে লন্ডনের জাদুঘরে স্থান পায়।
প্রশাসনিক বাজেয়াপ্তকরণ
ঔপনিবেশিক শাসনামলে কর বা রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতার দায়ে ব্রিটিশরা কঠোর আইন প্রয়োগ করত। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর বহু ঐতিহ্যবাহী জমিদারি এস্টেট সূর্যাস্ত আইনের কবলে পড়ে নিলাম হয়ে যায়। এছাড়া, বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহে জড়িত থাকার অভিযোগে অনেক রাজপরিবারের সম্পত্তি ক্রোক করা হয়। এই প্রশাসনিক বাজেয়াপ্তকরণের আড়ালে মূল্যবান রাজকীয় অলংকার, প্রাচীন অস্ত্র ও ঐতিহাসিক স্মারকগুলোকে ‘লুটপাটের মাল’ (Booty) হিসেবে লন্ডনে পাঠিয়ে দেওয়া হতো।
২. উপহার এবং ব্যক্তিগত সংগ্রহ
লন্ডনে বাংলার প্রত্নসম্পদ পাচারের আরেকটি বড় মাধ্যম ছিল তৎকালীন ভারতে কর্মরত ব্রিটিশ কর্মকর্তা, সামরিক অফিসার, চিকিৎসক ও ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগত শখ এবং ক্ষমতার প্রভাব।
ব্যক্তিগত শখ ও খনন
১৭শ থেকে ২০শ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলায় অসংখ্য ব্রিটিশ কর্মকর্তা কর্মরত ছিলেন। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রতি অতিমাত্রায় আগ্রহী। চার্লস স্টুয়ার্ট (যিনি ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগের কারণে ‘হিন্দু স্টুয়ার্ট’ নামে পরিচিত ছিলেন) কিংবা বুকানন হ্যামিল্টনের মতো কর্মকর্তারা পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল—বিশেষ করে ঢাকা, বিক্রমপুর, ময়নামতী ও বরেন্দ্র অঞ্চল চষে বেড়াতেন। তারা স্থানীয় নদী-নালা, পরিত্যক্ত ঢিবি বা প্রাচীন মন্দির থেকে কষ্টিপাথরের মূর্তি, ভাস্কর্য এবং সুলতানি আমলের মুদ্রা নামমাত্র মূল্যে কিনে নিতেন কিংবা ক্ষমতার দাপটে সংগ্রহ করতেন।
উপহার ও উইল
চাকরির মেয়াদ শেষে এই কর্মকর্তারা যখন যুক্তরাজ্যে ফিরতেন, তখন নিজেদের জাহাজের বাক্স বোঝাই করে নিয়ে আসতেন বাংলার এই অমূল্য সম্পদ। পরবর্তীতে তাদের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীরা কিংবা তারা নিজেরা উইলের মাধ্যমে এই সংগ্রহগুলো ব্রিটিশ মিউজিয়ামে দান বা বিক্রি করে দেন।
অন্যদিকে, আরেকটি ধারা ছিল রাজনৈতিক তোষণ। তৎকালীন বাংলার অনেক স্থানীয় রাজা, নবাব কিংবা প্রভাবশালী জমিদাররা ব্রিটিশ বড়লাট বা গভর্নর জেনারেলদের খুশি রাখতে এবং নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন রাজকীয় স্মারক, মসলিন কাপড় কিংবা স্বর্ণমুদ্রা উপহার হিসেবে দিতেন। সেই ‘উপহার’গুলোও একসময় ব্যক্তিগত হাত ঘুরে স্থায়ী ঠিকানা করে নেয় ব্রিটিশ মিউজিয়ামে।
ইতিহাস যখন কাঠগড়ায়
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে থাকা এই ৬ শতাধিক নিদর্শনকে অনেকেই কেবল ‘সংগ্রহ’ হিসেবে দেখতে নারাজ। বৈশ্বিক ইতিহাসবিদ এবং গবেষকদের মতে, এটি ছিল একটি সুসংগঠিত সাংস্কৃতিক লুণ্ঠন, যা একটি দেশের ইতিহাস ও শিকড়কে তার ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। প্রদর্শনীর কাচের দেওয়ালের ওপারে থাকা বাংলার প্রতিটি নিদর্শন আজ কেবল বাংলার অতীত ঐতিহ্যের স্মারকই নয়, বরং ঔপনিবেশিক শোষণের এক নীরব দলিলও ।
ভিজিট করুন www.businesstoday24.com