বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে তৃতীয় দফায় দাম বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬৮০ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। দেশের ইতিহাসে এটিই স্বর্ণের সর্বোচ্চ দাম। বুধবার রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে এই নতুন দর ঘোষণা করা হয়, যা আজ বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) থেকে কার্যকর হবে।
নতুন মূল্যতালিকা একনজরে:
বাজুসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্বর্ণের নতুন দাম নিম্নরূপ:
- ২২ ক্যারেট: ২,৩৪,৬৮০ টাকা (ভরি)
- ২১ ক্যারেট: ২,২৪,০০৭ টাকা (ভরি)
- ১৮ ক্যারেট: ১,৯১,৯৮৯ টাকা (ভরি)
- সনাতন পদ্ধতি: ১,৫৭,২৩১ টাকা (ভরি)
উল্লেখ্য, এই মূল্যের সাথে ক্রেতাকে বাধ্যতামূলকভাবে ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি প্রদান করতে হবে।
দেশের বাজারে স্বর্ণের এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রতিফলন।
১. বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও অস্থিরতা: জানুয়ারির শুরু থেকেই ইরান ও ভেনেজুয়েলাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। ইরানে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকির ফলে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন। ইতিহাসে দেখা গেছে, যখনই যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে, তখনই ডলার বা শেয়ারবাজারের চেয়ে স্বর্ণের চাহিদা বেড়ে যায়।
২. আন্তর্জাতিক বাজারে আউন্সপ্রতি দর: আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম ইতোমধ্যে ৪,৬০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গোল্ডম্যান স্যাকস ও জেপি মরগানের মতো বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বাভাস দিচ্ছে যে, ২০২৬ সালের শেষের দিকে স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ৫,০০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিশ্ববাজারের এই ঊর্ধ্বগতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে।
৩. মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ও ডলার সংকট: যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’-এর চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত এবং দেশটির আর্থিক ব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্ববাজারে ডলার কিছুটা দুর্বল হয়েছে। ডলারের মান কমলে সাধারণত স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পায়। এছাড়া বাংলাদেশে ডলারের উচ্চমূল্য এবং স্থানীয় বাজারে ‘তেজাবী স্বর্ণের’ (বিশুদ্ধ স্বর্ণ) সরবরাহ সংকটের কারণে বাজুস দফায় দফায় দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে।
৪. স্থানীয় বাজারে প্রভাব: মাত্র তিন দফায় ভরিতে স্বর্ণের দাম বেড়েছে ৭,৮৭৪ টাকা। বিয়ের মৌসুম এবং অনুষ্ঠানাদিতে স্বর্ণের এই আকাশছোঁয়া দাম মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, দাম এভাবে বাড়তে থাকলে অলঙ্কার বিক্রিতে মন্দা দেখা দিতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা না আসবে, ততক্ষণ স্বর্ণের বাজারে এই অস্থিরতা বজায় থাকার সম্ভাবনা বেশি। বিনিয়োগের নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে স্বর্ণের কদর বাড়লেও সাধারণ ভোক্তাদের জন্য তা এখন চরম দুষ্প্রাপ্য বস্তুতে পরিণত হয়েছে।










