Home অন্যান্য বিষাক্ত কর্মপরিবেশ: অফিস রাজনীতির আড়ালে পিষ্ট মানসিক স্বাস্থ্য

বিষাক্ত কর্মপরিবেশ: অফিস রাজনীতির আড়ালে পিষ্ট মানসিক স্বাস্থ্য

ফরিদুল আলম
ঘর বাদে জীবনের সবচেয়ে বড় একটা সময় কাটে কর্মক্ষেত্রে। কিন্তু সেই কর্মক্ষেত্র যদি সুস্থ প্রতিযোগিতার বদলে নোংরা ‘অফিস পলিটিক্স’ বা রাজনীতির আখড়া হয়ে ওঠে, তবে তা বিষাক্ত রূপ নেয়। এই বিষাক্ত পরিবেশ কেবল একজন কর্মীর ক্যারিয়ারের ক্ষতি করে না, বরং তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক আঘাত হানে। প্রতিদিনের মানসিক চাপ, অন্যায় আচরণ এবং বৈষম্যের শিকার হতে হতে অনেক কর্মী একসময় তীব্র বিষণ্নতায় ভোগেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অফিস রাজনীতির এই মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এতটাই গভীর যে তা একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকেও ধ্বংস করে দিতে পারে।
যেভাবে ব্যক্তিগত জীবন, ঘুম ও মানসিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়
১. ঘুমের ব্যাঘাত ও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি (Insomnia & Fatigue) সারাদিনের অফিসের মানসিক চাপ ও লাঞ্ছনার স্মৃতি রাতেও কর্মীদের তাড়া করে বেড়ায়। ‘আগামীকাল অফিসে কী হবে?’, ‘বস আবার কার কথায় ভুল বুঝবেন?’— এসব দুশ্চিন্তা মস্তিস্ককে শান্ত হতে দেয় না। ফলে রাতের পর রাত ঘুম আসে না। দীর্ঘদিনের এই অনিদ্রা একসময় মানুষকে শারীরিকভাবেও অসুস্থ ও ক্লান্ত করে তোলে।
২. ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কে টানাপোড়েন অফিসের ক্ষোভ ও হতাশা মানুষ অনেক সময় অজান্তেই পরিবারের ওপর গিয়ে ঝাড়ে। কর্মক্ষেত্রের বিষাক্ত পরিবেশের কারণে একজন কর্মী ঘরে ফিরেও স্বাভাবিক বা হাসিখুশি থাকতে পারেন না। জীবনসঙ্গী, সন্তান বা মা-বাবার সাথে খিটখিটে আচরণ, সামাজিকতা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া এবং সবসময় খিটখিটে মেজাজে থাকার কারণে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোও ভাঙনের মুখে পড়ে।
৩. তীব্র বিষণ্নতা ও প্যানিক অ্যাটাক (Anxiety & Depression) যখন একজন কর্মী দেখেন যে কঠোর পরিশ্রমের পরও তাকে প্রতিনিয়ত মিথ্যা অপবাদ বা গুজবের শিকার হতে হচ্ছে, তখন তার নিজের যোগ্যতার ওপর থেকে বিশ্বাস উঠে যায়। এই হীনম্মন্যতা একসময় গভীর বিষণ্নতায় রূপ নেয়। এমনকি রবিবার রাতে বা সোমবার সকালে অফিসে যাওয়ার কথা চিন্তা করলেই অনেকের বুক ধড়ফড় করা বা প্যানিক অ্যাটাক হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়।
বিষণ্নতা ও মানসিক চাপ থেকে মুক্তির উপায়: বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অফিসের পরিবেশ রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তবে কিছু মনস্তাত্ত্বিক কৌশল এবং সচেতন পদক্ষেপের মাধ্যমে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত রাখা অবশ্যই সম্ভব।
  • পেশাদার ও ব্যক্তিগত জীবনের মাঝে দেয়াল তুলুন: অফিস শেষ হওয়ার সাথে সাথে অফিসের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। ছুটির দিনগুলোতে অফিসের ইমেইল বা মেসেজ দেখা থেকে বিরত থাকুন। নিজের পরিবার, শখ এবং বিনোদনকে সময় দিন।
  • আবেগের রাশ টেনে ধরুন: রাজনীতিপ্রিয় সহকর্মীরা সবসময় চাইবে আপনাকে উস্কে দিয়ে আপনার মুখ থেকে কোনো নেতিবাচক কথা বের করতে বা আপনাকে রাগিয়ে দিতে। তাই অফিসে যেকোনো পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বা রিঅ্যাক্ট করা বন্ধ করুন। নিজেকে শান্ত রেখে সম্পূর্ণ পেশাদার উপায়ে পরিস্থিতি সামলান।
  • ডকুমেন্টেশন বা প্রমাণের ওপর জোর দিন: মৌখিক কথার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাজে লিখিত বা ইমেইলের প্রমাণ রাখা জরুরি। আপনার প্রতিটি কাজের হিসাব ও কথোপকথন ডকুমেন্ট আকারে রাখুন। এতে আপনার বিরুদ্ধে কেউ মিথ্যা রটনা করলে আপনি সহজেই তা প্রমাণ করতে পারবেন এবং এটি আপনাকে এক ধরণের মানসিক স্বস্তি ও নিরাপত্তা দেবে।
  • বিশ্বস্ত বৃত্ত তৈরি করুন: অফিসের সবার সাথে সব কথা শেয়ার করার ভুলটি করবেন না। অফিসের বাইরে আপনার এমন বন্ধুদের সাথে কথা বলুন যারা আপনাকে বোঝে। প্রয়োজনে পেশাদার কাউন্সেলর বা থেরাপিস্টের সাহায্য নিতে দ্বিধাবোধ করবেন না।
  • শেষ অপশন— নতুন সুযোগের সন্ধান: যদি দেখা যায় প্রতিষ্ঠানের কালচার এতটাই বিষাক্ত যে হিউম্যান রিসোর্স (HR) বা শীর্ষ ম্যানেজমেন্টও এর অংশ, তবে নিজের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে সেখানে পড়ে থাকার কোনো মানে হয় না। নীরবে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী নতুন চাকরির চেষ্টা শুরু করুন। মনে রাখবেন, কোনো চাকরিই আপনার মানসিক শান্তির চেয়ে বড় নয়।
দিনশেষে, কর্মক্ষেত্রে রাজনীতি থাকবেই, কিন্তু তাকে আপনার জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিতে দেওয়া যাবে না। মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সঠিক কৌশলের মাধ্যমেই এই অদৃশ্য যুদ্ধ জয় করা সম্ভব।

বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন www.businesstoday24.com