Home আন্তর্জাতিক ইমরান খানকে সরাতে ওয়াশিংটনের সেই গোপন তারবার্তা ফাঁস!

ইমরান খানকে সরাতে ওয়াশিংটনের সেই গোপন তারবার্তা ফাঁস!

ইমরান খান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
পাকিস্তানের রাজনীতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ক্ষমতাচ্যুতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবারও তোলপাড় শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘ড্রপ সাইট নিউজ’ (Drop Site News) একটি অত্যন্ত গোপনীয় পাকিস্তানি কূটনৈতিক তারবার্তা (সাইফার) সম্পূর্ণ প্রকাশ করেছে। এই গোপন নথিতে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে যে, ২০২২ সালের এপ্রিলে ইমরান খানকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপ কাজ করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, ইমরান খানকে যদি সাংবিধানিক উপায়ে (অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে) ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তবে পাকিস্তানের ওপর ওয়াশিংটনের সব ক্ষোভ মিটে যাবে এবং “সব মাফ করে দেওয়া হবে”।
ডোনাল্ড লু ও পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতের সেই গোপন বৈঠক
ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৭ মার্চ ওয়াশিংটনে একটি মধ্যাহ্নভোজ বৈঠকে বসেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু এবং তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আসাদ মজিদ খান।
বৈঠকে ডোনাল্ড লু অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন, ইমরান খানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব সফল হলে ওয়াশিংটনের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কের টানাপোড়েন কেটে যাবে। তিনি রাষ্ট্রদূতকে আশ্বস্ত করে বলেন, “সব মাফ করে দেওয়া হবে।” অন্যথায়, ইমরান খান ক্ষমতায় থাকলে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে চরম কূটনৈতিক একাকীত্বের মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করা হয়।
ইউক্রেন যুদ্ধ ও পুতিন সফর: সংকটের মূল সূত্রপাত
যুক্তরাষ্ট্রের এই তীব্র অসন্তোষের পেছনে মূল কারণ ছিল ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইমরান খানের মস্কো সফর। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে আগে থেকে নির্ধারিত একটি বৈঠকে অংশ নিতে ইমরান খান যখন মস্কো পৌঁছান, ঠিক তখনই ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া।
এই সফরের ঠিক কয়েকদিন আগে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মোইদ ইউসুফকে ফোন করে সফরটি বাতিল করার জন্য প্রচণ্ড চাপ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইমরান খান সেই সতর্কতা উপেক্ষা করে মস্কো যান। এর পরপরই জাতিসংঘে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আনা প্রস্তাবে পাকিস্তান ভোটদানে বিরত থাকে, যা ওয়াশিংটনকে আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে।
পর্দার আড়ালে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর তৎপরতা
ড্রপ সাইট নিউজের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইমরান খানের বেসামরিক সরকারকে না জানিয়েই পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক নেতৃত্ব মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে নিজস্ব যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিল।
ড্রোন ঘাঁটির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান: ২০২১ সালের জুনে সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম জে. বার্নস পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করে আফগানিস্তানে ড্রোন হামলা চালানোর জন্য ঘাঁটি চেয়ে ইসলামাবাদে এসেছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন এবং সিআইএ প্রধানের সাথে দেখাও করেননি।
লবিস্ট নিয়োগ: সিআইএ প্রধানের এই ব্যর্থ সফরের পর, ২০২১ সালের জুলাই মাসে ইমরান খানের অজান্তেই পাকিস্তানের জেনারেলরা ওয়াশিংটনে লবিং করার জন্য সিআইএর একজন প্রাক্তন ইসলামাবাদ স্টেশন প্রধানকে গোপনে নিয়োগ দেন। এটি ছিল নির্বাচিত সরকারকে এড়িয়ে সামরিক বাহিনীর স্বাধীনভাবে কাজ করার প্রাথমিক লক্ষণ।
ক্ষমতা বদল ও ইউক্রেনে পাকিস্তানি অস্ত্র সরবরাহ
২০২২ সালের ৯ এপ্রিল পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হন। এর পেছনে বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি পাকিস্তানের সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের পরোক্ষ সমর্থন ছিল।
ক্ষমতা পরিবর্তনের পর নতুন সামরিক সমর্থিত সরকার ওয়াশিংটনের সেই সব দাবি পূরণ করতে শুরু করে, যা ইমরান খান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ফাঁস হওয়া নথি থেকে জানা যায়, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে পাকিস্তান গোপনে মার্কিন প্রতিরক্ষা ঠিকাদার ও তৃতীয় দেশের মাধ্যমে ইউক্রেনকে বিপুল পরিমাণ কামানের গোলা এবং গোলাবারুদ সরবরাহ করতে শুরু করে, যা ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথম বছরে তাদের অস্ত্রের ঘাটতি মেটাতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
যদিও মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর বরাবরই ইমরান খানকে সরানোর পেছনে কোনো ধরনের ভূমিকার কথা অস্বীকার করে আসছে, তবে ড্রপ সাইট নিউজের এই সম্পূর্ণ নথি ফাঁসের ঘটনা প্রমাণ করে যে, দুই দেশের সম্পর্কের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন এবং মার্কিন রাজনৈতিক সিগন্যালিংই ইমরান খানের বিদায়ের পথ সুগম করেছিল।

businesstoday24.com ফলো করুন