Home First Lead ডিপি ওয়ার্ল্ড বনাম এমজিএইচ গ্রুপ: এনসিটি দখলে কার চাল শক্তিশালী?

ডিপি ওয়ার্ল্ড বনাম এমজিএইচ গ্রুপ: এনসিটি দখলে কার চাল শক্তিশালী?

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: চট্টগ্রাম বন্দরের হৃদপিণ্ড খ্যাত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাই-ভিত্তিক গ্লোবাল পোর্ট অপারেটর ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-কে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়া নিয়ে সরকারি সিদ্ধান্তের গোলকধাঁধাঁ নতুন এক মোড় নিয়েছে। গত ৪ জুন (বৃহস্পতিবার) একই দিনে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো দুটি আপাত-পরস্পরবিরোধী চিঠি কেবল বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যেই নয়, বরং দেশের নীতিনির্ধারণী মহলেও বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই জোড়া চিঠি কেবল প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে দেশীয় খাতের স্বার্থ রক্ষা, শ্রমিক অসন্তোষ এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতার এক জটিল সমীকরণ।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে বৃহস্পতিবার সকালে পাঠানো প্রথম চিঠিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে (সিপিএ) ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চলমান ইজারা চুক্তি প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত শেষ করা অথবা এটি সম্পূর্ণ বাতিল করার চরমপত্র দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিকেলে পাঠানো অন্য একটি চিঠিতে অবস্থান বদলে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

নৌপরিবহন সচিব মোঃ জাকারিয়া এটিকে ‘পলিসি শিফট’ বা নীতিগত পরিবর্তন বলতে নারাজ। তাঁর ভাষ্যমতে, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের একটি পর্যবেক্ষণ বা ওপিনিয়নের ওপর ভিত্তি করে প্রথম চিঠিটি দেওয়া হয়েছিল। পরে সিপিএ এর ব্যাখ্যা চাইলে আলোচনা সচল রাখার জন্য দ্বিতীয় চিঠি পাঠানো হয়।

তবে বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই তাড়াহুড়ো ও সিদ্ধান্তহীনতা প্রমাণ করে যে, দেশের ৪৪ শতাংশ কনটেইনার হ্যান্ডল করা এই স্পর্শকাতর টার্মিনালটির ভাগ্য নির্ধারণে সরকারের ওপর বহুমুখী মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাপ রয়েছে।

বড় বিনিয়োগের টোপ: এনসিটির সাথে সিসিটিও চায় ডিপি ওয়ার্ল্ড

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে শ্রমিক ধর্মঘট ও তীব্র প্রতিবাদের মুখে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ৮ এপ্রিল দুবাইতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-দুবাই যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মের চতুর্থ বৈঠকে ডিপি ওয়ার্ল্ড এক নতুন এবং আরও বড় প্রস্তাব টেবিল করে।

ডিপি ওয়ার্ল্ড কেবল এনসিটি নয়, এর সংলগ্ন চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি)-কেও আধুনিকায়ন করে দুটি টার্মিনালকে একসাথে একটি ‘ইন্টিগ্রেটেড টার্মিনাল’ হিসেবে পরিচালনা করার আগ্রহ দেখিয়েছে। টার্মিনাল দুটির ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে এটি অপারেশন্স আরও সাশ্রয়ী করবে বলে তাদের দাবি। এই বড় চালের মাধ্যমে তারা ইজারা চুক্তিটি ১৫ বছরের জন্য নিজেদের অনুকূলে নিতে মরিয়া।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কর্পোরেট যুদ্ধ

ডিপি ওয়ার্ল্ডের এই একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টার সমান্তরালে পর্দার আড়ালে তৈরি হয়েছে তীব্র বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা। দেশীয় বহুজাতিক জায়ান্ট ‘এমজিএইচ গ্রুপ’ এবং পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনাকারী সৌদি আরবের ‘আরএসজিটি’ এই ইজারা প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে তীব্র আগ্রহ দেখিয়েছে। বিশেষ করে এমজিএইচ গ্রুপ সিসিটি ও এনসিটি পরিচালনার জন্য ২৫০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। এমনকি তারা ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ে কনটেইনার প্রতি ৫ ডলার বেশি রাজস্ব দেওয়ারও দাবি করেছে। তবে তাদের এই প্রস্তাব এখনো আনুষ্ঠানিক বিবেচনার টেবিলে ওঠেনি।

দেশীয় অপারেটর বনাম বিদেশি আধিপত্য এনসিটির নিয়ন্ত্রণ বিদেশি হাতে ছেড়ে দেওয়া নিয়ে বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ী মহলে স্পষ্ট বিভাজন দেখা দিয়েছে।

দেশীয় অপারেটরদের যুক্তি: স্থানীয় বন্দর অপারেটর ও একাংশের ব্যবসায়ীদের মতে, এনসিটি একটি সম্পূর্ণ সচল, আধুনিক ও অত্যন্ত লাভজনক টার্মিনাল। যে টার্মিনাল দেশীয় ব্যবস্থাপনায় সম্প্রতি এক মাসে রেকর্ড ১.২৬ লাখ টিইউইইউএস (TEUs) কনটেইনার হ্যান্ডল করেছে, তা কোনো বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাদের মতে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের যদি বিনিয়োগ করতেই হয়, তবে তারা বে-টার্মিনালের মতো নতুন কোনো মেগা প্রজেক্টে বিনিয়োগ করুক; সচল ও লাভজনক রাষ্ট্রীয় সম্পদ তাদের হাতে তুলে দেওয়া জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।

শ্রমিকদের প্রতিরোধ: শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) এবং বন্দর রক্ষা পরিষদ গত ২১ মে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ডিপি ওয়ার্ল্ডের এই চুক্তিকে ‘দেশবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তীব্র প্রতিরোধের ডাক দিয়েছে। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে তাদের ডাকা ধর্মঘটে পুরো বন্দর অচল হয়ে পড়েছিল, যা দেশের আমদানি-রপ্তানি খাতকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলে।

বিদেশি ব্যবস্থাপনার সমর্থকদের যুক্তি: আমদানিকারকদের একাংশ ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো বৈশ্বিক জায়ান্ট যুক্ত হলে বন্দরের কর্মক্ষমতা, প্রযুক্তিগত মান এবং আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস চেইনে চট্টগ্রামের রেটিং অনেক বাড়বে।

ছুটির দিনেও তৎপর সিপিএ

মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় চিঠির সবুজ সংকেত পেয়েই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ চুক্তি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে কোমর বেঁধে নেমেছে। গত শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও সিপিএ চেয়ারম্যানের দপ্তর থেকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চূড়ান্ত দরকষাকষির জন্য একটি ৭ সদস্যের ‘মূল্যায়ন কমিটি’ গঠনের অনুমোদন চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এই কমিটির রিপোর্টের ওপরই এখন নির্ভর করছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই লাইফলাইনের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে।