বিতর্কের কেন্দ্রে ‘লন্ডনের ইসলামায়ন’
আজহার মুনিম শাফিন, লন্ডন: লন্ডনের আসন্ন মেয়র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ রাজনীতিতে এখন টানটান উত্তেজনা। একদিকে টানা চতুর্থ মেয়াদে জয়ের লক্ষ্যে থাকা লেবার পার্টির হেভিওয়েট প্রার্থী সাদিক খান, অন্যদিকে কট্টরপন্থী রিফর্ম ইউকে-এর উদীয়মান নেত্রী লাইলা কানিংহাম। তবে এবারের লড়াই কেবল উন্নয়ন বা অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই; লাইলা কানিংহামের সাম্প্রতিক ‘ইসলামায়ন’ বিরোধী বক্তব্য লন্ডনকে কার্যত দুই মেরুতে বিভক্ত করে ফেলেছে।
গত সপ্তাহে একটি রাজনৈতিক সমাবেশে লাইলা কানিংহাম দাবি করেন যে, সাদিক খানের ১০ বছরের শাসনামলে লন্ডন তার ‘ব্রিটিশ ঐতিহ্য’ হারিয়ে ফেলেছে। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিতর্কিত বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে বলেন, “লন্ডন এখন আর আগের মতো নেই, এখানে কার্যত একটি সমান্তরাল শরিয়াহ ব্যবস্থা গড়ে উঠছে যা ব্রিটিশ আইনের পরিপন্থী।”
মিশরীয় বংশোদ্ভূত এই মুসলিম নারী নেত্রীর মুখে এমন বক্তব্যে হতবাক হয়েছে লন্ডনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, লন্ডনের মূলধারার সংস্কৃতিতে যারা খাপ খাওয়াতে পারবে না, তাদের এই শহর ত্যাগ করা উচিত।
রাজনীতির নতুন সমীকরণ: সাদিক খানের চ্যালেঞ্জ
বর্তমান মেয়র সাদিক খান এই আক্রমণকে ‘বিদ্বেষপূর্ণ এবং বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। লেবার পার্টির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “কানিংহাম এমন এক লন্ডনের ছবি আঁকছেন যা কেবল তার কল্পনাতেই আছে। তিনি আমাদের বহুত্ববাদী সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে ভোট আদায়ের চেষ্টা করছেন।”
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কানিংহামের এই ‘শোক ট্রিটমেন্ট’ রাজনীতি অনেক ভোটারের মধ্যে প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে যারা লন্ডনের অপরাধ বৃদ্ধি এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসন নীতি নিয়ে অসন্তুষ্ট।
নির্বাচনী ইশতেহারে কানিংহাম বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন:
বোরকা নিষেধাজ্ঞা: নিরাপত্তা এবং সামাজিক সংহতির দোহাই দিয়ে জনসমক্ষে মুখ ঢাকা পোশাকের ওপর কড়াকড়ি।
নতুন শেরিফ মডেল: নিউ ইয়র্কের আদলে লন্ডনে অপরাধ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং পুলিশের ক্ষমতা বৃদ্ধি।
ইসলামোফোবিয়া সংজ্ঞা বর্জন: তিনি জানিয়েছেন, ইসলামোফোবিয়াকে আলাদা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা বাক-স্বাধীনতার পরিপন্থী।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, রিফর্ম ইউকে-এর সমর্থন লন্ডনে এক লাফে ২৩ শতাংশে পৌঁছেছে। যদিও সাদিক খান এখনো জনপ্রিয়তায় এগিয়ে আছেন, তবে ‘আউটার লন্ডন’ বা প্রান্তিক এলাকাগুলোতে কানিংহামের জনপ্রিয়তা তাকে কড়া টক্কর দিচ্ছে। বেটিং মার্কেটগুলোতেও কানিংহাম এখন সাদিক খানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে (৫/২ রেট) উঠে এসেছেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. হ্যারল্ড ফিনচ বলেন, “এটি কেবল একটি নির্বাচন নয়, এটি লন্ডনের আত্মার লড়াই। একদিকে রয়েছে বৈচিত্র্যের উদযাপন, অন্যদিকে রয়েছে জাতীয়তাবাদী সংস্কার। কানিংহামের ব্যক্তিগত পটভূমি তাকে এই বিতর্কে এক অদ্ভুত সুবিধা দিচ্ছে, কারণ তার বিরুদ্ধে ধর্মবিদ্বেষের অভিযোগ আনা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে পড়ছে।”
লন্ডনের রাজপথ থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম—সবখানেই এখন একটাই প্রশ্ন: ২০২৬-এর মে মাসে লন্ডন কি তার বহুসংস্কৃতির ধারা বজায় রাখবে, নাকি কানিংহামের নেতৃত্বে এক নতুন রক্ষণশীল অধ্যায়ে প্রবেশ করবে?










