সীতাকুণ্ডে কি নতুন নির্বাচন নাকি জামায়াত প্রার্থীর ভাগ্য খুলছে?
নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বেসরকারিভাবে জয়ী বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ কর্তৃক বাতিল হওয়ার পর আসনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আইনি ও রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ঋণখেলাপির দায়ে আদালতের এই চূড়ান্ত রায়ের ফলে তিনি বেসরকারিভাবে বিজয়ী হলেও সংসদ সদস্য হিসেবে তার শপথ নেওয়ার পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
আসনটির ভবিষ্যৎ কী: নতুন নির্বাচন নাকি দ্বিতীয় স্থানাধিকারী বিজয়ী?
আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিলের পর চট্টগ্রাম-৪ আসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুটি প্রধান আইনি দিক নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে দেশের প্রধান আইন কর্মকর্তা তথা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের স্পষ্ট বক্তব্য অনুযায়ী, এই আসনে নতুন করে নির্বাচন (উপনির্বাচন) অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।
আইনি ও সাংবিধানিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যেহেতু আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিনেই তিনি ঋণখেলাপি ছিলেন এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সেই মনোনয়ন বা প্রার্থিতাই চূড়ান্তভাবে বাতিল করে দিয়েছেন, তাই ওই আসনে তার প্রাপ্ত ভোটগুলো আইনিভাবে গণ্য হচ্ছে না। তবে এর মানে এই নয় যে দ্বিতীয় স্থানে থাকা জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকীকে সরাসরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ এবং বাংলাদেশের নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, কোনো আসনে বিজয়ী প্রার্থীর প্রার্থিতা যদি শুরু থেকেই অবৈধ বা অযোগ্য ঘোষিত হয়, তবে সাধারণত নির্বাচন কমিশন ওই আসনটিকে ‘শূন্য’ ঘোষণা করে নতুন তফসিল জারি করে উপনির্বাচনের আয়োজন করে। ভোটারদের ভোটাধিকার পুনঃপ্রয়োগের সুযোগ দেওয়াটাই এখানে গণতান্ত্রিক ও আইনি রেওয়াজ।
ভোলা-৩ আসনের অনুরুপ ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত (২০০৮-২০১০)
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় একই ধরনের একটি জটিলতা তৈরি হয়েছিল ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমুদ্দিন) আসনে। চট্টগ্রাম-৪ আসনের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তা অত্যন্ত সাদৃশ্যপূর্ণ।
সে সময় ওই আসনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের মেজর (অব.) মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বিজয়ী হয়েছিলেন। নির্বাচনের পর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ আদালতে একটি নির্বাচনী পিটিশন দায়ের করেন। আইনি আপত্তিতে বলা হয়, মেজর (অব.) জসিম উদ্দিনকে ২০০৪ সালের ৩১ আগস্ট সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ও নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, সরকারি চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়ার পর ৫ বছর পার না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্য হন না।
উচ্চ আদালত এবং পরবর্তীতে ২০০৯ সালের অক্টোবরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ জসিম উদ্দিনের প্রার্থিতাকে শুরু থেকেই ‘অবৈধ ও অযোগ্য’ হিসেবে রায় দেন। ফলে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারান এবং ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন কমিশন আসনটি শূন্য ঘোষণা করে। আদালত বিজয়ী প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করলেও দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিএনপির মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে সরাসরি বিজয়ী ঘোষণা করা হয়নি। আইন অনুযায়ী আসনটি শূন্য করে ২০১০ সালের এপ্রিলে সেখানে উপনির্বাচন দেওয়া হয় (যেখানে আওয়ামী লীগের নতুন প্রার্থী নূরুন্নবী চৌধুরী শাওন বিজয়ী হন)।
ভোলার এই প্রকৃত দৃষ্টান্তটি প্রমাণ করে যে, নির্বাচনের সময় বা মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রার্থীর যদি মৌলিক কোনো অযোগ্যতা থাকে (যেমন সামরিক বাহিনীর অবসরের সময়সীমা কিংবা আসলাম চৌধুরীর ক্ষেত্রে বর্তমানের ঋণখেলাপির দায়), এবং পরবর্তীতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত যদি সেই প্রার্থিতাই পুরোপুরি বাতিল বা অবৈধ ঘোষণা করেন—তবে দ্বিতীয় স্থানাধিকারীকে সরাসরি জয়ী করার আইনি সুযোগ থাকে না। যেহেতু মূল প্রার্থীর প্রার্থিতাই গোড়াতে অবৈধ ছিল, তাই ওই আসনে নতুন করে উপনির্বাচন হওয়াই বাংলাদেশের নির্বাচনী আইনের প্রধান রেওয়াজ ও সাংবিধানিক সমাধান।
মনোনয়ন নাট্য ও জনআস্থার অবমাননা
আসলাম চৌধুরীর মনোনয়ন পাওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল চরম নাটকীয়তায় ভরা। ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে বিএনপি শুরুতে তাকে মনোনয়ন দেয়নি, দেয়া হয়েছিল আর এক প্রভাবশালী নেতাকে। কিন্তু পরবর্তীতে আসলাম চৌধুরীর সমর্থক ও কর্মীদের রাস্তা বন্ধ, তীব্র বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক চাপের মুখে দল আগের সিদ্ধান্ত বাতিল করে এবং আসলাম চৌধুরীকে মনোনয়ন দিতে বাধ্য হয়। একদম শেষ মুহূর্তে আদালতের আদেশে শর্ত সাপেক্ষ বৈধতা নিয়ে তিনি নির্বাচনে অংশ নেন এবং সীতাকুণ্ডের মানুষ তার প্রতি গভীর আস্থা রেখে বিপুল ভোটে তাকে জয়ী করে।
কিন্তু আইনি ও আর্থিক দায়বদ্ধতার ব্যাপারে চরম অসতর্কতা এবং ঋণখেলাপির দায় থেকে মুক্ত হতে না পারায় তিনি জনগণের সেই বিপুল রায়ের সম্মান ধরে রাখতে ব্যর্থ হলেন। জয়ী হয়েও শপথ নিতে না পারার এই ঘটনাটি সীতাকুণ্ডের ভোটারদের জন্য যেমন হতাশার, তেমনি এটি তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্যও একটি বড় নৈতিক পরাজয়।
আদালতের রায়ের বিপক্ষে সড়ক অবরোধ ও জনদুর্ভোগের সমালোচনা
আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ের পর মঙ্গলবার সীতাকুণ্ডের ছোট দারোগারহাট এলাকায় আসলাম চৌধুরীর সমর্থক নামধারী একদল লোক ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গাছ ফেলে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে এভাবে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা এবং দেশের প্রধান লাইফলাইন খ্যাত মহাসড়কে তীব্র যানচলাচল বিঘ্নিত করার এই অপচেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
উচ্চ আদালতের রায়কে আইনিভাবে মোকাবিলা না করে যারা লাঠিসোটা ও সড়ক অবরোধের মাধ্যমে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে, তারা মূলত আসলাম চৌধুরীর ভাবমূর্তিকে আরও ক্ষুণ্ন করেছে। রাজনৈতিক স্বার্থে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের অধিকার হরণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর এই সংস্কৃতি সীতাকুণ্ডের সচেতন মহলে তীব্রভাবে সমালোচিত হচ্ছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আদালতের রায়কে অবজ্ঞা করে এই ধরনের নৈরাজ্যকর কর্মকাণ্ড কোনো রাজনৈতিক নেতার প্রতি সত্যিকারের ‘জনসমর্থন’ প্রমাণ করে না, বরং তা আইন অমান্যেরই শামিল।









