Home অন্যান্য প্রথম পাতায় রূপকথা, শেষ পাতায় ভরাডুবি

প্রথম পাতায় রূপকথা, শেষ পাতায় ভরাডুবি

সংবাদপত্রের ইতিহাসে অনন্য কেলেঙ্কারি

কামরুল ইসলাম

জাতীয় নির্বাচনের দামামা তখন সারা দেশজুড়ে। চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান কার্যালয়—সবখানেই চলছিল ভোট নিয়ে চুলচেরা সমীকরণ আর হিসাব-নিকাশের তীব্র উন্মাদনা। কার ভাগ্যে দলীয় প্রতীক জুটছে, কার পায়ের তলার মাটি নীরবে সরে যাচ্ছে, আর সাধারণ ভোটাররা ব্যালট বাক্সে কোন নীরব বিপ্লবের ছক কষছেন, তা জানতে মাঠপর্যায়ের বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার কোনো বিকল্প ছিল না।
চট্টগ্রামের অলিগলি, পাহাড় ও উপকূলীয় সমতলের নির্বাচনী আসনগুলো চষে বেড়িয়ে ধারাবাহিকভাবে সরেজমিন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করছিলাম। কোনো রাখঢাক বা কৃত্রিম রঙ চড়ানো নয়; তৃণমূল মানুষের ভেতরকার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, অতীতের ভোট পরিসংখ্যান আর প্রার্থীদের আসল জনসমর্থনের নির্মম সত্যগুলো নির্মোহভাবে উঠে আসছিল কলমের ডগায়। পাঠকমহলে রিপোর্টগুলো প্রকাশের সাথে সাথে তুমুল আলোড়ন তুলছিল, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সহকর্মীদের অকুণ্ঠ প্রশংসাও মিলছিল প্রতিদিন। কিন্তু তাল কাটল অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি নির্বাচনী আসনের সরেজমিন প্রতিবেদন বার্তা বিভাগে জমা দেওয়ার পর।
মাঠের বাস্তব সমীকরণ ও অকাট্য তথ্য তুলে ধরে তৈরি করা সেই বিস্তারিত প্রতিবেদনটি বার্তা প্রধানের টেবিলে জমা দেওয়ার পর থেকেই শুরু হলো এক অদ্ভুত লুকোচুরি। রিপোর্টটির ওপর চোখ বুলানোর পরই বার্তা প্রধানের মুখের রঙ নিমেষেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। এরপর শুরু হলো একের পর এক খোঁড়া অজুহাতের নাটক। “আজ কাগজের স্পেসের বড় টানাটানি”, “কালকে একটু ভালো ট্রিটমেন্ট দিয়ে প্রথম পাতায় তুলব”, “কয়েকটা তথ্যের আরেকটু ভারসাম্য দরকার”—এমন সব চাতুর্যপূর্ণ অছিলায় ফাইলটি চালান হয়ে গেল তাঁর টেবিলের ড্রয়ারের গভীর অন্ধকারে।
একজন মাঠের সাংবাদিক দিনের পর দিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে যে ঘাম ঝরানো সত্য তুলে আনেন, তা স্রেফ সম্পাদনার টেবিলের এক কলমের খোঁচায় বন্দি হয়ে রইল। এভাবে দিন গড়িয়ে প্রায় দশ দিন পার হয়ে গেল। আমি বারবার তাগাদা দিলেও তিনি কেবলই নানা কৌশলে কালক্ষেপণ করে যাচ্ছিলেন। তাঁর আসল উদ্দেশ্য তখনো আমার বোধগম্য ছিল না, তবে তীব্রভাবে আঁচ করতে পারছিলাম যে নেপথ্যে কোথাও একটা বড় ধরনের স্বার্থের খেলা চলছে।
অবশেষে দীর্ঘ দশ দিন পর সেই চরম অপেক্ষার অবসান ঘটল। তবে সেদিন সকালে যা ঘটল, তা কেবল সাংবাদিকতার নীতিতেই নয়, যেকোনো সুস্থ গণমাধ্যমের পেশাদারিত্বের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার মতো এক নজিরবিহীন কলঙ্ক।
সকালে ঘুম থেকে উঠে পত্রিকার প্রথম পাতায় চোখ পড়তেই মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল। সেই আলোচিত আসনটি নিয়ে একটি জমকালো, ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তৈরি প্রতিবেদন বিশাল শিরোনামে প্রথম পাতায় সগৌরবে শোভা পাচ্ছে। বাইলাইনে ঝুলছে বার্তা বিভাগেরই এক চাটুকার সহকর্মীর নাম। বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে যখন পত্রিকার পাতা উল্টাতে উল্টাতে শেষ পৃষ্ঠায় গেলাম, তখন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সেখানে আমার সেই মূল সরেজমিন প্রতিবেদনটি ছাপা হয়েছে।
একই দিনে, একই সংবাদপত্রে, একই নির্বাচনী আসনের ওপর দুই পাতায় দুটি সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদন প্রকাশের এমন মহাতাণ্ডব বাংলা সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে দ্বিতীয়টি আর ঘটেছে কি না সন্দেহ। আসল চরম তামাশাটি ছিল দুই রিপোর্টের বক্তব্য ও মূল দর্শনের মধ্যে। প্রথম পাতার কৃত্রিম প্রতিবেদনে যে প্রার্থীকে দেখানো হয়েছে গণমানুষের নয়নের মণি, আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার অধিকারী এবং আসন্ন বিজয়ের নিশ্চিত কাণ্ডারি; ঠিক শেষ পাতায় আমার সরেজমিন রিপোর্টে মাঠের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ও গাণিতিক তথ্যের ভিত্তিতে তাকেই চিহ্নিত করা হয়েছে তৃণমূল থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন, কর্মীহীন এবং নিশ্চিত ভরাডুবির মুখে থাকা এক দেউলিয়া চরিত্র হিসেবে। অর্থাৎ, একই পত্রিকার এক পাতা যা বলছে, অপর পাতা তার ঠিক ১৮০ ডিগ্রি উল্টো সুর গাইছে। পাঠকেরা সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে হয়তো ভাবছিলেন, তাঁরা কি ভুল চশমা পরেছেন, নাকি নামীদামি এই দৈনিকটির পুরো সম্পাদকীয় বিভাগ একযোগে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে।
এই নোংরা সার্কাসের পেছনে বার্তা প্রধানের যে নীতিহীন, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং চরম স্বার্থান্বেষী ভূমিকা ছিল, তার জন্য কোনো নিন্দাই যথেষ্ট নয়। একজন বার্তা প্রধান হলেন সংবাদপত্রের মেরুদণ্ড, সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতার সবচেয়ে বড় অতন্দ্র প্রহরী। অথচ তিনি সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি, পেশাগত সততা ও নৈতিকতাকে নিজের ব্যক্তিস্বার্থ আর টেবিলের তলার অনৈতিক আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে নির্দ্বিধায় বিক্রি করে দিয়েছিলেন। মাঠের সত্যকে গলা টিপে হত্যা করে নিজের পছন্দের সুবিধাভোগী পক্ষকে খুশি করতে তিনি অন্য আরেকজন অনুগত রিপোর্টারকে দিয়ে মনগড়া রূপকথা প্রথম পাতায় তুলে দিলেন। আবার একই সঙ্গে নিজের ভেতরের ভয় ঢাকতে কিংবা কোনো এক অদৃশ্য আতঙ্কের বশবর্তী হয়ে আমার মূল রিপোর্টটিও রাতের আঁধারে শেষ পাতায় ঠেলে দিলেন। একটি বহুল প্রচারিত দৈনিককে এমন প্রকাশ্য প্রহসনের মঞ্চ বানিয়ে গণমাধ্যমের মুখে চুনকালি লেপে দেওয়ার এমন কাণ্ড কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের সাংবাদিকতার সংজ্ঞায় পড়ে না। এর চেয়ে চরম ধিক্কারজনক ও নীতিভ্রষ্ট দৃষ্টান্ত সংবাদপত্রের ইতিহাসে সত্যিই বিরল।
সংবাদমাধ্যমের ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অতীত অনুসন্ধান করে দেখলে বোঝা যায়, একই দিনে একই পত্রিকায় একই বিষয়ে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ও স্ববিরোধী প্রতিবেদন প্রকাশের ঘটনা অত্যন্ত বিরল এবং মূলধারার সাংবাদিকতায় এটি প্রায় এক অসম্ভব বিচ্যুতি।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কখনো কখনো একই দিনে দুই সংস্করণে ভিন্ন খবর আসার নজির রয়েছে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা দৈনিক ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এ ২০১৬ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সফর নিয়ে প্রথম সংস্করণে এক শিরোনাম এবং পরবর্তী রাতের সংস্করণে ভিন্ন সুরের শিরোনাম ছাপা হয়েছিল। তবে সেটি ছিল ঘটনাপ্রবাহের দ্রুত পরিবর্তনের কারণে সময়ের ব্যবধানে তৈরি দুটি পৃথক সংস্করণ, একই কাগজের দুই পাতায় একযোগে নয়।
এছাড়া একই পত্রিকার উপ-সম্পাদকীয় পাতায় ভারসাম্য রক্ষার জন্য দুটি বিপরীত মতামতের নিবন্ধ পাশাপাশি প্রকাশের সাধারণ রেওয়াজ থাকলেও মূল সংবাদ প্রতিবেদনে এমন নগ্ন স্ববিরোধিতা কোনো পেশাদার নীতিমালার মধ্যেই পড়ে না।
বাংলাদেশ কিংবা উপমহাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে সমন্বয়হীনতা বা অসাবধানতাবশত কখনো কখনো একই সংবাদ ভেতরের পাতায় সংক্ষেপে এবং প্রথম পাতায় কিছুটা বদলে ছাপা হওয়ার মতো কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। তবে বিশেষ কোনো নির্বাচনী আসনকে ঘিরে বার্তা বিভাগের কারও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির কারণে প্রথম পাতায় এক মনগড়া বয়ান আর শেষ পাতায় মাঠের আসল চিত্র নিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুটি সমান্তরাল পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশের ঘটনা একেবারেই নজিরবিহীন। পেশাদার গণমাধ্যমে এমন ঘটনাকে মারাত্মক নীতিভঙ্গ ও সম্পাদনা ব্যবস্থার চরম দেউলিয়াত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়, যা কোনো স্বাভাবিক নিউজরুমে ঘটার কথা নয়। তাই এই বাস্তব অভিজ্ঞতাটি সংবাদপত্রের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও চরম নীতিহীনতার জীবন্ত দলিল হয়েই থাকবে।
তবে সাজানো মিথ্যা নাটক দিয়ে সাময়িক বিভ্রান্তি হয়তো ছড়ানো যায়, কিন্তু রূঢ় বাস্তবতাকে কখনোই চিরতরে চেপে রাখা যায় না। সত্যের নিজস্ব এক অপ্রতিরোধ্য ও ভয়ংকর শক্তি থাকে। নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শেষে যখন ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হলো, তখন যেন প্রকৃতির এক চপেটাঘাত পড়ল সেই দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রের গালে। দেখা গেল, ড্রয়ারে দশ দিন আটকে রাখা আমার সেই সরেজমিন প্রতিবেদনের পূর্বাভাসের সঙ্গে ভোটের ফলাফল অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে। প্রথম পাতার বানোয়াট ফানুস কর্পূরের মতো বাতাসে উবে গিয়ে শেষ পাতার মাঠের সত্যটাই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। সেই নীতিহীন বার্তা প্রধান পত্রিকার দুই পাতায় সার্কাস বানিয়ে নিজের কপালে কলঙ্কের তিলক এঁকে নিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু মাঠের নির্ভেজাল সত্যের কাছে শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই সাজানো নাটকের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটেছিল।