Home Second Lead ভারত মহাসাগরীয় করিডোরের দখল ও প্রবৃদ্ধির নতুন রেকর্ড

ভারত মহাসাগরীয় করিডোরের দখল ও প্রবৃদ্ধির নতুন রেকর্ড

জহরলাল নেহেরু বন্দর
ডিপি ওয়ার্ল্ডের বন্দর জাদু: পর্ব-৩
কামরুল হাসান
দুবাই: ভারত মহাসাগরের কৌশলগত বাণিজ্যিক রুট ও ক্রমবর্ধমান ভারতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রে ডিপি ওয়ার্ল্ড গড়ে তুলেছে এক সুবিশাল ও অত্যন্ত কার্যকর টার্মিনাল নেটওয়ার্ক। মুম্বাইয়ের জওহরলাল নেহরু পোর্ট (জেএনপিটি/নাভা শেভা), গুজরাটের মুন্দ্রা, তামিলনাড়ুর চেন্নাই এবং কেরালার কোচিনের ভাল্লারপাদাম আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্ট টার্মিনালসহ ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম উভয় উপকূলজুড়ে বিস্তৃত এই উপস্থিতি। কেবল একক কোনো জেটি পরিচালনা নয়, বরং সামগ্রিক সমুদ্রবাণিজ্যের অবকাঠামোকে ডিজিটালাইজড ও মাল্টিমোডাল নেটওয়ার্কে রূপান্তর করে ভারতীয় লজিস্টিকস খাতের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সম্প্রতি ফ্রান্সভিত্তিক শিপিং গবেষণা ও ডেটা প্ল্যাটফর্ম আলফালাইনারের  বৈশ্বিক শীর্ষ ৩০ কন্টেইনার বন্দরের তালিকায় বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বন্দর হিসেবে শীর্ষে উঠে এসেছে জওহরলাল নেহরু পোর্ট। চলতি ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি থেকে জুন) বন্দরটি হ্যান্ডল করেছে ৪৪ লাখ টিইইউস কন্টেইনার, যা গত বছরের একই সময়ের (৩৮ লাখ ৭০ হাজার টিইইউস) তুলনায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি।
ভারতের শক্তিশালী আমদানি-রপ্তানি চাহিদা, বর্ধিত টার্মিনাল সক্ষমতা এবং ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে মধ্যপ্রাচ্যগামী কিছু কার্গো ভারতীয় বন্দরে ডাইভার্ট হওয়ার ফলে বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে সাত ধাপ এগিয়ে বন্দরটি এখন ২১তম স্থানে উঠে এসেছে। এর ফলে বৈশ্বিক ২০তম স্থানে থাকা শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরের সাথে এর ব্যবধান কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪১ হাজার টিইইউসে।
এই তালিকায় ভারতের একমাত্র অন্য বন্দর হিসেবে ২৬তম স্থানে জায়গা পেয়েছে গুজরাটের মুন্দ্রা বন্দর, যেখানেও রয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ডের শক্তিশালী টার্মিনাল উপস্থিতি।
ভারতের এই রেকর্ডের পেছনে ঐতিহাসিক ভিত গড়ে দিয়েছিল জওহরলাল নেহরু পোর্টে ডিপি ওয়ার্ল্ড পরিচালিত ‘নাভা শেভা ইন্টারন্যাশনাল কন্টেইনার টার্মিনাল’। এটি ছিল ভারতের প্রথম বেসরকারি পিপিপি (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব) ভিত্তিক টার্মিনাল, যা ১৯৯৭ সালের জুলাইয়ে বিওটি (বিল্ড-অপারেট-ট্রান্সফার) ভিত্তিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং ১৯৯৯ সালের এপ্রিলে এর পূর্ণ বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়। ৬০০ মিটার দীর্ঘ জেটি, ১৫ মিটার ড্রাফট, বার্ষিক ১২ লাখ টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা এবং ৮টি সুউচ্চ কি-ক্রেন ও ২৮টি রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেনে সজ্জিত এই টার্মিনালটি ভারতীয় বন্দর পরিচালনায় আধুনিকতার নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছিল।
দীর্ঘ ৩০ বছরের এই ঐতিহাসিক চুক্তির মেয়াদ ২০২৭ সালের ২ জুলাই শেষ হতে চলায় ডিপি ওয়ার্ল্ড আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি নবায়নের জন্য মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছে এবং বর্তমানে কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা চলমান রয়েছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের ভারতীয় উপমহাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার হেমন্ত কুমার রুইয়া সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন যে এই টার্মিনালে আরও সময় পরিচালনার জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ভারতের বন্দরগুলোতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা গেছে টার্মিনাল পরিচালন গতি ও কন্টেইনার হ্যান্ডলিং দক্ষতায়। কি-সাইডে প্রতি ক্রেনে ঘণ্টায় গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি কন্টেইনার মুভমেন্ট নিশ্চিত করার পাশাপাশি ট্রাক টার্নঅ্যারাউন্ড সময় কয়েক ঘণ্টা থেকে নামিয়ে আনা হয়েছে মাত্র আধঘণ্টার মধ্যে।
অপরদিকে কেরালার কোচিনে ভারতের প্রথম নিবেদিত ট্রান্সশিপমেন্ট টার্মিনাল ভাল্লারপাদাম পরিচালনা ডিপি ওয়ার্ল্ডের আরেকটি কৌশলগত সাফল্য। কলম্বো বা সিঙ্গাপুরের মতো আঞ্চলিক বন্দরগুলোর ওপর ভারতীয় ব্যবসায়ীদের নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উপকূল থেকেই সরাসরি মাদার ভেসেল পরিচালনার সুযোগ তৈরি করেছে এই টার্মিনাল।
এই সুসংগঠিত বন্দর নেটওয়ার্কের বাস্তব সুফল তুলে ধরে মুম্বাইয়ের প্রবীণ লজিস্টিকস ব্যবসায়ী রাজেশ শুক্লা জানান, আগে বন্দর থেকে কন্টেইনার খালাস করে কারখানায় নিতে দীর্ঘসূত্রতা ও যানজটের মুখে পড়তে হতো। ডিপি ওয়ার্ল্ড কেবল জেটির ভেতরে কাজ সীমাবদ্ধ রাখেনি; তারা বন্দর টার্মিনালগুলোর সাথে ডেডিকেটেড ফ্রেইট করিডোর (ডিএফসি) এবং অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার ডিপো (আইসিডি) সরাসরি রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংযুক্ত করেছে। ফলে পেপারলেস কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিংয়ের কারণে পণ্য পরিবহন এখন অনেক বেশি দ্রুত, অনুমানযোগ্য এবং সাশ্রয়ী হয়েছে।
ভারতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের এই বহুস্তরীয় সমন্বয় ও আধুনিকায়ন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে সমুদ্র উপকূলের টার্মিনালকে দেশের ভেতরের রেল ও সড়ক নেটওয়ার্কের সাথে প্রযুক্তিনির্ভরভাবে একীভূত করা গেলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অবিশ্বাস্য প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব।
ভিজিট করুন www.businesstoday24.com