Home অন্যান্য তালগাছের ভূত ও নিবারণ চোর

তালগাছের ভূত ও নিবারণ চোর

স্মৃতি সরকার
গ্রামের নাম শান্তিপুর হলেও, অমাবস্যার রাতে গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তের বিলের ধারটা একেবারেই শান্ত থাকে না। সেখানেই আকাশছোঁয়া গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন তালগাছ। গ্রামবাসীরা বলে, ওটা শুধু গাছ নয়, ওটা ‘লম্বাপায়ো ভূতের’ আস্তানা। ওই গাছের ডালপালার ফাঁকে নাকি এমন এক অশরীরী থাকে, যার পা দুটো অদ্ভুতভাবে লম্বা হয়ে মাটির কাছাকাছি নেমে আসে। আর তার চোখ? অন্ধকারের মধ্যেও নাকি জ্বলজ্বল করে!
সব বয়সের মানুষের জন্য শান্তিপুরের এই তালগাছ ও নিবারণ চোরের একটি রহস্যজনক গল্প নিচে দেওয়া হলো:
তালের গর্ভে যখের ধন
শান্তিপুরে ছোট-বড় সবার মুখে মুখে ফেরে দক্ষিণ বিলের লম্বা তালগাছটার গল্প। কেউ বলে অমাবস্যার রাতে ওখান থেকে অদ্ভুত কাঁদন-হাসির আওয়াজ আসে, কেউ বলে গাছের মাথায় আগুনের গোলা দেখা যায়। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো সেই লম্বা পা দুটো। দিনের বেলাও ওই গাছের তলা দিয়ে কেউ হাঁটে না।
এই গ্রামে নিবারণ নামে একজন ছিল, যে নিজেকে ‘চোর’ নয়, ‘রাতের শিল্প সংগ্রাহক’ বলতে পছন্দ করত। সে যেমন সাহসী, তেমনি চতুর। গ্রামের লোকের সব ভয়কে সে ‘গাঁজাখোরি গল্প’ বলে উড়িয়ে দিত। তার নজর ছিল ওই তালগাছের মাথায় ঝুলতে থাকা বিশাল বিশাল পাকা তালগুলোর ওপর। লোকে বলে ওই তালগুলো নাকি ‘ভূতের তাল’, ছুঁলেই বিপদ। কিন্তু নিবারণের বিশ্বাস, ভূতেদের সম্পত্তি চুরি করার মধ্যে একটা আলাদা রোমাঞ্চ আছে।
এক অমাবস্যার রাতে নিবারণ তার ‘শিল্প সংগ্রহের’ সরঞ্জাম—একটি ধারালো দা, একটা দড়ি আর তার বিশ্বস্ত টর্চলাইট নিয়ে বিলের ধারের দিকে রওনা হলো। কুয়াশায় ঢাকা বিলের ধার, ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক আর মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসা শিয়ালের ডাক মিলে একটা থমথমে পরিবেশ তৈরি করেছিল। তালগাছটার কাছে পৌঁছাতে নিবারণেরও বুকটা একটু ধক করে উঠল। গাছটা যেন অন্ধকারের মধ্যেও আরও কালো আর বিশাল দেখাচ্ছে।
সে তার টর্চের আলো ওপরের দিকে ফেলল। ডালপালার ফাঁকে তালগুলো ঝুলছে। নিবারণ দা-টা কোমরবন্ধে গুঁজে, দড়িটা কাঁধে ঝুলিয়ে হনহন করে গাছে উঠতে শুরু করল। সে পাকা তাল কুড়োবে।
গাছের মাঝামাঝি পৌঁছাতেই হঠাৎ বাতাস বন্ধ হয়ে গেল। চারপাশটা কেমন নিঝুম। নিবারণ একটা ডালে পা রেখে দা বের করল। ঠিক তখনই মাথার ওপরে খড়খড় করে একটা শব্দ হলো। মনে হলো কেউ যেন ওপরের পাতাগুলো নাড়াচ্ছে। নিবারণ ওপরের দিকে টর্চ জ্বালল, কিন্তু কিছু দেখতে পেল না।
“মনের ভুল,” নিজেকে বুঝিয়ে সে একটা তাল কাটার জন্য দা বাড়াল। দা-টা তালে লাগার আগেই, একটা হাড়হিম করা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “নিবারণ… আমার তালের গায়ে হাত দিস না!”
নিবারণ চমকে উঠল। কণ্ঠস্বরটা যেন আকাশ থেকে আসছে, আবার মনে হচ্ছে তার খুব কাছ থেকেই। সে ভলকে টর্চের আলো ঘোরাল। যা দেখল, তাতে তার হাতের দা-টা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল।
উপরের ঘন পাতার আড়াল থেকে দুটো কুচকুচে কালো, অস্বাভাবিক লম্বা আর সরু পা ঝুলছে! পা দুটো বাতাসের দোল খাওয়ার মতো দুলছে আর ধীরে ধীরে নিবারণের দিকে নেমে আসছে। তাদের শেষ প্রান্ত দেখা যাচ্ছে না, মনে হচ্ছে পা দুটো অসীম লম্বা। টর্চের আলো ওই কালচে চামড়ার পায়ে পড়ে ঠিক ছবিটার মতোই এক বিভীষিকাময় দৃশ্য তৈরি করল।
ভয়ে নিবারণের গলার আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল। সে গাছে কাঠ হয়ে জমে রইল। লম্বা পা দুটো তার বুকের কাছে এসে থেমে গেল। ওপর থেকে আবার সেই ঘড়ঘড় আওয়াজ, “নিবারণ, তুই সাহস দেখিয়েছিস। তাই তোকে মারব না। কিন্তু আমার তাল নিতে হলে তোকে একটা রহস্যভেদ করতে হবে।”
নিবারণ ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ল।
ভূতের পা দুটো একটু ওপরে উঠে গেল। একটা ডাল থেকে একটা বিশাল, কুচকুচে কালো পাকা তাল নিবারণের হাতে এসে পড়ল। ভূতটা বলল, “এই তালের ভেতর আছে যখের ধন—এক প্রাচীন মোহরের থলি। এটা আমাদের অভিশপ্ত সম্পত্তি। তুই যদি সকাল হওয়ার আগে এই তালটাকে এক ফোঁটা রক্ত না ঝরিয়ে, কোনো দা-ছুরি না ব্যবহার করে আস্ত ভাঙতে পারিস, তবে মোহরগুলো তোর। কিন্তু যদি ব্যর্থ হোস, তবে তোর পা দুটোও আমি এই তালগাছের মতো লম্বা করে দেব, আর তুই চিরকাল এই গাছের প্রহরী হয়ে থাকবি!”
কথা শেষ হতেই লম্বা পা দুটো পাতার ফাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল। চারপাশের বাতাস আবার স্বাভাবিক হলো। নিবারণ হাতে সেই অদ্ভুত কালো তালটা নিয়ে বুঝতে পারল না সে হাসবে না কাঁদবে। دا, ছুরি ব্যবহার করা চলবে না, অথচ যখের ধন তালের ভেতর!
নিবারণ তালটা নিয়ে গাছ থেকে নেমে এল। বিলের ধারে বসে সে ভাবতে লাগল। ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই। তালটার গা এতটাই শক্ত যে পাথর দিয়ে মারলেও ভাঙবে না, ওপরের চামড়া ছাড়ানোই অসম্ভব। যদি সে ভুল করে বসার, তবে তার জীবন শেষ।
ভাবতে ভাবতে নিবারণের নজরে পড়ল বিলের জলে ফুটে থাকা শাপলা ফুল। সে জানত, কালো তাল চামড়া সহ রোদে শুকালে আরও শক্ত হয়, কিন্তু জলে ভিজলে সেটা নরম হয়ে ওঠে। সময় কম। সে ঝুঁকি নিল।
নিবারণ তালটাকে বিলের কাদামাখানো জলের মধ্যে ডুবিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর তালটা তুলে সে দেখতে পেল ওপরের চামড়াটা কিছুটা আলগা হয়েছে। দা-ছুরি ব্যবহার করা নিষেধ, তাই সে তার নখ দিয়ে আর হাত দিয়ে সাবধানে চামড়াটা ছাড়াতে শুরু করল। চামড়াটা ছাড়াতেই ভেতরের আঁশগুলো দেখা গেল, সেগুলোও নরম হয়ে এসেছে। নিবারণ আঁশগুলো হাত দিয়ে টেনে টেনে আলাদা করল। সে দা-ছুরি ব্যবহার করেনি, এক ফোঁটা রক্তও ঝরেনি।
আঁশগুলোর মাঝখানে একটা শক্ত আঁটি দেখা গেল। নিবারণ আঁটিটা হাতে নিয়ে বিলের ধারের একটা বড় পাথরে হালকা করে ঠুকল। দা-ছুরি নয়, সে শুধু ‘ঠুকছে’। আঁটিটা দু’ফাঁক হয়ে গেল। আর তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা পুরনো, জীর্ণ কাপড়ের থলি!
নিবারণ থলিটা খুলে দেখল—ভেতরে জ্বলজ্বল করছে প্রাচীন সোনার মোহর! সে বিশ্বাস করতে পারছিল না তার ভাগ্য। সে তালগাছটার দিকে তাকাল। মনে হলো ওপরের পাতাগুলো তাকে দেখে মৃদু হাসছে।
সকাল হওয়ার আগেই নিবারণ সোনার মোহর নিয়ে গ্রামে ফিরল। তবে সে ওই সোনার একটা মোহরও নিজের জন্য রাখল না। মোহরগুলো বিক্রি করে সে গ্রামের ভাঙা পাঠশালাটা ঠিক করে দিল, বিলের ধারে একটা বড় পাকা ঘাট তৈরি করল। গ্রামের লোকে অবাক হয়ে দেখল—সেই ছিঁচকে নিবারণ চোর হঠাৎ এক সৎ আর দানবীর মানুষ হয়ে গেছে।
আর লম্বা তালগাছটা? গ্রামবাসীরা বলে, লম্বা পা দুটো এখনও অমাবস্যার রাতে দেখা যায়, কিন্তু এখন আর ভয়ের আওয়াজ আসে না। নিবারণের সাহসের গল্প শুনে ভূতটাও যেন খুশি হয়েছে। গ্রামের ছোটরা এখন রাতে ওই তালগাছের দিকে তাকিয়ে আর ভয় পায় না, বরং নিবারণ দাদুর যখের ধন খোঁজার রহস্যময় গল্পের রোমাঞ্চ অনুভব করে। শান্তিপুরের তালগাছ এখনও দাঁড়িয়ে আছে, রহস্য আর সাহসের এক নীরব সাক্ষী হয়ে।