সিরিজ প্রতিবেদন
পকেটে সিঁধ: ভোক্তার প্রতিদিনের লড়াই
কামরুল হাসান
মাছ ভাতের বাঙালির পাতে এক টুকরো ভালো মাছ না হলে যেন তৃপ্তি আসে না। কিন্তু সেই শখের মাছ কিনতে গিয়ে আপনি কি ভাবছেন আপনি সঠিক ওজনে এবং ফ্রেশ মাছটিই ঘরে নিচ্ছেন? উত্তরটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘না’। মাছের বাজারে পা রাখলেই শুরু হয় এক অদৃশ্য প্রতারণার জাল। যেখানে ক্রেতা কেবল ওজনেই ঠকছেন না, বরং নিজের অজান্তেই ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন স্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল।
বিজনেসটুডে২৪-এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে মাছের বাজারের সেইসব কৌশলী কারসাজি, যা সাধারণ ক্রেতার চোখে ধুলো দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
১. ওজনে ‘বরফ’ ও ‘পানি’র খেল: মাছ তাজা রাখতে বরফ দেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতারণা হয় যখন মাছের পেটে বা গাল দিয়ে জোর করে বরফ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া অনেক সময় মাছ ওজন করার আগে দীর্ঘক্ষণ পানিতে চুবিয়ে রাখা হয়। মাছের আঁশ ও শরীর পানি শুষে নিলে ওজনে তা অন্তত ৫০ থেকে ১০০ গ্রাম পর্যন্ত বেড়ে যায়। আপনি যখন মাছের দাম দিচ্ছেন, তখন আসলে সেই পানির দামও দিচ্ছেন।
২. ফরমালিন ও রঙ: মৃত মাছকে দীর্ঘক্ষণ ‘তাজা’ দেখাতে এবং গাল রক্তবর্ণ লাল রাখতে ব্যবহার করা হয় ফরমালিন ও সিন্থেটিক রঙ। অনেক সময় মাছের কানকো বা গাল উল্টে আপনাকে লাল রঙ দেখানো হয়, যা আসলে তাজা মাছের লক্ষণ নয়, বরং কৃত্রিম রঙের কারসাজি। এতে ক্রেতা প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে (যেমন ক্যান্সার) পড়ছেন।
৩. ডিজিটাল স্কেলে ‘আঙুলের চাপ’: মাংসের দোকানের মতো মাছের বাজারেও ডিজিটাল স্কেলের কারচুপি তুঙ্গে। মাছ পাল্লায় তোলার সময় বিক্রেতা খুব সন্তর্পণে তার হাতের একটি আঙুল স্কেলের এক কোণায় চেপে ধরেন। এই সামান্য চাপেই মিটারে ২০০-৩০০ গ্রাম ওজন বেড়ে যায়। ক্রেতা যখন মাছের দিকে তাকিয়ে থাকেন, বিক্রেতা তখন তার হাতের কায়দায় আপনার পকেট কাটছেন।
৪. ‘ভালো’ মাছের বদলে ‘নষ্ট’ মাছ গছিয়ে দেওয়া: আপনি হয়তো একটি বড় তাজা রুই মাছ পছন্দ করলেন। কিন্তু কাটার সময় বা ব্যাগে ভরার সময় বিক্রেতা খুব দ্রুততার সাথে তার নিচে রাখা আগে থেকে কেটে রাখা অন্য কোনো নরম বা বাসি মাছের টুকরো আপনার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিতে পারেন। একে বলা হয় ‘হস্তচালিত চাতুরি’।
মাছ কেনায় ঠকা এড়াতে যা করবেন:
- মাছ টিপে দেখুন: মাছের গায়ের মাংস যদি আঙুলের চাপে দেবে যায় এবং আগের অবস্থায় না ফেরে, তবে বুঝবেন সেটি বাসি। তাজা মাছ সবসময় শক্ত ও স্থিতিস্থাপক হয়।
- চোখ ও কানকো পরীক্ষা: তাজা মাছের চোখ স্বচ্ছ এবং উজ্জ্বল থাকবে। কানকো হবে প্রাকৃতিকভাবে লালচে-পিঙ্ক, খুব বেশি গাঢ় বা কালচে নয়।
- স্কেলে নজর রাখুন: যখন ওজন দেওয়া হচ্ছে, তখন বিক্রেতার হাতের নড়াচড়ার দিকে কড়া নজর রাখুন। স্কেলের ওপর কোনো বাড়তি কাপড় বা প্লাস্টিক আছে কি না তা খেয়াল করুন।
- কাটা মাছের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন: মাছ কাটানোর সময় নিজের চোখের সামনে থেকে সরতে দেবেন না। প্রতিটি টুকরো আপনার পছন্দ করা মাছেরই কি না তা নিশ্চিত হোন।
আইনি প্রতিকার:
মাছে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো বা ওজনে কারচুপি করা নিরাপদ খাদ্য আইন এবং ভোক্তা অধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। কোনো বিক্রেতা এমনটি করলে সাথে সাথে বাজার কমিটিকে জানান অথবা জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ দায়ের করুন।
পরবর্তী পর্ব-ডিমের খাঁচায় কারসাজি: হালি বা ডজনে আপনি কি ‘নষ্ট’ ও ‘ছোট’ ডিম কিনছেন?










