Home First Lead বিকডার ফুয়েল সারচার্জ: অযৌক্তিক মাশুলে সংকটে রপ্তানি বাণিজ্য

বিকডার ফুয়েল সারচার্জ: অযৌক্তিক মাশুলে সংকটে রপ্তানি বাণিজ্য

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাবের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হারে ‘ফুয়েল সারচার্জ’ চাপিয়ে দিয়েছে বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোর সংগঠন বিকডা। বাস্তব পরিচালন ব্যয়ে জ্বালানির অংশ যেখানে সামান্য, সেখানে একতরফাভাবে ৯.৮৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, ভিত্তিহীন ও অতিরিক্ত মুনাফা লুটার অপকৌশল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বন্দর ব্যবহারকারী, তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক ও ফ্রেইট ফরোয়ার্ডাররা।

অংশীজনদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের দোহাই দিয়ে কার্যকর করা এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ মাশুল কোনো স্বচ্ছ ব্যয় বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নয়, বরং ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মোট ব্যয়ে জ্বালানি খরচের অনুপাত ও বাস্তব প্রভাব কত সে বিষয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, একটি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোর মোট পরিচালনা ব্যয়ের শতভাগ জ্বালানি খরচ নয়। একটি ডিপোর সামগ্রিক ব্যয়ের বড় অংশ জুড়ে থাকে জমির উচ্চ ইজারা মূল্য, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, প্রশাসনিক ব্যয়, লাইসেন্স ও নিরাপত্তা ফি, যা মোট ব্যয়ের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ।

লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞদের হিসাবমতে, ডিপোর মোট ব্যয়ের মধ্যে ডিজেল বা সরাসরি জ্বালানির হিস্যা সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। ডিজেলের দাম ১৭.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে সামগ্রিক ব্যয়ের ওপর তার নিট প্রভাব পড়ে আনুমানিক ৩.৫ থেকে ৪.৩ শতাংশের মতো। ফলে সার্বিক পরিচালন ব্যয়ে ৩ থেকে ৪ শতাংশের কিছুটা বেশি চাপ সামাল দিতে সেবার মোট চার্জের ওপর সরাসরি ৯.৮৫ শতাংশ সারচার্জ চাপিয়ে দেওয়া গাণিতিক ও ব্যবসায়িক কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই যুক্তিযুক্ত নয়।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়,  রপ্তানি হ্যান্ডলিং, খালি কনটেইনার পরিবহন বা আমদানি ডেলিভারির ক্ষেত্রে বিকডা যেসব ট্যারিফ নির্ধারণ করে, তার মধ্যে আগে থেকেই জ্বালানির একটি নির্দিষ্ট খরচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিদ্যমান চার্জ থেকে জ্বালানি বাবদ নিট কত টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে তা নিখুঁতভাবে চিহ্নিত না করে, সার্ভিস প্যাকেজের পুরো বিলের ওপর পাইকারি হারে প্রায় ১০ শতাংশ সারচার্জ যোগ করায় ডিপো মালিকদের মুনাফার মার্জিন আরও বেড়ে গেছে। অর্থাৎ ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিকে উপলক্ষ করে ডিপোগুলো মূলত বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করেছে।

কনটেইনারপ্রতি অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের চিত্র

একটি রপ্তানি কনটেইনারের স্টাফিং, ট্রেইলার ভাড়া ও হ্যান্ডলিং মিলিয়ে সার্ভিসভেদে যেখানে আগে খরচ পড়ত ৭ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকার মতো, সেখানে ৯.৮৫ শতাংশ হারে নতুন করে কনটেইনারপ্রতি বাড়তি প্রায় ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত চাপানো হচ্ছে।

একই রুটে একটি ট্রেলারে একাধিক খালি কনটেইনার পরিবহন করা হয় এবং ডিপোর অভ্যন্তরীণ দূরত্ব খুব বেশি না হওয়ায় প্রতি একক কনটেইনারে যে পরিমাণ ডিজেল অতিরিক্ত খরচ হয়, তার বিপরীতে আদায় করা হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি টাকা।

বিকডার অবস্থান ও পরিচালন ব্যয়ের যুক্তি

তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ও অসন্তোষের মুখে সারচার্জ বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ অপরিহার্য বলে দাবি করেছে বেসরকারি ডিপো মালিকদের সংগঠনটি। বিকডার মহাসচিব (সেক্রেটারি জেনারেল) রুহুল আমিন শিকদার জানান, ডিজেলের দাম বাড়ার পর বর্ধিত পরিচালন ব্যয় সমন্বয় করতে এই ৯.৮৫ শতাংশ চার্জ বৃদ্ধি জরুরি ছিল। তিনি বলেন, “ডিপোগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে চার্জ বাড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।”

অংশীজনদের ক্ষোভ ও বক্তব্য

ডিপো কর্তৃপক্ষের এমন যুক্তির কঠোর বিরোধিতা করে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) একজন  সাবেক পরিচালক ও পোশাক শিল্প মালিক মাহবুব চৌধুরী বলেন, এর আগে গত এপ্রিল থেকেও বিকডা তাদের ২১টি ডিপোতে আউটবাউন্ড কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং ট্যারিফ ৮.৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেছিল, যা নিয়ে রপ্তানিকারক ও বাণিজ্য সংগঠনগুলোর মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, লজিস্টিকস ব্যয়ের এই অব্যাহত বৃদ্ধি আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বাংলাদেশের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে আরও সংকুচিত করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক ফ্রেইট রেটের উচ্চমূল্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে সৃষ্ট বহুমুখী সংকটে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এমনিতেই চরম চাপে রয়েছে; এমন নাজুক পরিস্থিতিতে নতুন করে লজিস্টিকস ব্যয়ের বোঝা চাপানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের দোহাই দিয়ে দফায় দফায় আরোপিত এই অতিরিক্ত মাশুল সরাসরি তৈরি পোশাক খাতসহ সামগ্রিক জাতীয় রপ্তানি খাতকে বৈশ্বিক বাজারে গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।