আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
নেপিডো: দেশজুড়ে তীব্র সংঘাত, অস্থিতিশীলতা এবং জনরোষের মধ্যেই তিন দফায় পরিকল্পিত নির্বাচনের প্রথম ধাপ সম্পন্ন করেছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। গত ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে দেশটির সাধারণ মানুষ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ ‘প্রহসন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফল বাতিলের প্রায় পাঁচ বছর পর জান্তা এই নতুন ভোটাভুটির আয়োজন করল।
মিয়ানমারের ইতিহাসে আগে সবসময় ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ (FPTP) পদ্ধতিতে ভোট হলেও, এবার জান্তা সরকার নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে FPTP-এর পাশাপাশি ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ (PR) পদ্ধতি প্রবর্তন করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক বাহিনী সমর্থিত ‘ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’ (USDP)-কে জেতাতেই এই জটিল পদ্ধতি চালু করা হয়েছে।
জান্তা মুখপাত্র মেজর জেনারেল জাও মিন তুন দাবি করেছেন, ১০২টি টাউনশিপে ১ কোটি ১০ লাখ ভোটারের মধ্যে ৬০ লাখেরও বেশি (৫২.১৩%) ভোট দিয়েছেন। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। অধিকাংশ মানুষ জান্তার এই নির্বাচন বয়কট করেছে। ২০২০ সালে যেখানে ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য মানুষের ভিড় ছিল, এবার সেখানে কেউ আগ্রহ দেখায়নি। ৫টি রাজনৈতিক দলের ৪,৮৬৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো উৎসাহ দেখা যায়নি।
গৃহযুদ্ধ ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর (EAOs) নিয়ন্ত্রণের কারণে দেশটির বড় একটি অংশে ভোট গ্রহণ সম্ভব হয়নি।
- জান্তা সরকার নিজেই ৫৬টি টাউনশিপে ভোট স্থগিত করেছিল।
- ১০২টি টাউনশিপের মধ্যে মাত্র ৪৮টিতে পূর্ণাঙ্গ ভোট হয়েছে, বাকি ৫৪টিতে হয়েছে আংশিক ভোট।
- শান রাজ্য, রাখাইন রাজ্য এবং সাগাইং অঞ্চলের বিশাল এলাকা এই নির্বাচনের আওতার বাইরে ছিল।
জান্তার এই নির্বাচনকে সমর্থন জানিয়েছে রাশিয়া, চীন এবং বেলারুশ। আসিয়ান দেশগুলোর মধ্যে কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম এবং লাওস সমর্থন দিয়েছে। ভারত থেকে একটি প্রতিনিধি দল উপস্থিত থাকলেও ভারত সরকার স্পষ্ট করেছে যে তারা কোনো ‘অফিসিয়াল’ প্রতিনিধি পাঠায়নি; উপস্থিত ব্যক্তিরা ব্যক্তিগতভাবে সেখানে গিয়েছিলেন। পর্যবেক্ষক দেশগুলোর তালিকায় মূলত তারাই ছিল যারা নিজেরাই দমনমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য পরিচিত।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় ‘২০২১-এর বিপ্লব’ শব্দ ব্যবহার করায় পিপলস পার্টির প্রার্থী উ লুইন মিন্ট-কে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইয়াঙ্গুনসহ বিভিন্ন এলাকায় বোমা হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে:
২১ ডিসেম্বর: ইয়াঙ্গুনের পিজিএস পার্টি অফিসের কাছে শক্তিশালী বিস্ফোরণ।
২৮ ডিসেম্বর (ভোটের দিন): মায়াবতীতে ড্রোন হামলায় ১ জন নিহত ও ১০ জন আহত। মান্দালয় ও দাওয়েই অঞ্চলেও রকেট ও ড্রোন হামলা হয়েছে।
এবারই প্রথম মিয়ানমারে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহার করা হয়েছে। তবে নির্বাচনের দিন নেপিডো, ইয়াঙ্গুন এবং সিত্তওয়েতে বহু মেশিন অকেজো হয়ে পড়ে। কোথাও বৈদ্যুতিক গোলযোগ, কোথাও চার্জিং ক্যাবল পুড়ে যাওয়া এবং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ভোট গ্রহণে ব্যাপক বিলম্ব ঘটে।
নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সামরিক জান্তা সমর্থিত USDP নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করেছে। রাখাইনের সিত্তওয়ে ও কাউকফিউতে স্থানীয় দলগুলো অভিযোগ করেছে যে, জান্তা অনুগত সরকারি কর্মচারী এবং রোহিঙ্গাদের ‘অগ্রিম ভোট’ ব্যবহার করে USDP-কে জেতানো হয়েছে।
৫ জানুয়ারি পর্যন্ত পাওয়া ফলাফলে USDP বেশিরভাগ আসনে জয়ী হয়েছে। জাতিগত দলগুলোর মধ্যে নাগা ন্যাশনাল পার্টি ৪টি এবং পা-ও ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ৩টি আসন পেয়েছে।
২০২০ সালের নির্বাচনে মাত্র ৫৫টি টাউনশিপে ভোট গ্রহণে সমস্যা হয়েছিল, কিন্তু এবার ১৯৮টি টাউনশিপে ভোট হয় ব্যাহত হয়েছে নয়তো আংশিক হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন কোনো গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক মহলে জান্তা সরকারের বৈধতা আদায়ের একটি মরিয়া চেষ্টা মাত্র। চীনের বিশেষ দূত দেং সিজুন জানিয়েছেন, এই নির্বাচন জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং এবং চীনা প্রেসিডেন্টের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার অংশ, যা মূলত মিয়ানমারে চীনা বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।










