শামসুল ইসলাম, ঢাকা: চটপটি, ছোলামুড়ি কিংবা ঝটপট স্যান্ডউইচ—শহুরে জীবনের ব্যস্ততায় রাস্তার ধারের এসব খাবার আমাদের অনেকেরই নিত্যসঙ্গী। কিন্তু এই মুখরোচক খাবারগুলোর আড়ালে যে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি লুকিয়ে আছে, তা জানলে আপনি আঁতকে উঠতে পারেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র (CARS)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় রাস্তার জনপ্রিয় এসব খাবারে উচ্চমাত্রার ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
ছোলামুড়িতে মলমূত্রজনিত দূষণ
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত ছোলামুড়ির নমুনায় আশঙ্কাজনক হারে ই. কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি মূলত মলমূত্রজনিত দূষণকে নির্দেশ করে। অস্বাস্থ্যকর পানি ব্যবহার এবং বিক্রেতাদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাবে এই বিষাক্ত জীবাণু খাবারে ছড়িয়ে পড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ছোলামুড়ি খাওয়ার মাধ্যমে ই. কোলাই সংক্রমণের ঝুঁকি প্রায় ৪৫.৫ শতাংশ।
চটপটিতে ভিব্রিও ও সালমোনেলার হানা
চটপটি প্রেমীদের জন্যও খবরটি সুখকর নয়। গবেষণায় চটপটির প্লেট, ব্যবহৃত পানি এবং তেঁতুলের চাটনিতে উচ্চমাত্রার কলিফর্ম এবং ভিব্রিও ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। চটপটি খাওয়ার মাধ্যমে ভিব্রিও সংক্রমণের ঝুঁকি ২২ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, যা সরাসরি কলেরা বা তীব্র ডায়রিয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া অস্বাস্থ্যকরভাবে সংরক্ষণ করা ডাল ও আলু দীর্ঘক্ষণ খোলা রাখা এই সংক্রমণের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নিরাপদ নয় স্যান্ডউইচও
প্লাস্টিকে মোড়ানো থাকায় স্যান্ডউইচকে আমরা নিরাপদ মনে করি, কিন্তু গবেষণার ফল বলছে ভিন্ন কথা। পরীক্ষায় স্যান্ডউইচের নমুনায় ভিব্রিও ব্যাকটেরিয়ার ব্যাপক উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এছাড়া এতে সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়াও শনাক্ত হয়েছে, যা টাইফয়েড ও পেটের পীড়ার অন্যতম কারণ। প্যাকেটজাত করার আগে সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ না করা এবং কাঁচামালের নিম্নমানই এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ভয়াবহ বার্ষিক ঝুঁকি ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
প্রধান গবেষক ড. মো. লতিফুল বারীর এই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব খাবারে থাকা অণুজীবগুলো কেবল তাৎক্ষণিক অসুস্থতাই তৈরি করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স এবং অন্ত্রের জটিল রোগ তৈরি করতে পারে।
পরিসংখ্যান বলছে, সপ্তাহে মাত্র একবার এসব খাবার খেলেও বিপুল সংখ্যক মানুষের সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
কেন এই দূষণ? গবেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিক্রেতাদের নিরাপদ পানির অভাব, একই নোংরা গামছা দিয়ে বারবার হাত ও বাসন মোছা এবং খোলা ড্রেনের পাশে খাবার তৈরি করার ফলে ধুলোবালির মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া খাবারে মিশে যাচ্ছে। অধিকাংশ বিক্রেতারই খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান নেই।
জনস্বার্থ রক্ষায় রাস্তার এসব খাবারের মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিক্রেতাদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে বাইরের খোলা খাবার পরিহার করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
businesstoday24.com ফলো করুন এবং আপনার মূল্যবান মন্তব্য জানান।