Home First Lead পুরোনো গাড়ি আমদানির প্রস্তাব: সস্তায় গাড়ি নাকি পরিবেশের নতুন ঝুঁকি?

পুরোনো গাড়ি আমদানির প্রস্তাব: সস্তায় গাড়ি নাকি পরিবেশের নতুন ঝুঁকি?

কামরুল ইসলাম, ঢাকা: ২০২৬ দেশের মধ্যবিত্তের নাগালে গাড়ি পৌঁছে দিতে এবং ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যে ‘আমদানি নীতি ২০২৫-২৮’-এর খসড়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। নতুন এই খসড়ায় বিদ্যমান ৫ বছরের বয়সসীমা তুলে দিয়ে আরও পুরোনো গাড়ি আমদানির সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে মোটরসাইকেল আমদানির ক্ষেত্রেও ১৬৫ সিসি ও ৩ বছরের বয়সসীমার শর্ত শিথিল করার সুপারিশ করা হয়েছে। রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারকদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

 গাড়ির বয়সসীমা বাড়লে জাপানি বা ইউরোপীয় রিকন্ডিশন্ড গাড়ির আমদানি মূল্য অনেকটা কমে যাবে। ফলে বর্তমানে যে গাড়ি ২৫-৩০ লাখ টাকায় কিনতে হয়, তা ১৫-২০ লাখ টাকার মধ্যে পাওয়া সম্ভব হতে পারে।  আমদানিকারকদের মতে, গাড়ির দাম কমলে আমদানির পরিমাণ বাড়বে। এতে শুল্ক বাবদ সরকারের রাজস্ব আদায় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।

বড় ব্রান্ডের গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ: ৫ বছরের বেশি পুরোনো হলে বিলাসবহুল ব্রান্ডগুলোর (যেমন- টয়োটা, নিশান বা হোন্ডা) উন্নত মডেলগুলোও সাধারণ ক্রেতারা কেনার সুযোগ পাবেন।

কাদের সুবিধা:

১. মধ্যবিত্ত পরিবার: যারা বাজেটের অভাবে নতুন বা কম পুরোনো গাড়ি কিনতে পারেন না, তারা সহজে ব্যক্তিগত গাড়ি কিনতে পারবেন।

২. রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ী (BARVIDA): আমদানিকারকদের ব্যবসায় স্থবিরতা কাটবে এবং বাজারের চাহিদা বাড়বে।

৩. পরিবহন খাত: উবার বা পাঠাও-এর মতো রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য কম বিনিয়োগে ভালো গাড়ি কেনা সম্ভব হবে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গাড়ি আমদানির বয়সসীমা

বিভিন্ন দেশে পুরোনো গাড়ি আমদানির নীতিমালা ভিন্ন ভিন্ন। রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারকরা যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তানের উদাহরণ দিলেও বাস্তব চিত্রটি নিম্নরূপ:

দেশ গাড়ি আমদানির বয়সসীমা/শর্ত
যুক্তরাজ্য বয়সসীমার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় ‘এমিশন স্ট্যান্ডার্ড’ (Euro 6) এবং মোট (MOT) টেস্টের ওপর। যেকোনো বয়সের গাড়ি আনা সম্ভব যদি তা শর্ত পূরণ করে।
পাকিস্তান সাধারণ যাত্রীবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে সীমা ৩ বছর। তবে বিশেষ কিছু বাণিজ্যিক বা ব্যক্তিগত প্রকল্পের অধীনে ৫ বছর পর্যন্ত অনুমতি দেওয়া হয়।
নিউজিল্যান্ড কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা নেই, তবে গাড়ির কার্বন নিঃসরণ এবং সুরক্ষা ফিচার (Electronic Stability Control) অত্যন্ত কড়াভাবে দেখা হয়।
কেনিয়া/নাইজেরিয়া আফ্রিকান অনেক দেশে ৮ থেকে ১৫ বছর পুরোনো গাড়ি আমদানির সুযোগ রয়েছে, যা সেই দেশের বায়ুদূষণের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিবেশগত প্রভাব ও বিশ্লেষণ:

পুরোনো গাড়ি আমদানির সুযোগ যেমন অর্থনৈতিক সুবিধা আনে, তেমনি এটি পরিবেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে:

কার্বন নিঃসরণ: পুরোনো গাড়ির ইঞ্জিন কার্যক্ষমতা হারায়, ফলে এগুলো অধিক জ্বালানি পোড়ায় এবং অধিক পরিমাণে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গত করে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: ৫ বা ১০ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি দেশে আনার কয়েক বছর পরই সেগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট ‘স্ক্র্যাপ পলিসি’ বা পুরোনো গাড়ি ধ্বংস করার উন্নত ব্যবস্থা না থাকায় এগুলো পরিবেশের ভার বাড়াবে।

নিরাপত্তা ঝুঁকি: পুরোনো গাড়ির ব্রেকিং সিস্টেম এবং এয়ারব্যাগ অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক নিরাপত্তার মানদণ্ড (Global NCAP) পূরণ করে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে: কেবল বয়সের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং আমদানিকৃত গাড়ির ‘ইউরো স্ট্যান্ডার্ড’ (কমপক্ষে Euro 4 বা 5) এবং কার্বন নিঃসরণ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হলে পরিবেশ ও অর্থনীতি—উভয়ই লাভবান হবে।