Home First Lead রেলপথে পণ্য পরিবহনের ৮৫ শতাংশ সক্ষমতা অব্যবহৃত

রেলপথে পণ্য পরিবহনের ৮৫ শতাংশ সক্ষমতা অব্যবহৃত

কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: রেলপথে পণ্য পরিবহনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও এর সিংহভাগ সুযোগ অব্যবহৃত পড়ে আছে। যেখানে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হিসেবে রেলে পণ্য পরিবহন দিন দিন বাড়ার কথা ছিল, সেখানে এক সময়ের মূল চালিকাশক্তি এই খাতটি কয়েক দশক ধরে অবহেলিত। বাংলাদেশ রেলওয়ের হালনাগাদ মহাপরিকল্পনা (রেলওয়ে মাস্টার প্ল্যান) পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সঠিক দূরদর্শিতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা গেলে এই খাত থেকে যেমন বিপুল রাজস্ব আয় সম্ভব, তেমনি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

অব্যবহৃত সুযোগের বর্তমান চিত্র

রেলওয়ে মহাপরিকল্পনার ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে (১৯৬৯-৭০ অর্থবছর) বাংলাদেশ রেলওয়ে বার্ষিক প্রায় ৪.৮ মিলিয়ন টন পণ্য পরিবহন করত। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক অবহেলা ও সক্ষমতা হ্রাসের কারণে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা কমে মাত্র ২.৫৫ মিলিয়ন টনে নেমে আসে। অথচ এই চার দশকে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, আমদানি-রপ্তানি ও পণ্য পরিবহনের অভ্যন্তরীণ বাজার বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক চিত্র দেখা যায় দেশের প্রধান অর্থনৈতিক করিডোর ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে। এই রুটে কনটেইনার পরিবহনের ক্ষেত্রে রেলওয়ের অংশীদারিত্ব বা মার্কেট শেয়ার বর্তমানে মাত্র ৫ শতাংশের নিচে। বিপুল পরিমাণ কনটেইনার পণ্য প্রতিদিন মহাসড়ক দিয়ে হাজার হাজার ট্রাকে পরিবাহিত হচ্ছে, যা তীব্র যানজট ও পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ। মাস্টার প্ল্যানের প্রক্ষেপণ ও বর্তমান বাজার চাহিদা বিবেচনা করলে দেখা যায়, রেলের পণ্য পরিবহন সক্ষমতার প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ সুযোগই অব্যবহৃত পড়ে আছে। অথচ মহাপরিকল্পনার পূর্বাভাস অনুযায়ী, সঠিক উদ্যোগ নিলে ২০৪৫ সালের মধ্যে এই পণ্য পরিবহনের পরিমাণ বার্ষিক ১৮ মিলিয়ন টনে উন্নীত করা সম্ভব।

কেন পড়ে আছে এই বিপুল সুযোগ?

মহাপরিকল্পনায় রেলের পণ্য পরিবহনের এই পিছিয়ে পড়া এবং সুযোগ অব্যবহৃত থাকার পেছনে মূল কিছু কাঠামোগত ও পরিচালনাগত কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:

যোগানের সীমাবদ্ধতা (Supply-Driven Constraints): রেলের পণ্য পরিবহনের এই মন্দা মূলত চাহিদার অভাবে নয়, বরং সেবার অপর্যাপ্ততা বা যোগানের সীমাবদ্ধতার কারণে। দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরা রেলওয়ে ব্যবহার করতে আগ্রহী হলেও রেল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সেবা ও নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।

গেজ ও অবকাঠামোগত জটিলতা: দেশের পূর্বাঞ্চলে মিটার গেজ এবং পশ্চিমাঞ্চলে ব্রড গেজ লাইনের এই অমিল পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা। যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতুর নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কারণে দুই অঞ্চলের মধ্যে নির্বিঘ্নে সরাসরি মালবাহী ট্রেন (ফ্রেইট ট্রেন) চালানো কঠিন ছিল।

মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন ও ওয়াগনের তীব্র সংকট: রেলওয়ের মালবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) এবং ওয়াগনের একটি বড় অংশই তাদের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পার করে ফেলেছে। মাস্টার প্ল্যানের তথ্য অনুযায়ী, ৩৩ শতাংশ ব্রডগেজ ও ৩৫ শতাংশ মিটারগেজ লোকোমোটিভ এবং ২৯ শতাংশ ব্রডগেজ কোচ সম্পূর্ণ মেয়াদোত্তীর্ণ। ফলে ঘনঘন ইঞ্জিন বিকল হওয়া এবং যথাসময়ে ওয়াগন না পাওয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা আস্থা হারাচ্ছেন।

সরাসরি সেবার অভাব (Door-to-Door Logistics): সড়ক পরিবহন সরাসরি কারখানার দরজা থেকে পণ্য নিয়ে ক্রেতার গুদাম পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। কিন্তু রেলওয়ে কেবল স্টেশন বা টার্মিনালভিত্তিক সেবা দেওয়ায় ধীরগতি এবং মধ্যবর্তী বাড়তি খরচের ভয়ে ব্যবসায়ীরা সড়কপথকেই বেছে নিচ্ছেন।

আইসিডি ও কনটেইনার ডিপোর সংকট: দেশে কার্যকর অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো বা আইসিডির সংখ্যা খুবই সীমিত। ঢাকার কমলাপুর আইসিডি বর্তমান বিশাল আমদানির চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল এবং ধারণক্ষমতার দিক থেকে সীমিত।

মহাপরিকল্পনার আলোকে উত্তরণ ও সম্ভাবনা

এই বিশাল অব্যবহৃত সম্ভাবনাকে দেশের অর্থনৈতিক কল্যাণে কাজে লাগাতে রেলওয়ে মহাপরিকল্পনায় বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে:

  • মেগা প্রকল্পসমূহের সঠিক ব্যবহার: পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প এবং যমুনা নদীর ওপর নবনির্মিত ডেডিকেটেড ‘বঙ্গবন্ধু রেলওয়ে সেতু’ দেশের পূর্ব ও পশ্চিম জোনের মধ্যকার ভৌগোলিক ও গেজগত দূরত্ব কমিয়ে আনবে। এটি পায়রা বন্দর এবং ভারতের সাথে আঞ্চলিক ফ্রেইট করিডোর চালুর পথ সুগম করবে।
  • সার্বিক গেজ রূপান্তর: ২০৪০ সালের মধ্যে দেশের সম্পূর্ণ রেল নেটওয়ার্ক এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রধান প্রধান করিডোরগুলোকে ব্রড গেজে (BG) রূপান্তর করার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ট্রেনের গতি ও পণ্য ধারণক্ষমতা এক লাফে কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।
  • নতুন আইসিডি ও ধীরাশ্রম প্রকল্প: ঢাকার কমলাপুরের ওপর চাপ কমাতে টঙ্গীর উত্তরে ধীরাশ্রামে একটি আন্তর্জাতিক মানের বৃহৎ ও আধুনিক আইসিডি নির্মাণের প্রস্তাব মহাপরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি উত্তরা ইপিজেড এবং বেনাপোলে প্রস্তাবিত আইসিডিগুলো নির্মিত হলে কনটেইনার পরিবহনের গতিশীলতা বহুগুণ বাড়বে।
  • ব্যবসায়িক মডেলে আধুনিকায়ন: রেলওয়েকে শুধু প্রচলিত পরিবহন সংস্থা হিসেবে না রেখে আধুনিক ‘লজিস্টিকস সার্ভিস প্রোভাইডার’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বড় শিল্প গ্রুপ ও আমদানিকারকদের সাথে দীর্ঘমেয়াদি ‘সেবা চুক্তি’ (Service Contract Agreements) করার সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে ব্যবসায়ীরা নিশ্চিত সময়ের মধ্যে পণ্য পৌঁছানোর গ্যারান্টি পান।
  • রক্ষণাবেক্ষণ ও জনবল বৃদ্ধি: নতুন রোলিং স্টক কেনার পাশাপাশি রেলের নিজস্ব ওয়ার্কশপগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি। বর্তমানে রেলের কারিগরি শূন্যপদ প্রায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত, যা দ্রুত পূরণ করে রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের ফ্রেইট সেক্টরকে যদি মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী সাজানো যায়, তবে এটি শুধু রেলের নিজস্ব রাজস্বই বহুগুণ বাড়াবে না, বরং দেশের সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ (Logistics Cost) কমিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে  বলে মনে করেন বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক পরিচালক ( ট্রাফিক ) এম এ আলিম ।