Home Third Lead চা শিল্পে বিপর্যয়, গুণগত মান হারানোর আশঙ্কা

চা শিল্পে বিপর্যয়, গুণগত মান হারানোর আশঙ্কা

ভরা মৌসুমে তীব্র লোডশেডিং
কামরুল ইসলাম
চট্টগ্রাম:  এখন চলছে চা উৎপাদনের ভরা মৌসুম। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাগানজুড়ে শ্রমিকদের কাঁচা পাতা তোলার ব্যস্ততা থাকলেও কারখানাগুলোতে শুরু হয়েছে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট। ঘন ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের কারণে সময়মতো পাতা প্রক্রিয়াজাত করা যাচ্ছে না। ফলে নষ্ট হচ্ছে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চা পাতা এবং উৎপাদিত চায়ের গুণগত মান পড়ে যাওয়ার বড় ধরনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বৃহত্তর সিলেটের পাশাপাশি দেশের অন্যতম প্রধান চা উৎপাদনকারী অঞ্চল চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাগানগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে, যেখানে কারখানাগুলো দৈনিক গড়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছে।
বাগান নির্বাহিরা জানালেন, কাঁচা চা পাতা অত্যন্ত সংবেদনশীল কৃষি উপকরণ হওয়ায় সংগ্রহের পরপরই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা ট্রাফ হাউজে প্রক্রিয়াজাত করতে হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কারখানা সচল রাখতে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে গিয়ে প্রতিদিন শত শত লিটার ডিজেল পুড়ছে। এতে প্রতিটি বাগানের দৈনিক উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রামে চা শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত ফটিকছড়ির বাগানগুলোতে সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। ফটিকছড়ির নেপচুন চা বাগানের ব্যবস্থাপক জানান, “ভরা মৌসুমে কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকলে সবুজ পাতার গুণগত মান ধরে রাখা অসম্ভব। ট্রাফ হাউজে দীর্ঘক্ষণ পাতা পড়ে থাকলে তা উত্তপ্ত হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে গিয়ে যে পরিমাণ বাড়তি জ্বালানি খরচ হচ্ছে, তাতে উৎপাদন খরচ ও নিলাম মূল্যের মধ্যে কোনো ভারসাম্য থাকছে না।”
একই এলাকার দাঁতমারা চা বাগানের উৎপাদন সংশ্লিষ্টরা জানান, ঘন ঘন ট্রিপ করা এবং দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে ভারী যন্ত্রপাতির মোটর বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার বাড়তি জ্বালানি খরচ বহন করতে গিয়ে বাগানগুলোর পরিচালন ব্যয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সারাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ন্যাশন্যাল টি কোম্পানির এক কর্মকর্তা জানালেন, “লোডশেডিংয়ের কারণে প্রতিদিন ট্রাফ হাউজে পড়ে থাকা হাজার হাজার কেজি কাঁচা পাতার সতেজতা নষ্ট হচ্ছে। উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি চায়ের গ্রেড নেমে যাওয়ায় নিলাম বাজারে প্রত্যাশিত দর পাওয়া নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটরে কারখানা সচল করতে অনেক সময় অপচয় হয়। ট্রাফ হাউজে পাতা জমে থাকলে গুণগত মান মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অনেক সময় নষ্ট পাতা ফেলে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। সবুজ পাতা সময়মতো ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটে না গেলে গুণগত বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখা যায় না। একটানা কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিং হলে পুরো দিনের উৎপাদন পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে যায়।”
বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়ে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানায়, চাহিদার তুলনায় জাতীয় গ্রিড থেকে প্রাপ্ত সরবরাহ কম থাকায় সব ধরনের গ্রাহকের মধ্যে রেশনিং করে বিদ্যুৎ দিতে হচ্ছে। ফলে শিল্প ও আবাসিক উভয় খাতেই রোটেশন অনুযায়ী সরবরাহ চালু রাখতে হচ্ছে এবং বিশেষ কোনো খাতকে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
চা শিল্প সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, দ্রুত ফটিকছড়িসহ দেশের সকল চা বাগান অধ্যুষিত অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে জাতীয় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ বাধাগ্রস্ত হবে এবং রফতানিমুখী এই খাতে বড় ধরনের আর্থিক ধস নামবে।