বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: শিপব্রেকিং খাতকে আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তরের সরকারি দাবি ও ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ গড়ার প্রতিশ্রুতির আড়ালে শ্রমিকদের জীবন কতটা অরক্ষিত, সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের মর্মান্তিক ঘটনাই তার প্রমাণ। সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয়ের ১১ সদস্যের তদন্ত প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল একটি সাধারণ দুর্ঘটনা নয়; বরং নিয়ম ভাঙার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি ও নিরাপত্তার চরম অবহেলার এক সুস্পষ্ট দলিল।
তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ১৪ আগস্ট শুক্রবার ছুটির দিনে কর্তৃপক্ষের অজ্ঞাতে ‘এমটি রাসি’ জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংক ছিদ্র করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কোনো সেফটি ম্যানেজার, ডাক্তার, অ্যাম্বুলেন্স কিংবা জরুরি উদ্ধারকারী দল ছাড়াই এই ঝুঁকিপূর্ণ রুটিন কাজ চালানো হচ্ছিল। উচ্চঝুঁকির এই আবদ্ধ স্থানে কাজ করার সময় শ্রমিকদের গ্যাস মাস্ক বা সেলফ-কনটেইন্ড ব্রিদিং অ্যাপারেটাস (এসসিবিএ) দেওয়া হয়নি। এমনকি বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্তদের বাঁচাতে যারা খালি হাতে ছুটে যান, তারাও পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। নিহত ১০ জনের মধ্যে বহিরাগত অক্সিজেন গাড়ির হেলপারও ছিলেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, নথিপত্রে এই অসংগতিগুলো কীভাবে আড়াল ছিল। ইন্টারটেক কিমসকোর দেওয়া গ্যাস-ফ্রি সনদে সব ট্যাংক প্রকৃতভাবে যাচাই না করেই ‘অ্যাকসেপ্টেবল’ দেখানো হয়েছিল, যেখানে হাইড্রোজেন সালফাইড পরীক্ষার কোনো উদ্যোগই ছিল না। দুর্ঘটনার দুই দিন আগেই ইয়ার্ডটির পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়েছিল। সিসিটিভি অকার্যকর করে রাখা এবং বিএসবিআরএ-এর অনুমোদিত জনবল তালিকার সঙ্গে মৃত শ্রমিকদের নাম না মেলার তথ্য প্রমাণ করে, খাতটিতে নথিপত্রহীন ও সস্তা শ্রমে কাজ করানোর প্রবণতা কতটা গভীর।
বুয়েটের বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষণে জানা গেছে, বদ্ধ ট্যাংকে অণুজীবীয় বিক্রিয়ায় ১০০ পিপিএমের চেয়েও বেশি ঘনমাত্রার প্রাণঘাতী হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস জমা হয়েছিল, যা পানি ছাড়ার সময় মুক্ত হয়ে মুহূর্তে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেয়।
দুর্ঘটনার পর আর্থিক ক্ষতিপূরণ ঘোষণা বা এলাকা ঘিরে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও মূল সংকট দূর হয়নি। ৩৫ দফা সুপারিশ বাস্তবায়ন, স্বাধীন অডিট ও ভুয়া সেফটি সার্টিফিকেট দেওয়া প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা না নিলে এই ক্ষতিপূরণ নির্ভর সমাধান কোনো স্থায়ী বার্তা দেয় না। নিয়ম লঙ্ঘনকারী ইয়ার্ডের বিরুদ্ধে ‘দ্য শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস-২০১১’ অনুযায়ী কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন স্বচ্ছতার আসল পরীক্ষা।










