Home চট্টগ্রাম ভাষাসংগ্রামের অগ্নিপুরুষ: স্মৃতির পাতায় সৈয়দ মোস্তফা জামাল

ভাষাসংগ্রামের অগ্নিপুরুষ: স্মৃতির পাতায় সৈয়দ মোস্তফা জামাল

ভাষাসংগ্রামের অগ্নিপুরুষ: স্মৃতির পাতায় সৈয়দ মোস্তফা জামাল

কামরুল ইসলাম

বাংলার পলিমাটিতে জন্ম নেওয়া এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা কেবল কালের সাক্ষী নন বরং কালজয়ী ইতিহাসের স্রষ্টা। এমনই এক নক্ষত্র পুরুষ ছিলেন ভাষাসৈনিক, প্রথিতযশা সাংবাদিক এবং সমাজ সংগঠক সৈয়দ মোস্তফা জামাল। ১৯৩৪ সালের ৮ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার সোনাকানিয়ার সেই ঐতিহাসিক সৈয়দ বাড়িতে যে শিশুটি জন্ম নিয়েছিলেন, কালক্রমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন দেশ ও জাতির এক অতন্দ্র প্রহরী।

তাঁর ধমনিতে ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কারাবরণকারী নেতা মৌলভী সৈয়দ সোলতান আহমদের রক্ত। পিতার সেই অকুতোভয় চেতনা এবং মাতা মোসলেমা খাতুনের আদর্শে বেড়ে ওঠা জামাল ভাই জীবনের শুরুতেই বেছে নিয়েছিলেন সত্যের পথ। ১৯৪৮ সালে যখন রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ঢাকা রাজপথ উত্তাল, তখন থেকেই তিনি ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ পত্রিকার মাধ্যমে কলমযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে বৃহত্তর সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া অঞ্চলের ছাত্র-জনতাকে সংগঠিত করে তিনি যে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা দক্ষিণ চট্টগ্রামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কারামুক্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে ধানমন্ডির বাড়িতে সেই তরুণ বয়সে ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর মতবিনিময়ই প্রমাণ করে তিনি কতটা দূরদর্শী ও দেশপ্রেমিক ছিলেন।

স্মৃতির আয়নায় পেছনে তাকালে আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে ১৯৭৪ সালের সেই সময়গুলো। ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন (সদ্য সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা) তখন কাজ করতেন ‘বাংলার বাণী’র সাতকানিয়া (দক্ষিণ চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি হিসেবে, আর জামাল ভাই ছিলেন ‘ইত্তেফাক’-এর প্রতিনিধি। খালিদ হোসেনের হাত ধরেই মূলত জামাল ভাইয়ের সাথে আমার সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সূচনা। সেই সূত্র ধরে সাতকানিয়ার আরও কয়েকজনের সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের অন্যতম হলেন প্রয়াত আমিনুল হক আজাদ, জনপদ প্রতিনিধি ( আজাদ লাইব্রেরি), আ স ম মামুনুর রহমান খলিলী ( সাবেক অতিরিক্ত সচিব) এবং আবুল কাশেম চৌধুরী রঙধনু ( আইনজীবী)। জামাল ভাই তখন ছিলেন সবার কাছে এক প্রদীপ্ত বাতিঘর। তাঁর কাজ করার ধরন, খবরের পেছনের খবর বের করে আনার সেই অদম্য স্পৃহা প্রতিনিয়ত মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত করত। কেবল পেশাদারিত্ব নয়, মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়।

দীর্ঘ তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। দৈনিক আজাদী, ইত্তেফাক, ইত্তেহাদ, পয়গাম থেকে শুরু করে বার্তা সংস্থা সি.পি.আই পর্যন্ত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই তিনি তাঁর দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। সাংবাদিকতার বাইরেও তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল ঈর্ষণীয়। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সমিতির নেতৃত্ব দেওয়া থেকে শুরু করে মিরপুর বাংলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়া—সবখানেই ছিল তাঁর কর্মনিষ্ঠার ছোঁয়া। ‘মঘীস্থানে ইসলাম’ বা মওলানা ইসলামাবাদীর ওপর তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থগুলো আজও জ্ঞানের খোরাক জোগায়।

২০০৪ সালের ২২ এপ্রিল তিনি আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। এত বছর পরও তাঁর সেই চিরচেনা হাসি আর অভিভাবকত্বের ছায়া আমরা অনুভব করি। সোনাকানিয়ার সেই মাটির মানুষটি আজও বেঁচে আছেন আমাদের সাংবাদিকতা ও সমাজসেবার প্রতিটি অনুপ্রেরণায়।

সাংবাদিকতা যখন আজ বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন সৈয়দ মোস্তফা জামালের মতো নীতিবান ও আদর্শিক মানুষের জীবনী আমাদের পথ দেখাতে পারে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর সকল নেক আমল কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।

কামরুল ইসলাম। সাংবাদিক। সম্পাাদক: বিজনেসটুডে২৪.কম। E mail: btbd24@gmail.com