এক অদম্য নারীর রূপকথা
কৃষ্ণা বসু, কলকাতা: ব্যবসা জগতে শূন্য থেকে শিখরে পৌঁছানোর গল্প অনেক রয়েছে, কিন্তু ১৯৭১ সালে মাত্র ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে যাত্রা শুরু করে আজকের কর্পোরেট দুনিয়ায় নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করার নজির মেলা ভার। ভারতের তেমনই এক অদম্য ও অনুপ্রেরণাদায়ী নারী উদ্যোক্তা শশী সোনি। কঠোর পরিশ্রম, দূরদর্শিতা আর অসম্ভব অধ্যাবসায়ের জোরে তিনি আজ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের মালিক।
ট্রান্সপোর্ট থেকে বিনোদন দুনিয়া: শুরুর সেই দিনগুলো
শশী সোনির ব্যবসায়িক জীবনের সূচনা হয়েছিল ১৯৭১ সালে ‘দীপ ট্রান্সপোর্ট’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তৎকালীন সময়ে নারীদের জন্য ব্যবসা পরিচালনা করা যেখানে ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে তিনি এই পরিবহন ব্যবসা এগিয়ে নিয়ে যান। তবে তিনি কেবল একটি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাননি। ব্যবসার পরিধি বাড়াতে ১৯৭৫ সালে মুম্বাইয়ের মুলুন্ড এলাকায় গড়ে তোলেন ‘দীপ মন্দির সিনেমা’ নামের একটি প্রেক্ষাগৃহ। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও বিনোদন শিল্পে তার এই উদ্যোগ দারুণ সাফল্য লাভ করে।
শিল্পখাতে রূপান্তর ও প্রযুক্তির ছোঁয়া
বিনোদনের পর শশী সোনি পা রাখেন ভারী শিল্পে। মহীশূরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘অক্সিজেন প্রাইভেট লিমিটেড’ নামের একটি গ্যাস উৎপাদন কারখানা। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসার ধরন পরিবর্তনে তিনি সবসময়ই ছিলেন সাহসী। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালে তিনি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রবেশ করেন এবং ‘ইজমো লিমিটেড’ (IZMO Ltd) নামে একটি সফটওয়্যার কোম্পানি চালু করেন। মহীশূরভিত্তিক এই বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে উচ্চ প্রযুক্তির অটোমোটিভ এবং ই-রিটেইলিং সার্ভিস দিয়ে আসছে।
শশী সোনি নিজে এই সফল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৪,৭০০ কোটি টাকার সমতুল্য।
স্বীকৃতি ও সমাজকল্যাণ
ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি সমাজ পরিবর্তনেও শশী সোনি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি গঠন করেছেন ‘দীপ জনসেবা সমিতি’। এই সংগঠনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রবীণদের পেনশন প্রকল্প, নারী শিক্ষার প্রসার এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণে নিয়মিত অর্থায়ন ও সহায়তা করা হয়।
শিল্পখাত এবং সমাজকল্যাণে অনন্য সাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাকে সম্মানজনক ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। এর আগে ১৯৯০ সালে ভারতীয় শিল্পে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ‘ওম্যান অফ দ্য ইয়ার’ পুরস্কার লাভ করেন। বর্তমানে তিনি ‘অল ইন্ডিয়া ইন্দাসট্রিয়াল গ্যাস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (AIIGMA)-এর কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং ‘ডিরেক্টরেট অফ টেকনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট’-এর উচ্চপদে আসীন রয়েছেন। শশী সোনির এই দীর্ঘ লড়াই ও সাফল্য প্রমাণ করে যে, সঠিক ইচ্ছা আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতা জয় করে স্বপ্নের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।
নিয়মিত এমন অনুপ্রেরণামূলক ও ব্যবসায়িক খবরের আপডেট পেতে businesstoday24.com ফলো করুন










