মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন ইতিহাস মানেই সুবিশাল সাম্রাজ্য, মরুভূমির কাফেলা আর সুরম্য রাজপ্রাসাদের গল্প। কিন্তু এই ইতিহাসের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এমন কিছু অবিশ্বাস্য লোকগাথা, যা শুনলে চোখ কপালে ওঠে। বিশেষ করে প্রাচীন পারস্য বা বর্তমান ইরানের পাহাড়ি অঞ্চলের একটি রহস্যময় কাহিনী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরে আসছে। তা হলো— আক্রমণকারীদের হাত থেকে নিজেদের সতীত্ব ও সম্মান রক্ষার্থে রাজকুমারীদের অলৌকিকভাবে ‘পাথর ভেদ করে’ পাহাড়ের ভেতর অদৃশ্য হয়ে যাওয়া।
শুনতে রূপকথা মনে হলেও, ইরানের একটি নির্দিষ্ট পাহাড়ি গুহা এবং সেখানকার অদ্ভুত কিছু প্রাকৃতিক নিদর্শন আজও এই লোকবিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
আক্রমণের মুখে যখন বিপন্ন রাজপরিবার
ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শতাব্দীতে আরব উপদ্বীপে ইসলামের উত্থানের পর যখন পারস্যে একের পর এক সুসংগঠিত অভিযান চলতে থাকে, তখন তৎকালীন পারস্যের শেষ স্যাসানিদ (Sassanid) সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদেগার্ড চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েন। আরব বাহিনির ক্রমাগত অগ্রযাত্রার মুখে সম্রাটের পরিবার ও রাজকন্যারা প্রাণ এবং সবচেয়ে বড় কথা— নিজেদের সম্মান রক্ষার্থে রাজধানী ছেড়ে দিগ্বিদিক পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
সম্রাটের এক রূপবতী ও ধার্মিক কন্যা, রাজকুমারী ‘নিকবানু’ (Nikbanu) কয়েকজন বিশ্বস্ত সঙ্গীসহ আশ্রয় নেন মধ্য ইরানের ইয়াজদ অঞ্চলের এক শুষ্ক, ধূসর ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়। চারিদিকে তখন শত্রুর পদধ্বনি, পালানোর আর কোনো পথ ছিল না।
পাহাড়ের বুক চিরে অলৌকিক আত্মগোপন
লোককাহিনী অনুযায়ী, শত্রুবাহিনী যখন রাজকুমারী নিকবানুকে প্রায় বন্দি করে ফেলছিল, ঠিক তখনই নিরুপায় রাজকন্যা আর কোনো উপায় না দেখে পাহাড়ের পাথুরে দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকেন। তিনি অশ্রুসিক্ত চোখে অবমাননার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রকৃতির সৃষ্টিকর্তার কাছে আকুল প্রার্থনা জানান।
কিংবদন্তি বলে, এক সতী নারীর সেই আকুল প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে অলৌকিকভাবে পাহাড়ের শক্ত পাথর ও মাটি আচমকা ফেটে দুভাগ হয়ে যায়। রাজকুমারী নিকবানু সেই ফাটল দিয়ে পাহাড়ের গভীরে প্রবেশ করার মুহূর্তেই পাথর আবার আগের মতো জোড়া লেগে যায়। শত্রুরা যখন সেখানে পৌঁছায়, তখন তারা কেবল পাথরের দেয়াল ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায়নি।
এভাবেই নিজের পবিত্রতা ও সতীত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে অদৃশ্য হয়ে যান এই পারসিক রাজকন্যা।
‘চাক চাক’ গুহা: সতী নারীর কান্নার জীবন্ত প্রতীক
এই ঘটনার পর থেকেই ইরানের ইয়াজদ প্রদেশের আর্দাকান শহরের কাছে অবস্থিত ওই পাহাড়ি গুহাটি ‘চাক চাক’ (Chak Chak) নামে পরিচিতি লাভ করে। ফার্সি শব্দ ‘চাক চাক’ এর অর্থ হলো ‘ফোঁটা ফোঁটা’।
এই নামকরণের পেছনে রয়েছে এক অদ্ভুত প্রাকৃতিক রহস্য। সম্পূর্ণ শুষ্ক ও মরুপ্রায় অঞ্চলের এই পাহাড়ের ভেতরের একটি পাথুরে দেয়াল থেকে বছরের বারো মাস টপ টপ করে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরতে থাকে।
স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই জল আর কিছুই নয়— পাহাড়ের ভেতর চিরতরে হারিয়ে যাওয়া সতী রাজকুমারী নিকবানুর চোখের জল। তিনি আজও ভেতরে বসে কাঁদছেন আর তাঁর সেই কান্নাই জল হয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে ঝরে পড়ছে।
প্রাচীন বিশ্বাস ও বর্তমান বাস্তবতা
বর্তমানে এই স্থানটি জরথুস্ট্রীয় (Zoroastrian) ধর্মাবলম্বীদের কাছে পৃথিবীর অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এই গুহায় আসেন মোমবাতি জ্বালাতে এবং নিজেদের মনের আশা পূরণের জন্য মানত করতে। গুহার ভেতরে একটি প্রাচীন গাছ রয়েছে, যা নিয়ে বলা হয়— এটি রাজকুমারীর হাতের লাঠি ছিল, যা পাথরে বিঁধে যাওয়ার পর অলৌকিকভাবে গাছে রূপান্তরিত হয়।
আধুনিক গবেষক ও ভূতত্ত্ববিদদের মতে, পাহাড়ের ভেতর থেকে জল চুইয়ে পড়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট ভূগর্ভস্থ জলপ্রবাহের বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। তবে বিজ্ঞান যা-ই বলুক না কেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই রুক্ষ পাহাড়ের বুকে জড়িয়ে থাকা সতীত্বের অলৌকিক আখ্যান আজও ইতিহাসের এক অনন্য ও রহস্যময় অধ্যায়।
নিয়মিত এমন বৈচিত্র্যময় ঐতিহাসিক ও তথ্যসমৃদ্ধ ফিচার প্রতিবেদন পড়তে এবং আপনার মূল্যবান মতামত জানাতে Visit www.businesstoday24.com।