মোস্তফা তারেক, নিউ ইয়র্ক: যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের কুইন্স, ব্রুকলিন কিংবা জ্যামাইকার রাস্তায় হাঁটলে হঠাৎ বিভ্রম হতে পারে। চেনা কোনো মুখ, চেনা চাটগাঁইয়া উপভাষা, আর পরিচিত আতিথেয়তা মনে করিয়ে দেবে—এটি আমেরিকার কোনো শহর নয়, যেন বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে থাকা চট্টগ্রামের এক টুকরো সন্দ্বীপ।
বাংলাদেশের আর কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের এত বিপুলসংখ্যক মানুষ আমেরিকার নাগরিকত্ব পাননি, যতখানি পেয়েছেন সন্দ্বীপের বাসিন্দারা। এটি কোনো সাম্প্রতিক প্রবণতা নয়; সন্দ্বীপবাসীর আমেরিকা জয়ের এই গল্প শতাব্দীর পুরনো।
যেভাবে শুরু: লস্কর জীবন থেকে জাহাজের ‘জাম্প’ :
সন্দ্বীপের মানুষের আমেরিকা প্রবাসের গোড়াপত্তন উনিশ শতকের শেষভাগে এবং বিশ শতকের শুরুতে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে সন্দ্বীপের সচ্ছল ও সাহসী যুবকদের প্রধান পেশা ছিল সামুদ্রিক জাহাজে খালাসি বা লস্করের চাকরি নেওয়া। কলকাতা বা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ব্রিটিশ বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে চড়ে তারা বিশ্বভ্রমণে বের হতেন।
এই জাহাজগুলো যখন আমেরিকার নিউইয়র্ক, বাল্টিমোর কিংবা ফিলাডেলফিয়া বন্দরে নোঙর করত, তখন অনেক সন্দ্বীপি লস্কর কর্তৃপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে ডকইয়ার্ডে নেমে যেতেন। অভিবাসনের পরিভাষায় একে বলা হতো ‘জাহাজ থেকে জাম্প করা’। বিশ শতকের বিশ ও ত্রিশের দশকে এভাবে বহু সন্দ্বীপি যুবক আমেরিকার মাটিতে প্রথম পা রাখেন। তারা এখানে রেস্তোরাঁ, ডকইয়ার্ড এবং কারখানায় কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন এবং পরবর্তীতে আইনি উপায়ে নিজেদের অবস্থান স্থায়ী করেন।
চেইন মাইগ্রেশন: একজনের হাত ধরে পুরো গ্রাম
সন্দ্বীপের আমেরিকা যাত্রার আসল শক্তি নিহিত ‘চেইন মাইগ্রেশনে’। শুরুর দিকের প্রবাসীরা যখন মার্কিন নাগরিকত্ব পান, তখন তারা ফ্যামিলি পিটিশনের মাধ্যমে নিজেদের ভাই, বোন, আত্মীয়স্বজনদের আমেরিকায় নিয়ে যেতে শুরু করেন।
নব্বইয়ের দশকে মার্কিন সরকারের ‘ডিভি লটারি’ (ডাইভারসিটি ভিসা) সন্দ্বীপের মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে। এক লটারিতেই সন্দ্বীপের শত শত পরিবার আমেরিকার ভিসা পায়। বলা হয়ে থাকে, সন্দ্বীপের এমন কোনো পরিবার খুঁজে পাওয়া দায়, যার অন্তত একজন সদস্য আমেরিকায় থাকেন না। কোনো কোনো গ্রাম তো আক্ষরিক অর্থেই শূন্য হয়ে গেছে, কারণ সেই গ্রামের প্রায় সব মানুষ এখন নিউইয়র্কের স্থায়ী বাসিন্দা।
নিউইয়র্কে ‘ছোট্ট এক সন্দ্বীপ’
আমেরিকায় বসবাসরত সন্দ্বীপের মানুষের সংখ্যা বর্তমানে লাখের কোটা ছাড়িয়েছে। নিউইয়র্কের কুইন্সের অ্যাস্টোরিয়া, জ্যাকসন হাইটস এবং ওজোন পার্ক এলাকায় তাদের সবচেয়ে বড় জমায়েত। তারা গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী সামাজিক নেটওয়ার্ক। ‘সন্দ্বীপ পৌরসভা কল্যাণ সমিতি’ বা ‘সন্দ্বীপ সোসাইটি’-র মতো সংগঠনগুলো প্রবাসীদের যেকোনো বিপদে-আপদে একতাবদ্ধ রাখে। নিউইয়র্কের মাটিতেই তারা আয়োজন করেন সন্দ্বীপ মেলা, যেখানে দূর প্রবাসেও হারিয়ে যায় না দ্বীপের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি।
দ্বৈত অর্থনীতি: রেমিট্যান্সে বদলে যাওয়া দ্বীপ
আমেরিকায় থাকলেও সন্দ্বীপের প্রবাসীরা তাদের নাড়ির টান ভোলেননি। প্রতি মাসে কোটি কোটি ডলারের রেমিট্যান্স যাচ্ছে বাড়িতে । সন্দ্বীপের প্রধান সড়কগুলোতে হাঁটলে চোখে পড়বে প্রবাসীদের পাঠানো টাকায় তৈরি একের পর এক বহুতল আধুনিক ভবন, ডুপ্লেক্স বাড়ি ও আধুনিক বাজার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা ও হাসপাতাল নির্মাণে প্রবাসীদের অবদান এককভাবে সবচেয়ে বেশি। তবে এই বিপুল স্থানান্তরের একটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে—মেধা ও শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ বিদেশে চলে যাওয়ায় স্থানীয় কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের স্থবিরতাও তৈরি হয়েছে।
লস্কর জীবনের সেই অনিশ্চিত যাত্রা থেকে শুরু করে আজ মার্কিন রাজনীতি, ব্যবসা এবং করপোরেট জগতে সন্দ্বীপের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে। সন্দ্বীপের এই দীর্ঘ আমেরিকা প্রবাসের ইতিহাস আসলে বাঙালি অভিবাসীদের টিকে থাকা, লড়াই এবং সাফল্যের এক জীবন্ত দলিল।