Home First Lead সিডিএর খসড়া পরিকল্পনায় চরম পরিবেশ ও সামাজিক সংকটের শঙ্কা

সিডিএর খসড়া পরিকল্পনায় চরম পরিবেশ ও সামাজিক সংকটের শঙ্কা

কৃষিজমি ধ্বংস ও আবাসনহীন শিল্পায়ন

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে একটি আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ উপশহর গড়ার নামে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) যে ‘আনোয়ারা অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যান (২০২৫-২০৫০)’ প্রস্তুত করেছে, তার অন্তরালে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি।
খসড়া মাস্টারপ্ল্যানের বিভিন্ন দিক পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই পরিকল্পনায় শিল্পায়নকে অন্ধভাবে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে স্থানীয় উর্বর কৃষিজমি ধ্বংসের এক ঝুঁকিপূর্ণ রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে শিল্পাঞ্চলের বিশাল কর্মীবাহিনীর মৌলিক আবাসন ও জীবনমানের বিষয়টিকে প্রায় উপেক্ষিত রাখা হয়েছে।
৪২ শতাংশ কৃষিজমি বিলুপ্তির আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত
খসড়া প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আনোয়ারা ও পার্শ্ববর্তী ৭,৩১৫.৫ একর অঞ্চলের চার হাজার একরেরও বেশি উর্বর ফসলি জমি থেকে প্রায় ১,৭৫৯ একর জমি এক ধাক্কায় অকৃষি খাতে রূপান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এলাকার ৪২ শতাংশ আবাদি জমি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র বৈরাগ ইউনিয়নের, যেখানে বিদ্যমান কৃষিজমির ৯৮ শতাংশই শিল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনার পেটে চলে যাওয়ার পথ তৈরি করা হয়েছে।
একটি নিবিড় কৃষিপ্রধান উপকূলীয় অঞ্চলে এভাবে খাদ্য উৎপাদন ক্ষেত্র ধ্বংস করে কংক্রিটের জঙ্গল গড়ে তোলার এই পরিকল্পনাকে চরম অবিবেচনাপ্রসূত বলে আখ্যায়িত করছেন পরিবেশবিদ ও অর্থনীতিবিদরা। কর্ণফুলীর মোহনা সংলগ্ন এই উর্বর জমিগুলো একদিকে স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তার মেরুদণ্ড, অন্যদিকে প্রাকৃতিক নিষ্কাশন হিসেবে কাজ করে বন্যা ও জলজটের হাত থেকে রক্ষা করে আসছিল। এই জমিগুলো ভরাট হলে সমগ্র অঞ্চলে স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও উপকূলীয় ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হবে।
লাখো শ্রমিকের আগমন, কিন্তু আবাসনে শূন্য বরাদ্দ
সিডিএর নিজস্ব প্রাক্কলন অনুসারেই, ২০৫০ সাল নাগাদ এই ক্ষুদ্র ভৌগোলিক অঞ্চলে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৭ লাখ ২৪ হাজার এবং কর্মসংস্থান হবে ১ লাখ ৯০ হাজারের বেশি। কিন্তু এই বিপুল কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর থাকার জায়গা কোথায় হবে, তার কোনো সুস্পষ্ট ও বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান এই খসড়া মহাপরিকল্পনায় নেই।
বর্তমানে এলাকার মোট গৃহসংস্থানের ৯১ শতাংশেরও বেশি একতলা ও কাঁচা কাঠামো এবং প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ নিজস্ব ভিটেমাটিতে বসবাস করেন। বিশাল সংখ্যক বহিরাগত শ্রমিকের জন্য মানসম্মত, স্বাস্থ্যসম্মত ও সাশ্রয়ী ভাড়াবাসার চরম ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও সিডিএ কেবল জমিতে ‘জেনারেল আরবান ইউজ’ সিল মেরে দায় সেরেছে। কোনো কার্যকর সামাজিক আবাসন প্রকল্প বা সরকারি ডরমিটরি নির্মাণের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, এলাকাটি দ্রুত অপরিকল্পিত, অস্বাস্থ্যকর বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ বস্তির রূপ নেবে।
মাঠপর্যায়ে চরম ক্ষোভ ও স্থানীয়দের প্রতিবাদ
সিডিএর এই খসড়া পরিকল্পনা সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে মাঠপর্যায়ে কথা বললে স্থানীয় বাসিন্দা ও চাষীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
বারখাইন এলাকার প্রবীণ কৃষক শামসুল আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শহরের বাবুরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে ম্যাপে দাগ কেটে আমাদের বাপ-দাদার ফসলি জমি কারখানার নামে লিখে দিচ্ছে। যেখানে সারা বছর তিন ফসল হতো, সেখানে কারখানা হলে আমাদের সন্তানরা ভাত খাবে কীভাবে? আমাদের পুনর্বাসন বা কৃষির সুরক্ষার কথা কেউ ভাবছে না।”
কেইপিজেডের এক সাধারণ পোশাক শ্রমিক জয়নাল আবেদিন তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কারখানা বাড়ছে, মালিকদের লাভ বাড়ছে, কিন্তু আমাদের থাকার জন্য একটা ভালো ঘর নেই। সরু নোংরা গলিতে চড়া ভাড়ায় স্যাঁতসেঁতে ঘরে থাকতে হয়। নতুন প্ল্যানে কোটি কোটি টাকার ব্যবসার রাস্তা বানানো হচ্ছে, অথচ হাজার হাজার শ্রমিকের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল বা সস্তায় থাকার মতো কোনো কলোনির বাস্তব কোনো কাজ নেই।”
চট্টগ্রামের একজন নগর ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “১৯৯৫ এবং ২০০৮ সালের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে এই খসড়ায়। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না বাড়িয়ে এবং কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক খালের প্রবাহ রক্ষার বিকল্প না রেখে এমন একতরফা শিল্পভিত্তিক রূপরেখা প্রণয়ন করা মোটেও টেকসই নয়। এটি বাস্তবায়িত হলে আনোয়ারা আধুনিক নগরী হওয়ার বদলে একটি বিষাক্ত ও অবাসযোগ্য শিল্পবর্জ্যের আস্তাকুঁড়ে পরিণত হবে।”
নাগরিক সেবার সংকট ও কাগুজে আশ্বাসের ফাঁদ
পরিকল্পনায় বিশাল চওড়া রাস্তা আর টার্মিনালের চকচকে নকশা দেখানো হলেও বাস্তবে আধুনিক সেন্ট্রাল স্যুয়ারেজ, সুপেয় পানির পাইপলাইন ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো সুনির্দিষ্ট টাইমলাইন নেই। আনোয়ারার বুক চিরে বয়ে যাওয়া মুরারি খালসহ বিভিন্ন শাখা নালা ইতোমধ্যে অনিয়ন্ত্রিত দখলের মুখে পড়ছে, যার বিরুদ্ধে সিডিএর কোনো কার্যকর আইনি ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়।
অতীতে সিডিএ প্রকল্প প্রণয়ন করলেও মাঠপর্যায়ে জোনাল অফিস স্থাপন ও তদারকির অভাবে তা কার্যকর করতে পারেনি। এবারও যদি কৃষিজমি ধ্বংস করে এবং শ্রমিক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে এই ত্রুটিপূর্ণ খসড়া মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত করা হয়, তবে কর্ণফুলী টানেল ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ চট্টগ্রামের জন্য এক ভয়াবহ নাগরিক ও মানবিক দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে।
ভিজিট করুন www.businesstoday24.com