Home Third Lead স্মার্ট শিপিং ম্যানেজমেন্ট ও পেপারলেস সিস্টেমই আমাদের ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকার: চেয়ারম্যান বিএসএএ

স্মার্ট শিপিং ম্যানেজমেন্ট ও পেপারলেস সিস্টেমই আমাদের ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকার: চেয়ারম্যান বিএসএএ

Captain Md. Salahuddin Chowdhury

ক্যাপ্টেন মো. সালাহ উদ্দিন চৌধুরী। দেশের সমুদ্রবাণিজ্য ও শিপিং খাতের অন্যতম অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী এই মাস্টার মেরিনার শুধু জাহাজ পরিচালনাতেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য ও সার্ভে সংক্রান্ত বিষয়েও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

যুক্তরাজ্য থেকে মাস্টার মেরিনার ডিগ্রি অর্জন করা ক্যাপ্টেন সালাহ উদ্দিন লন্ডনের ‘দ্য নটিক্যাল ইনস্টিটিউট’ (AFNI)-এর একজন সম্মানিত সহযোগী সদস্য।  তিনি নাফ মেরিন সার্ভিসেস-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO)। বিশ্বখ্যাত ‘মাকোনার কর্পোরেশন’-এর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং পানামা, বেলিজ ও সেন্ট ভিনসেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ পতাকাবাহী জাহাজগুলোর অনুমোদিত মেরিন সার্ভেয়ার।

আজ বুধবার বাংলাদেশের শিপিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন আমাদের। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি। সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

১. নেতৃত্বের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা: বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান হিসেবে আপনার এই মেয়াদে অগ্রাধিকার ভিত্তিক মূল কাজগুলো কী হবে? বিশেষ করে এই প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনটিকে আধুনিকায়নে আপনার ভাবনা কী?

ক্যাপ্টেন মো. সালাহ উদ্দিন চৌধুরী: আমার মেয়াদের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনকে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ এবং কার্যকর পেশাদার সংগঠনে রূপান্তর করা। এই প্রাচীন সংগঠনটি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম স্তম্ভ। তাই এটিকে সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম করে তুলতে আমরা মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে কাজ করছি— পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং স্টেকহোল্ডারদের সাথে শক্তিশালী সমন্বয়। আমরা এমন একটি সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করতে চাই যেখানে প্রতিটি সদস্য প্রযুক্তিগত সুবিধা পাবেন এবং দাপ্তরিক কাজে দীর্ঘসূত্রতা দূর হবে।

২. বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি: দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে গতিশীলতা আনতে শিপিং এজেন্টদের পক্ষ থেকে আপনি কোন কোন বিষয়ের ওপর বেশি জোর দিতে চান?

ক্যাপ্টেন মো. সালাহ উদ্দিন চৌধুরী: চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের জাতীয় অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। এই বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে গতিশীলতা আনতে শিপিং এজেন্টদের পক্ষ থেকে আমি তিনটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রথমত, অবকাঠামোগত উন্নয়ন যা জেটি, ইয়ার্ড এবং আধুনিক ইকুইপমেন্টের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করবে। দ্বিতীয়ত, অপারেশনাল প্রক্রিয়া সহজীকরণ যাতে অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমানো যায়। এবং তৃতীয়ত, প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার। অটোমেশন এবং রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা গেলে কার্যক্রম যেমন স্বচ্ছ হবে, তেমনি আমাদের বাণিজ্য বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।

৩. অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ: বর্তমানে বিদেশি জাহাজ পরিচালনা বা শিপিং এজেন্টদের কাজ করতে গিয়ে প্রধান প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো কী বলে আপনি মনে করেন? বন্দরে জাহাজের ‘বার্থিং ডিলে’ বা অন্যান্য ফি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে আপনাদের কোনো বিশেষ প্রস্তাবনা আছে কি?

ক্যাপ্টেন মো. সালাহ উদ্দিন চৌধুরী: বর্তমানে বিদেশি জাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বার্থিং ডিলে, কন্টেইনার জট এবং ম্যানুয়াল প্রসেসিংয়ের আধিক্য। এই জটিলতা নিরসনে আমরা সরকারের কাছে ‘সিঙ্গেল উইন্ডো সিস্টেম’ এবং একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর প্রস্তাব দিয়েছি। এছাড়া চার্জ স্ট্রাকচার বা ফি সংক্রান্ত বিষয়ে স্বচ্ছতা আনতে আমরা একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দিচ্ছি। বন্দর চত্বর থেকে দ্রুত কন্টেইনার অপসারণ এবং বহিঃনোঙ্গরে পণ্য খালাস কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে পারলে বর্তমানের অনেক অপারেশনাল প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব হবে।

৪. ডিজিটালাইজেশন ও পেপারলেস শিপিং: বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে স্মার্ট শিপিং ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের শিপিং খাতকে পুরোপুরি ডিজিটাল এবং পেপারলেস করার ক্ষেত্রে আপনাদের অ্যাসোসিয়েশন কীভাবে কাজ করবে?

ক্যাপ্টেন মো. সালাহ উদ্দিন চৌধুরী: বৈশ্বিক শিপিং ইন্ডাস্ট্রি এখন স্মার্ট ম্যানেজমেন্টের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আমরাও চাই বাংলাদেশের শিপিং খাতকে একটি পূর্ণাঙ্গ পেপারলেস সিস্টেমে নিয়ে আসতে। এজন্য আমরা ই-ডকুমেন্টেশন এবং ইন্টিগ্রেটেড ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালুর কাজ শুরু করেছি। আমরা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করছি যেন শিপিং এজেন্টদের সব ধরণের ক্লিয়ারেন্স এবং দাপ্তরিক কাজ ডিজিটাল সিগনেচার ও অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে সম্পন্ন করা যায়। এটি বাস্তবায়িত হলে সময় যেমন বাঁচবে, তেমনি কার্যক্রমে গতিশীলতা আসবে।

৫. ব্লু-ইকোনমি ও বে-টার্মিনাল: সরকারের মেগা প্রজেক্ট ‘বে-টার্মিনাল’ এবং গভীর সমুদ্র বন্দর শিপিং খাতে বড় পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই বিশাল সম্ভাবনার সুফল পেতে শিপিং এজেন্টরা নিজেদের কীভাবে প্রস্তুত করছে?

ক্যাপ্টেন মো. সালাহ উদ্দিন চৌধুরী: বে-টার্মিনাল এবং গভীর সমুদ্র বন্দর বাংলাদেশের সমুদ্র বাণিজ্যের জন্য গেম চেঞ্জার হতে যাচ্ছে। এই বিশাল অবকাঠামোর সুফল ঘরে তুলতে শিপিং এজেন্টরা নিজেদের আধুনিকায়ন করছে। আমরা বড় আকারের জাহাজ হ্যান্ডলিং করার সক্ষমতা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক মানের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। একই সাথে দক্ষ জনবল তৈরি করা হচ্ছে যাতে নতুন এই টার্মিনালগুলো চালু হলে আমরা দ্রুত বৈশ্বিক মেরিটাইম হাব হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারি। এটি আমাদের জন্য শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয় বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত।

৬. নীতিমালার সংস্কার: শিপিং এজেন্টদের লাইসেন্সিং বা পরিচালনা সংক্রান্ত বিদ্যমান নীতিমালায় কোনো সংস্কার প্রয়োজন আছে কি? যা কি না আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সাথে দেশীয় শিপিং ব্যবসাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।

ক্যাপ্টেন মো. সালাহ উদ্দিন চৌধুরী: বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে আমাদের বিদ্যমান নীতিমালাকে আরও ব্যবসাবান্ধব এবং আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা অপরিহার্য। বিশেষ করে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করা প্রয়োজন যাতে ‘ইজ অফ ডুইং বিজনেস’ সূচকে আমরা এগিয়ে থাকতে পারি। আমরা সরকারের কাছে প্রস্তাব করেছি যেন বিদ্যমান নিয়মকানুনগুলো সময়োপযোগী করা হয়, যা দেশীয় শিপিং এজেন্টদের বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে এবং বড় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সহায়তা করবে।

৭. নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ: শিপিং সেক্টরে দক্ষ জনবল তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এই পেশায় নতুনদের আগ্রহী করতে এবং দক্ষ পেশাদার তৈরি করতে আপনাদের অ্যাসোসিয়েশনের কোনো অ্যাকাডেমিক বা ট্রেনিং উদ্যোগের পরিকল্পনা আছে কি?

ক্যাপ্টেন মো. সালাহ উদ্দিন চৌধুরী: শিপিং একটি অত্যন্ত টেকনিক্যাল এবং চ্যালেঞ্জিং সেক্টর, যেখানে দক্ষ জনবলের বিকল্প নেই। নতুন প্রজন্মকে এই পেশায় আকৃষ্ট করতে আমরা বিভিন্ন ট্রেনিং প্রোগ্রাম, সার্টিফিকেশন কোর্স এবং ইন্টার্নশিপের সুযোগ তৈরি করার পরিকল্পনা নিয়েছি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে অ্যাকাডেমিক কোলাবরেশনের মাধ্যমে আমরা মেরিটাইম এডুকেশনকে আরও ব্যবহারিক করতে চাই। আমাদের লক্ষ্য হলো একটি প্রশিক্ষিত ও দক্ষ তরুণ প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা আগামী দিনে বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি এবং শিপিং খাতকে নেতৃত্ব দেবে।

আরও নানা বিষয় জানতে ভিজিট করুন: www.businesstoday24.com