Home সারাদেশ ৫৪ বছরের দীর্ঘ ‘অপেক্ষা’: জীবন যেখানে রূপকথাকেও হার মানায়

৫৪ বছরের দীর্ঘ ‘অপেক্ষা’: জীবন যেখানে রূপকথাকেও হার মানায়

ছৈয়দ আহমদ
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, হাতিয়া:  অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় আগে উত্তাল সাগরে ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ হয়েছিলেন তরুণ জেলে ছৈয়দ আহমদ। স্বজনরা সময়ের সাথে সাথে মুছে ফেলেছিলেন তার ফেরার আশা, এমনকি তার অস্তিত্বের শেষ চিহ্নটুকুও যখন ঝাপসা হয়ে আসছিল, ঠিক তখনই ৮৩ বছর বয়সে জীর্ণ শরীরে পৈতৃক ভিটায় হাজির হলেন তিনি। ৫৪ বছর পর ফিরে আসা এই মানুষটিকে ঘিরে হাতিয়ার পৌরসভাধীন ৫ নম্বর ওয়ার্ডের এমপির পুল সংলগ্ন ফজলি বাড়িতে এখন উৎসব আর বিস্ময়ের সংমিশ্রণ।
স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে চিনে নেওয়া আপনজনদের
গত মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে যখন এক বৃদ্ধ এসে নিজেকে মৃত ধন মিয়ার ছেলে বলে পরিচয় দেন, তখন উপস্থিত সবার চোখে ছিল অবিশ্বাস। কিন্তু দীর্ঘ ৫৪ বছর পর শৈশবের সহপাঠী মুন্সি সারেং, চাচাতো ভাই গেদু মিয়া এবং সহোদর আবুল খায়ের যখন তাকে শনাক্ত করলেন, তখন বিস্ময় রূপ নিল অশ্রুতে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় পাঁচ দশক আগে কুতুবদিয়া সংলগ্ন সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ভয়াবহ ট্রলারডুবির কবলে পড়েন ছৈয়দ আহমদ। স্রোতের টানে ভেসে গিয়ে তিনি ভারতের কোনো এক অজ্ঞাত এলাকায় পৌঁছান। দীর্ঘ যাযাবর জীবনে ভারতের বিভিন্ন মসজিদ ও মাজারে দিনাতিপাত করেছেন তিনি। সম্প্রতি হাওড়া স্টেশনে সর্বস্ব খুইয়ে একপ্রকার নিঃস্ব অবস্থায় বিএসএফের মাধ্যমে বাংলাদেশে ফেরত আসেন এই বৃদ্ধ।
ফিরে আসার আনন্দে বিষাদের সুর
তবে এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি ছৈয়দ আহমদের জীবনে রেখে গেছে অনেক শূন্যতা। তার নিখোঁজ হওয়ার সময় ছেলে আকরামের বয়স ছিল মাত্র কয়েক মাস। বাবার ছায়া ছাড়াই বড় হওয়া ৫৫ বছর বয়সী আকরাম এখন পিতাকে ফিরে পেয়ে আনন্দিত হলেও শুরু হয়েছে নতুন জটিলতা।
ছৈয়দ আহমদকে নিজের জিম্মায় নিতে এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আকরাম ইতিমধ্যে হাতিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-৩২৯) করেছেন।
অভিযোগ উঠেছে, বৃদ্ধের সম্পত্তির ওপর নজর দিয়ে পরিবারের কিছু সদস্য তাকে ছেলের কাছে যেতে বাধা দিচ্ছে। বর্তমানে তিনি তার ভাতিজার বাড়িতে থাকলেও, আইনিভাবে তাকে বুঝে পাওয়ার জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন তার একমাত্র সন্তান।
প্রশাসনের ভূমিকা
হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কবির হোসেন জানিয়েছেন, বিষয়টি স্পর্শকাতর। তিনি বলেন, “নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তির পরিচয় এবং বর্তমান দাবি-দাওয়াগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি। যথাযথ যাচাই-বাছাই শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে যাতে বৃদ্ধ ছৈয়দ আহমদ তার শেষ জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা পান।”
স্মৃতি আর বাস্তবের এই অভাবনীয় মিলন এখন পুরো হাতিয়ায় টক অব দ্য টাউন। ৫৪ বছর পর ফিরে আসা এই মানুষটি যেন এক জীবন্ত ইতিহাস, যিনি হার মেনেছেন সময়ের কাছে কিন্তু হার মানেননি শিকড়ের টানে।

ভিজিট করুন businesstoday24.com ফলো করুন ও আপনার মূল্যবান মন্তব্য জানান।