Home আন্তর্জাতিক রাজপ্রাসাদ থেকে বৈশ্বিক রাজনীতি: আল সৌদ পরিবারের অদৃশ্য প্রভাব

রাজপ্রাসাদ থেকে বৈশ্বিক রাজনীতি: আল সৌদ পরিবারের অদৃশ্য প্রভাব

ছবি এ আই
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
বিশ্বের শীর্ষ ১৫ ধনী পরিবারের তালিকায় সৌদি আরবের আল সৌদ পরিবার একটি অনন্য অবস্থান ধরে রেখেছে। শুধু বিপুল সম্পদের কারণেই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে বৈশ্বিক রাজনীতি, জ্বালানি বাজার এবং কূটনীতিতে তাদের প্রভাবের বিস্তার আল সৌদ পরিবারকে করেছে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ও শক্তিশালী রাজবংশগুলোর একটি। ২০২৫ সালে এসে এই পরিবার আবারও প্রমাণ করেছে, আধুনিক বিশ্বের অর্থনীতি ও ক্ষমতার সমীকরণে তারা এখনো অপরিহার্য।
রাজবংশের সূচনা ও ক্ষমতার ভিত্তি
আল সৌদ পরিবারের উত্থান শুরু হয় আঠারো শতকে। ১৭৪৪ সালে মুহাম্মদ ইবনে সৌদ এবং ধর্মসংস্কারক মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাবের ঐতিহাসিক জোট থেকেই সৌদি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ভিত্তি গড়ে ওঠে। এই জোটই পরবর্তীতে সৌদি আরব রাষ্ট্রের আদর্শিক ও শাসনতান্ত্রিক কাঠামো নির্ধারণ করে দেয়।
১৯৩২ সালে আধুনিক সৌদি আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আল সৌদ পরিবার একচ্ছত্র শাসনের সূচনা করে। তখন থেকেই দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতা পুরোপুরি এই পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত।
তেলই বদলে দেয় ভাগ্য
আল সৌদ পরিবারের ভাগ্য আমূল বদলে যায় ১৯৩৮ সালে, যখন সৌদি আরবে বিপুল তেলের সন্ধান পাওয়া যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদা বাড়তে থাকলে সৌদি আরব দ্রুতই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের কেন্দ্রে উঠে আসে।
রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো আজ বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানিগুলোর একটি। এর মুনাফাই আল সৌদ পরিবারের সম্পদের প্রধান ভিত্তি। তেল রপ্তানি থেকে আসা রাজস্ব দিয়ে সৌদি আরব গড়ে তুলেছে আধুনিক অবকাঠামো, শক্তিশালী সামরিক ব্যবস্থা এবং প্রভাবশালী কূটনৈতিক অবস্থান।
কত বড় এই সম্পদ
আল সৌদ পরিবারের মোট সম্পদের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ রাজপরিবারের সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন নেই। তবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পরিবারের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ কয়েক শত বিলিয়ন ডলারের কম নয়। পরিবারের হাজারেরও বেশি সদস্য এই বিপুল সম্পদের অংশীদার।
প্রাসাদ, বিলাসবহুল ইয়ট, ব্যক্তিগত বিমান, ইউরোপ ও আমেরিকার রিয়েল এস্টেট থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সবখানেই রয়েছে আল সৌদ পরিবারের উপস্থিতি।
রাজনীতি, সংস্কার ও যুবরাজের উত্থান
বর্তমান সৌদি আরবের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি দেশটির কার্যত শাসক এবং Vision 2030 নামের উচ্চাভিলাষী সংস্কার কর্মসূচির রূপকার। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রযুক্তি, পর্যটন, বিনোদন এবং শিল্পখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো।
নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি, বিনোদন খাত উন্মুক্ত করা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এসব সংস্কারের মাধ্যমে সৌদি সমাজে বড় পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে সমালোচকরাও বলছেন, রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার প্রশ্নে দেশটি এখনো কঠোর।
বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাব
আল সৌদ পরিবার কেবল একটি ধনী পরিবার নয়, তারা বৈশ্বিক রাজনীতিরও বড় খেলোয়াড়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক, ওপেকের মাধ্যমে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা তাদের প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ইরান, ইয়েমেন যুদ্ধ, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু থেকে শুরু করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় তেলের উৎপাদন সিদ্ধান্ত সবকিছুতেই সৌদি আরব এবং আল সৌদ পরিবারের অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
সমালোচনা ও বিতর্ক
ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে বিতর্কও পিছু ছাড়েনি। সাংবাদিক জামাল খাশোগজি হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এছাড়া মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক বন্দিদের বিষয়েও আল সৌদ পরিবার বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
তবে সৌদি নেতৃত্ব বরাবরই বলে আসছে, তারা নিজেদের সমাজ ও নিরাপত্তার বাস্তবতা বিবেচনায় সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে।
ভবিষ্যৎ কোন পথে
২০২৫ সালে এসে আল সৌদ পরিবার এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে আধুনিকায়ন ও তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা। Vision 2030 সফল হলে সৌদি আরব কেবল তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্র নয়, বরং বহুমুখী অর্থনীতির একটি বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
আল সৌদ পরিবার তাই শুধু অতীতের ঐতিহ্যের ধারক নয়, তারা ভবিষ্যতের সৌদি আরবের দিকনির্দেশকও। এই রাজবংশের উত্থান-পতন, সিদ্ধান্ত আর কৌশল আগামী দিনেও বিশ্ববাসীর আগ্রহের কেন্দ্রে থাকবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।