বিশ্বের মানচিত্রে যখনই কোনো বড় যুদ্ধ শুরু হয়, তখনই সাধারণ মানুষের মনে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দেখা দেয়, তা হলো—”পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হবে না তো?”
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার চলমান সংঘর্ষ এই আতঙ্ককে গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। আর এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটিই নাম—ইউরেনিয়াম।
ধ্বংসের কাঁচামাল: যখন ইউরেনিয়াম হয় মারণাস্ত্র
ইউরেনিয়াম প্রাকৃতিকভাবে যে অবস্থায় পাওয়া যায়, তা সরাসরি বোমায় ব্যবহার করা যায় না। একে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ‘সমৃদ্ধ’ (Enrichment) করতে হয়। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ৩ থেকে ৫ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যথেষ্ট হলেও পারমাণবিক বোমার জন্য প্রয়োজন ৯০ শতাংশ বা তার বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। রাশিয়ার কাছে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রাগার রয়েছে, যার মূল শক্তিই হলো এই উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম।
যুদ্ধের শুরু থেকেই যখনই রাশিয়া তাদের স্ট্র্যাটেজিক ফোর্সেসকে ‘অ্যালার্ট’ মোডে রেখেছে, তখনই বিশ্ববাসী বুঝতে পেরেছে এই রুপালি ধাতুর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা কতটা ভয়ংকর হতে পারে।
রাশিয়া কেবল অস্ত্রের দিক দিয়ে নয়, বরং ইউরেনিয়াম বাণিজ্যেও বিশ্বের অন্যতম বড় শক্তি। বিশ্বের অনেক দেশ, এমনকি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তাদের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানির জন্য রাশিয়ার প্রক্রিয়াজাত ইউরেনিয়ামের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে এই যুদ্ধের কারণে ইউরেনিয়ামের সরবরাহ চেইন বাধাগ্রস্ত হওয়া মানেই পুরো বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তায় টান পড়া।
অন্যদিকে, ইউক্রেনে রয়েছে ইউরোপের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ‘জাপোরিঝিয়া’। যুদ্ধের মধ্যে এই কেন্দ্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া মানে হলো কয়েক হাজার পারমাণবিক বোমার সমান তেজস্ক্রিয়তা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি। ইউরেনিয়াম যখন চুল্লিতে থাকে তখন তা আশীর্বাদ, কিন্তু গোলাবর্ষণের কারণে তা যদি বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা হবে চেরনোবিলের চেয়েও বড় বিপর্যয়।
ডার্টি বম্ব ও ডিপ্লেটেড ইউরেনিয়ামের আতঙ্ক
এই যুদ্ধে নতুন এক আতঙ্ক যোগ করেছে ‘ডার্টি বম্ব’ (Dirty Bomb) এবং ‘ডিপ্লেটেড ইউরেনিয়াম’ বা ক্ষয়িত ইউরেনিয়ামের ব্যবহার। ক্ষয়িত ইউরেনিয়াম অত্যন্ত ঘন হওয়ার কারণে এটি দিয়ে তৈরি কামানের গোলা অনায়াসেই শত্রুপক্ষের শক্তিশালী ট্যাংক চিরে ফেলতে পারে।
সম্প্রতি ব্রিটেন ইউক্রেনকে এই ধরনের গোলাবারুদ সরবরাহের ঘোষণা দেওয়ায় উত্তেজনার পারদ আরও চড়েছে। যদিও এটি পারমাণবিক বোমার মতো বিস্ফোরিত হয় না, তবে এর তেজস্ক্রিয় ধুলো মাটি ও পানির সঙ্গে মিশলে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
যুদ্ধের ময়দান ছাড়িয়ে বিশ্ব রাজনীতি
ইউরেনিয়াম এখন কেবল যুদ্ধের অস্ত্র নয়, বরং এটি কূটনীতির এক শক্তিশালী হাতিয়ার। রাশিয়া তাদের ইউরেনিয়াম রপ্তানি বন্ধের প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে পশ্চিমা বিশ্বকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে। ফলে কাজাখস্তান বা কানাডার মতো বিকল্প উৎসগুলোর দিকে সবাই ঝুঁকলেও রাতারাতি রাশিয়ার শূন্যস্থান পূরণ করা অসম্ভব।
রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ইউরেনিয়াম নিয়ন্ত্রিত হাতে থাকলে তা উন্নয়ন দেয়, কিন্তু রাজনীতির মারপ্যাঁচে এটি পুরো পৃথিবীর অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
আজ প্রতিটি দেশের রাষ্ট্রনায়কদের টেবিলে যে আলোচনা চলছে, তার অবধারিত অংশ হলো এই ইউরেনিয়ামের ভারসাম্য রক্ষা করা।
সিরিজের শেষ পর্বে : ইউরেনিয়াম কি অভিশাপ? হিরোশিমা থেকে চেরনোবিল—ইতিহাসের ট্র্যাজেডি ও শিক্ষা।