Home Second Lead কন্টেইনার শিপিংয়ে ধস: অতিরিক্ত সক্ষমতার কবলে বিশ্ব বাণিজ্য

কন্টেইনার শিপিংয়ে ধস: অতিরিক্ত সক্ষমতার কবলে বিশ্ব বাণিজ্য

কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: ২০২৬ সালে এসে বিশ্ব শিপিং শিল্প এক নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি। ২০২১-২২ সালে জাহাজের জন্য হাহাকার ছিল, সেখানে বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। চাহিদার তুলনায় জাহাজের সংখ্যা এবং পণ্য বহনের সক্ষমতা (Capacity) এতটাই বেড়ে গেছে যে, বড় বড় শিপিং লাইন বা ক্যারিয়ারগুলো এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছে।

পরিস্থিতি কেমন: জেনেটার শীর্ষ এনালিস্ট পিটার স্যান্ড এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “২০২৬ সালকে আমরা ‘ওভারক্যাপাসিটির বছর’ হিসেবে চিহ্নিত করছি। নতুন জাহাজের স্রোত বাজারে এমন এক ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে যা গত এক দশকে দেখা যায়নি। বিশেষ করে দূরপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ বা আমেরিকার রুটগুলোতে স্পট রেট ৭০% পর্যন্ত কমে গেছে। এটি এখন পুরোপুরি একটি ‘বায়ার্স মার্কেট’ বা ক্রেতাদের বাজারে পরিণত হয়েছে।

 ধারণক্ষমতার নতুন রেকর্ড ও সরবরাহ বৃদ্ধি
শিপিং খাতের বিশ্লেষক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ২০২৬ সালে বিশ্বের মোট কন্টেইনার বহন ক্ষমতা প্রায় ৩২.৩ থেকে ৩৩.৬ মিলিয়ন TEU (Twenty-foot Equivalent Unit)-তে পৌঁছেছে। ২০২১ ও ২০২২ সালের আকাশচুম্বী মুনাফার সময় শিপিং কোম্পানিগুলো যে বিপুল সংখ্যক বড় জাহাজের অর্ডার দিয়েছিল, সেগুলো এখন ধারাবাহিকভাবে সাগরে নামতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বড় আকারের কন্টেইনার জাহাজগুলো (Ultra Large Container Vessels) বাজারে আসায় মোট সক্ষমতা গত ৫ বছরে প্রায় ২৮% বৃদ্ধি পেয়েছে।
 কেন এই অতিরিক্ত সক্ষমতা বা ওভারক্যাপাসিটি?
অর্ডারবুক ডেলিভারি: করোনা পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত আয়ের কারণে বড় কোম্পানিগুলো (যেমন: MSC, Maersk, Hapag-Lloyd) শত শত নতুন জাহাজের অর্ডার দিয়েছিল, যার বড় একটি অংশ ২০২৬ সালে সরবরাহ করা হচ্ছে।
চাহিদায় মন্দা: ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হারের কারণে সাধারণ মানুষের পণ্য কেনার ক্ষমতা কমেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ৩% এর নিচে নেমে এসেছে, যা জাহাজের সংখ্যার তুলনায় অনেক কম।
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও উদ্বৃত্ত: যদিও লোহিত সাগর বা হরমুজ প্রণালীর সংকটের কারণে অনেক জাহাজ দীর্ঘ পথ ঘুরে যাচ্ছে, তবুও নতুন জাহাজের আধিক্য এতটাই বেশি যে তা এই দীর্ঘ পথকেও কভার করে ফেলছে।
ক্যারিয়ারগুলোর আর্থিক ঝুঁকি ও মাশুল বা ফ্রেইট রেট
অতিরিক্ত সক্ষমতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জাহাজের ভাড়ার ওপর। প্রধান বাণিজ্যিক রুটগুলোতে (যেমন: এশিয়া থেকে ইউরোপ বা এশিয়া থেকে আমেরিকা) স্পট রেট বা কন্টেইনার ভাড়া গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩০-৪০% কমে গেছে।
আর্থিক লোকসান: ফ্রেইট রেট কম হওয়ায় এবং পরিচালন ব্যয় (জ্বালানি ও শ্রমিক খরচ) বেশি থাকায় ২০২৬ সালের বার্ষিক রিপোর্টে অধিকাংশ ক্যারিয়ারের ব্যালেন্স শিট লাল (নেতিবাচক) হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রাইস ওয়ার (Price War): বাজারের দখল ধরে রাখতে কোম্পানিগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলকভাবে ভাড়া কমাচ্ছে, যা পুরো শিল্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
 সংকট উত্তরণে গৃহীত পদক্ষেপ
এই অবস্থা সামাল দিতে শিপিং লাইনগুলো বেশ কিছু কৌশল অবলম্বন করছে:
স্লো স্টিমিং (Slow Steaming): জ্বালানি সাশ্রয় এবং সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে সক্ষমতা কমাতে জাহাজগুলো অত্যন্ত ধীরগতিতে চালানো হচ্ছে।
ব্ল্যাঙ্ক সেলিং (Blank Sailing): অনেক ক্ষেত্রে লাভজনক ট্রিপ না পাওয়ায় জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে বাতিল বা স্থগিত রাখা হচ্ছে।
পুরানো জাহাজ স্ক্র্যাপিং: কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে অনেক কোম্পানি তাদের ২০ বছরের বেশি পুরানো জাহাজগুলো ভেঙে ফেলছে (Scrapping), যাতে বাজারে জাহাজের সংখ্যা কিছুটা কমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সাল হবে শিপিং খাতের জন্য একটি “বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার বছর” (Economic Moment of Truth)। যদি বিশ্ব অর্থনীতির গতি নাটকীয়ভাবে না বাড়ে, তবে এই ওভারক্যাপাসিটি ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এর ফলে ছোট বা কম সক্ষমতার শিপিং কোম্পানিগুলো দেউলিয়া হওয়া বা বড় কোম্পানির সাথে একীভূত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

আরও নানা বিষয় জানত ভিজিট করুন: www.businesstoday24.com