Home সারাদেশ সীমানা পেরিয়ে কুড়িগ্রামে চীনা জামাতা, দেখতে গ্রামবাসীর ভিড়

সীমানা পেরিয়ে কুড়িগ্রামে চীনা জামাতা, দেখতে গ্রামবাসীর ভিড়

নয়ন দাস, কুড়িগ্রাম: ফুলবাড়ীতে এবার প্রেমের টানে চীন থেকে ছুটে এসেছেন এক চীনা যুবক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাত্র এক মাসের পরিচয়ের পর গড়ে ওঠা সেই প্রেম রূপ নিয়েছে পরিণয়ে। গত ৯ মে পারিবারিকভাবে ঢাকার একটি আদালতে আইনি প্রক্রিয়ায় (কোর্ট ম্যারেজ) বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন তারা। বিয়ের পর আজ রোববার (১৭ মে) সকালে উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের ধর্মপুর কালিয়টারী গ্রামে নবদম্পতি পৌঁছালে এই চীনা জামাতাকে এক নজর দেখতে স্থানীয় উৎসুক জনতার উপচে পড়া ভিড় জমে।

ফেসবুক থেকে আদালত: যেভাবে শুরু ও পরিণতি

পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার ধর্মপুর কালিয়টারী গ্রামের মৃত মোফাজ্জল হোসেন ও সাহেরা বেগম দম্পতির মেয়ে মোরশেদা বেগমের সাথে গত ৩ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অ্যাপে পরিচয় হয় চীনের নাগরিক আনহংওয়েইর (৩৯)। মোরশেদা বেগম বর্তমানে ঢাকার সাভারে একটি পোশাক কারখানায় (গার্মেন্টস) কর্মরত। তার আগের সংসারে একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।

পরিচয়ের পর দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর সখ্যতা, যা দ্রুতই প্রেমে রূপ নেয়। প্রেমের টানেই বাংলাদেশে ছুটে আসেন ৩৯ বছর বয়সী ওই চীনা যুবক। এরপর গত ৯ মে ঢাকার একটি আদালতে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধর্মীয় রীতি মেনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তারা।

শ্বশুরবাড়িতে প্রথম আগমন ও কৌতূহল

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে গতকাল শনিবার প্রথমবারের মতো কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে শ্বশুরবাড়িতে পা রাখেন এই চীনা জামাতা। আজ রোববার সকালে বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে পুরো গ্রামজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন বিদেশি জামাতাকে দেখতে।

চীনা যুবক আনহংওয়েই চীনের শানডং প্রদেশের ডংমিং কাউন্টির দাতুন টাউনের ঝাওঝেনতুন গ্রামের মিস্টার আনজিফাং ও মিসেস মেংফেংজিয়াও দম্পতির সন্তান।

গণমাধ্যমকে নিজের অনুভূতি জানিয়ে আনহংওয়েই বলেন, “আমি মুসলিম ধর্মাবলম্বী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অ্যাপের মাধ্যমে মোরশেদার সাথে আমার পরিচয় হয় এবং তাকে আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছি। আমার পরিবারের সাথেও তাকে অনলাইনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। আমি তাকে সবসময় সুখে রাখতে পারব বলে বিশ্বাস করি।”

স্বামীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশ করে মোরশেদা বেগম বলেন, “আমার স্বামী অত্যন্ত ভালো মনের একজন মানুষ। আমি তার সাথে খুবই সুখে থাকব।”

ইউপি সদস্যের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কাশিপুর ইউনিয়ন পরিষদের ধর্মপুর মৌজার ইউপি সদস্য মো. ফেরদৌস আলম জানান, চীনা নাগরিক আসার খবর পেয়ে তিনি নিজে ওই বাড়িতে যান। সেখানে উৎসুক জনতার ভিড় সামলানোর পাশাপাশি তিনি নবদম্পতির বিয়ের কাবিননামা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে দেখেছেন।

বর্তমানে এই নবদম্পতি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতেই অবস্থান করছেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ৩০ মে তারা স্থায়ীভাবে চীনের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন এবং সেখানেই নতুন সংসার শুরু করবেন বলে জানা গেছে।

সচেতনতা ও সতর্কতা: হুজুগে না মেতে সাবধানতার প্রয়োজন

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে প্রেমের টানে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্রে বিদেশি নাগরিকদের, বিশেষ করে চীনা যুবকদের আগমন নতুন কিছু নয়। এর আগে দেশের বিভিন্ন জেলায় এমন বহু ঘটনার নজির মিলেছে, যেখানে চীনা নাগরিকরা গ্রামীণ সাধারণ পরিবারের নারীদের বিয়ে করে নিজ দেশে নিয়ে গেছেন। এই ধরনের ঘটনাগুলো প্রাথমিকভাবে বেশ কৌতূহল ও রোমাঞ্চের সৃষ্টি করলেও, এর আড়ালে থাকা সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের মতে, অচেনা-অজানা সংস্কৃতি ও ভাষার একজন মানুষের সাথে কেবল এক বা দুই মাসের ফেসবুক কিংবা অ্যাপের পরিচয়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর আগে এমন বেশ কিছু ঘটনায় মানব পাচার, জালিয়াতি কিংবা প্রতারণার মতো তিক্ত অভিজ্ঞতাও সামনে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে বিয়ের পর ভুক্তভোগী নারীরা নিজ পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে ভিনদেশে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন।

তাই এই ধরনের আন্তর্জাতিক বিয়ের ক্ষেত্রে শুধু হুজুগে না মেতে আইনি ও সামাজিক কিছু বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত:

ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন: সংশ্লিষ্ট বিদেশি নাগরিকের আসল পরিচয়, পেশা, বৈবাহিক অবস্থা এবং নিজ দেশে তার কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড আছে কি না, তা বিয়ের আগেই নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

দূতাবাসের সহায়তা: বাংলাদেশে অবস্থিত সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস (যেমন ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস) থেকে ওই নাগরিকের কাগজপত্রের সত্যতা এবং লিগ্যাল স্ট্যাটাস যাচাই করে নেওয়া জরুরি।

আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ওপর জোর: শুধু ধর্মীয় বা কোর্ট ম্যারেজ নয়, আন্তর্জাতিক বিয়ের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট আইনি উইংয়ের মাধ্যমে সব ধরনের নিয়মকানুন যথাযথভাবে সম্পন্ন করা উচিত, যাতে পরবর্তীতে কোনো বিপদে আইনি সুরক্ষা পাওয়া যায়।

রোমাঞ্চকর এসব সংবাদের আড়ালে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতারণা যেন লুকিয়ে না থাকে, সে বিষয়ে কনে, কনের পরিবার এবং স্থানীয় প্রশাসনের সবসময় সতর্ক দৃষ্টি রাখা আবশ্যক।