Home ইতিহাস ও ঐতিহ্য রোমান রাজপ্রাসাদের নিষিদ্ধ গল্প: সম্রাট নিরোর অজাচার ও নৃশংসতা

রোমান রাজপ্রাসাদের নিষিদ্ধ গল্প: সম্রাট নিরোর অজাচার ও নৃশংসতা

তারিক-উল-ইসলাম

সম্রাট নিরোর প্রাসাদের অন্দরের জীবন এবং তার বিতর্কিত সম্পর্কগুলোর ইতিহাস যেকোনো কল্পকাহিনীকেও হার মানায়। ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে বসে তিনি যেভাবে নৈতিকতা ও সামাজিক নিয়মের তোয়াক্কা না করে নিজের বিকৃত ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন, তা রোমান সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।
প্রাসাদের অন্দরে স্বেচ্ছাচারিতা ও নৈতিক অবক্ষয়
রোমান সম্রাটদের যেখানে প্রজাদের রক্ষক এবং সাম্রাজ্যের গাম্ভীর্যের প্রতীক হওয়ার কথা ছিল, সেখানে নিরো রাজপ্রাসাদকে বানিয়েছিলেন তার ব্যক্তিগত আমোদপ্রমোদ এবং বিকৃতির কেন্দ্রস্থল।
১. থিয়েটারের উন্মাদনা ও অভিজাতদের জিম্মি দশা
নিরো নিজেকে কেবল সম্রাট ভাবতেন না, তিনি বিশ্বাস করতেন তিনি একজন মহান গায়ক, অভিনেতা এবং রথচালক। রোমান সমাজে অভিনেতাদের নিচু নজরে দেখা হতো, কিন্তু নিরো সমস্ত প্রথা ভেঙে মঞ্চে পারফর্ম করতেন। তার এই দীর্ঘ ও বিরক্তিকর পারফরম্যান্স দেখার জন্য রোমের সিনেটর এবং অভিজাতদের বাধ্য করা হতো। সভাকক্ষে পাহারাদার থাকত যাতে কেউ মাঝপথে উঠে যেতে না পারে। ইতিহাসবিদদের মতে, নিরোর গান শোনার যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে অনেকে সভাকক্ষেই অজ্ঞান হওয়ার ভান করতেন, আবার কেউ কেউ দেয়াল টপকে পালাতেন।
২. মদ্যপান উৎসব ও নাগরিকদের ওপর নির্যাতন
প্রাসাদের ভেতর প্রায় প্রতিদিনই বসত বিশাল সব মদ্যপান উৎসব ও অনৈতিক জলসা। ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ নিরো শুধু প্রাসাদের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি রাতের অন্ধকারে ছদ্মবেশে রোমের রাস্তায় বের হতেন। সাধারণ নাগরিকদের ওপর হামলা করা, নারীদের তুলে আনা এবং অভিজাতদের সম্পদ জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়া ছিল তার রাতের বেলার নিয়মিত বিকৃত আনন্দ।
ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত সম্পর্কসমূহ
নিরোর ব্যক্তিগত ও বৈবাহিক জীবন ছিল বিশ্বাসঘাতকতা, চরম নৃশংসতা এবং অদ্ভুত সব সম্পর্কের এক জটিল জাল।
১. মা আগ্রিপিনার সাথে জটিল রসায়ন
নিরোর ক্ষমতায় আসার পেছনে তার মা আগ্রিপিনার অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু পরবর্তীতে নিরো যখন নিজের মতো করে ক্ষমতা চালাতে চাইলেন, তখন মায়ের সাথে তার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। তৎকালীন রোমান ঐতিহাসিক তাসিতুস এবং সুয়েটোনিয়াসের মতে, ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মা ও ছেলের মধ্যে এক ধরনের অস্বাভাবিক ও অনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই মায়ের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে নিরো তাকে নির্মমভাবে হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেন।
২. ক্লডিয়া অক্টাভিয়া ও পপিয়া সাবিনা: প্রেম ও নৃশংসতা
নিরোর প্রথম স্ত্রী ছিলেন ক্লডিয়া অক্টাভিয়া, যিনি ছিলেন অত্যন্ত মার্জিত একজন নারী। কিন্তু নিরো পপিয়া সাবিনা নামের এক অভিজাত নারীর প্রেমে পড়েন। পপিয়ার প্ররোচনায় নিরো তার স্ত্রী অক্টাভিয়াকে প্রথমে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে নির্বাসনে পাঠান এবং পরে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করান।
পপিয়াকে বিয়ে করার পর নিরোর জীবন কিছুদিন ঠিকঠাক চললেও তার হিংস্র রূপ আবার প্রকাশ পায়। একদিন এক সামান্য বিষয় নিয়ে তর্কের জেরে নিরো তার গর্ভবতী স্ত্রী পপিয়াকে পেটে লাথি মারেন, যার ফলে পপিয়া এবং তার অনাগত সন্তানের মৃত্যু হয়।
৩. স্পোরাসের সাথে বিয়ে: ইতিহাসের অদ্ভুততম অধ্যায়
পপিয়ার মৃত্যুর পর নিরো তীব্র অনুশোচনায় ভোগেন, কারণ তিনি পপিয়াকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। এরপর তিনি ‘স্পোরাস’ নামের এক তরুণ ক্রীতদাসের সন্ধান পান, যার শারীরিক গঠন ও মুখের অবয়ব হুবহু মৃত পপিয়ার মতো ছিল।
নিরো তখন এক অভূতপূর্ব ও অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নেন। তিনি স্পোরাসকে খোজা (castrate) করার নির্দেশ দেন যাতে তাকে নারীর রূপ দেওয়া যায়। এরপর প্রথাগত রোমান বিয়ের সমস্ত নিয়ম মেনে, স্পোরাসকে কনের পোশাকে সাজিয়ে নিরো তাকে বিয়ে করেন। স্পোরাসকে তিনি রাজপ্রাসাদে নিজের স্ত্রী হিসেবে রাখতেন এবং জনসমক্ষে তাকে ‘পপিয়া’ বলেই ডাকতেন।
রোমান রাজপ্রাসাদের দেয়ালের ভেতরে ঘটা এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, চরম ক্ষমতা কীভাবে একজন মানুষকে পুরোপুরি উশৃঙ্খল এবং বিবেকহীন করে তুলতে পারে। নিরোর এই বিকৃত জীবনযাত্রাই শেষ পর্যন্ত তার পতনের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।