বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের বহির্নোঙরে অবাধে ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে মাছ ধরার জাল পাতাকে কেন্দ্র করে নৌ-পরিবহন খাত ও স্থানীয় মৎস্যজীবীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও বিরোধ দেখা দিয়েছে। একদিকে নাবিক ও বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি—নেভিগেশন চ্যানেলে জাল ফেলার কারণে বাণিজ্যিক জাহাজের প্রপেলারে জাল পেঁচিয়ে ইঞ্জিন বিকল হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
অন্যদিকে, বংশানুক্রমে বহির্নোঙরে সাগরে জাল ফেলে জীবিকা নির্বাহ করা হাজার হাজার মৎস্যজীবীর দাবি—এটি তাদের বহু বছরের ঐতিহ্য ও বিশাল বিনিয়োগের রুটি-রুজির ক্ষেত্র। সঠিক সমন্বয় ও সুনির্দিষ্ট জোন নির্ধারণ না করে কঠোর ব্যবস্থা নিলে নিঃস্ব হয়ে পড়বেন তারা।
লাইটারেজ শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পতেঙ্গা জেলেপাড়া থেকে পারকি বিচ, শিপ চ্যানেল আলফা থেকে কুতুবদিয়া এবং পতেঙ্গা থেকে ভাসানচর পর্যন্ত সাগরে ভাসমান ও বিন্দি জাল পেতে রাখা হচ্ছে। জাহাজের পাখা বা প্রপেলারে জাল আটকে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটছে। অনেক সময় ভুলবশত জাল কেটে গেলে মৎস্যজীবীরা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন এবং নাবিকদের ওপর পাথর নিক্ষেপসহ হামলার ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি ভাসানচর এলাকা থেকে দুই লাইটার জাহাজের দুই নাবিককে তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর ঘটনাও ঘটে, যাদের পরবর্তীতে উদ্ধার করা হয়।
এ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত ১০ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান বরাবর চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন। সংগঠনের সভাপতি মো. মিজানুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক আফসার হোসেন চৌধুরী স্বাক্ষরিত চিঠিতে ১৭ আগস্টের মধ্যে নেভিগেশন চ্যানেল থেকে জাল সরানোর কার্যকর উদ্যোগ না নিলে বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে তৎপর হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছে, বন্দরসীমা, প্রবেশপথ, বাণিজ্যিক জাহাজের পথ ও বহির্নোঙরে অবৈধভাবে মাছ ধরা বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ। বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে কর্ণফুলী চ্যানেল ও বহির্নোঙরে যৌথ অভিযান চালিয়ে ২৮ জন জেলেকে আটক করেছে, যার মধ্যে ২৪ জনকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
শিপিং খাতের বক্তব্য: ‘আন্তর্জাতিক নিয়মের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না’
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মো. সালাহ উদ্দিন জানান, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য নির্ধারিত চ্যানেল বা পথ নিরাপদ রাখতে হয়। বিশ্বের অন্যান্য বন্দরের মতো যদি মাছ ধরতে হয়, তবে তা পানির একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় বা বাণিজ্যিক জাহাজের রুট এড়িয়ে করতে হয়।
তিনি বলেন, “আমাদের দেশে ঠিক তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। মূল নেভিগেশন চ্যানেলেই জাল পেতে রাখা হচ্ছে। ফিশিং বোটগুলো মাদার ভেসেল ও লাইটার জাহাজের একদম কাছাকাছি চলে এসে চালকদের বিভ্রান্ত করে। অনেক সময় সংকেত না মেনে গতি পরিবর্তনের জন্য তারা আক্রমণাত্মক ভঙ্গি করে। এতে আন্তর্জাতিক মাদার ভেসেলের বিদেশি নাবিকরাও আতঙ্কিত ও বিব্রত বোধ করেন।”
মৎস্যজীবীদের আকুতি: ‘যুগ যুগ ধরে আমাদের বিনিয়োগ ও জীবনসংগ্রাম’
বন্দর ও লাইটারেজ শ্রমিকদের এই অভিযোগের বিপরীতে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন পতেঙ্গা ও পারকি এলাকার প্রবীণ মৎস্যজীবী ও ট্রলার মালিকরা। তাদের মতে, সাগরে মৎস্য শিকার কোনো নতুন ঘটনা নয়; বহুকাল ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা এই বহির্নোঙর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় জাল ফেলে আসছেন।
পতেঙ্গা জেলেপাড়ার প্রবীণ মৎস্যজীবী সরদার হরিপদ দাস ও স্থানীয় একাধিক বোট মালিক জানান, প্রতিটি ফিশিং ট্রলার, জাল ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম তৈরিতে ১০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে হয়। একেকটি নৌকায় ৮ থেকে ১৫ জন শ্রমিকের রুটি-রুজি নির্ভর করে। ব্যাংক ঋণ ও এনজিওর কিস্তি শোধ করতে হয় এই মাছ বিক্রির টাকায়।
সাক্ষাৎকারে বোট মালিক ও জেলেরা তাদের ক্ষোভ ও সংকটের কথা প্রকাশ করেন:
জেলে প্রতিনিধি ও বোট মালিক মো. এরশাদ আলী বলেন:
“আমরা তো ইচ্ছাকৃতভাবে জাহাজের নিচে জাল দিই না। সাগর বিশাল, কিন্তু নির্দিষ্ট মৌসুমে মাছ পাওয়ার কিছু নির্দিষ্ট জায়গা থাকে। যুগ যুগ ধরে আমাদের বাপ-দাদারা এখানে জাল ফেলে আসছে। হঠাৎ করে আমাদের অবৈধ বলে জেলে পুরলে বা জাল কেটে দিলে আমাদের শত শত পরিবার না খেয়ে মরবে। লাইটার জাহাজগুলো অনেক সময় আমাদের নির্ধারিত সংকেত বা আলো তোয়াক্কা না করে জালের ওপর দিয়ে চলে যায়, এতে লাখ টাকার জাল নষ্ট হয়। ক্ষতিপূরণ তো পাই-ই না, উল্টো আমাদের ওপর হামলাকারী বা জলদস্যুর অপবাদ দেওয়া হয়।”
অন্য এক প্রবীণ জেলে কালু মাঝি জানান:
“নাবিকদের নিরাপত্তা যেমন জরুরি, আমাদের পেটের ভাতও তেমন জরুরি। সাগরে জাল পাততে বিপুল টাকা বিনিয়োগ আছে। জাহাজ চলাচলের নির্দিষ্ট পথ যদি লাল বয়া দিয়ে স্পষ্ট করে চিহ্নিত করে দেওয়া হয় এবং আমাদের জন্য মাছ ধরার বিকল্প জোন নির্ধারণ করা হয়, তবে আমরা কেন জাহাজের পথে যাব? কোনো সমাধান না করে পাইকারি হারে জেলেদের আটক ও জেল-জরিমানা করা কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।”










