বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: লোহিত সাগরের অচলাবস্থা কাটিয়ে সুয়েজ খাল পুনরায় সচল হওয়ার খবরে বিশ্ব বাণিজ্যে স্বস্তির আভাস পাওয়া গেলেও, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউরোপের বন্দরগুলোতে সম্ভাব্য জাহাজ জট। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সুয়েজ এবং আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ—এই দুই রুট দিয়ে আসা জাহাজের বহর একই সময়ে ইউরোপের প্রধান বন্দরগুলোতে পৌঁছানোর ফলে সৃষ্টি হতে পারে বিশাল এক ‘লজিস্টিক ট্রাফিক জ্যাম’।
কেন এই জট?
গত কয়েক মাস ধরে লোহিত সাগরে অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের অধিকাংশ রপ্তানি পণ্যবাহী জাহাজ আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে ইউরোপে যাচ্ছিল। সম্প্রতি সুয়েজ খাল উন্মুক্ত হওয়ায় অনেক জাহাজ এই সংক্ষিপ্ত পথ বেছে নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে রটারড্যাম, হামবুর্গ এবং এন্টওয়ার্প বন্দরে দুই রুটের জাহাজগুলো একসাথে ভিড়তে শুরু করবে, যাকে শিপিং পরিভাষায় ‘ভ্যাসেল বাঞ্চিং’ বলা হয়।
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে ত্রিমুখী আঘাত
১. লিড টাইম ও সরবরাহ সংকট: ইউরোপ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। রটারড্যাম বা হামবুর্গের মতো বন্দরে জাহাজ ভিড়তে বিলম্ব হওয়ার অর্থ হলো খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছাতে দেরি হওয়া। তৈরি পোশাক শিল্প কারখানার একজন শীর্ষ নির্বাহি বিজনেসটুডে২৪-কে বলেন, “বসন্তকালীন সংগ্রহের (Spring Collection) পণ্যগুলো সময়মতো না পৌঁছালে আমরা বড় ধরনের ডিসকাউন্ট বা অর্ডার বাতিলের ঝুঁকিতে পড়ব।”
২. খালি কন্টেইনারের কৃত্রিম সংকট: জাহাজগুলো ইউরোপীয় বন্দরে আটকে থাকলে সেখান থেকে খালি কন্টেইনার সময়মতো বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারবে না। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে রপ্তানি উপযোগী খালি কন্টেইনারের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ লজিস্টিক চেইনকে স্থবির করে দেবে।
৩. পরিবহন খরচ ও মুনাফায় টান: জাহাজ জটের কারণে জাহাজগুলোকে মাঝসমুদ্রে অপেক্ষায় থাকতে হলে শিপিং লাইনগুলো ‘কনজেশন সারচার্জ’ (Congestion Surcharge) আরোপ করতে পারে। ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক ফ্রেট রেট বৃদ্ধির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বাড়তি এই খরচ পোশাকের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেবে এবং রপ্তানিকারকদের মুনাফার মার্জিন কমিয়ে দেবে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া
পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকটের ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই এই আন্তর্জাতিক লজিস্টিক সংকট তাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। অনেক কারখানা মালিক এখন বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল এয়ার ফ্রেইট বা আকাশপথের কথা ভাবছেন, যা আদতে ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই সংকট মোকাবিলায় রপ্তানিকারকদের এখন থেকেই ইউরোপীয় ক্রেতাদের সাথে আলোচনা করে ‘লিড টাইম’ সমন্বয় করে নিতে হবে। পাশাপাশি, বন্দর জট এড়াতে অপেক্ষাকৃত কম ব্যস্ত বন্দরের (Alternative Ports) সুবিধা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।